সাহসী ইউক্রেনিয়রা পুরো বিশ্বকে স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও মুক্তির লড়াইয়ের গুরুত্ব কী তা বোঝার নতুন সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার হামলা লক্ষাধিক নিরীহ মানুষের জীবনকে বিপন্ন করেছে, আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গ করেছে এবং এই ঘটনা ইউরোপীয়দের নিরাপত্তা এবং রাজনীতিকে মৌলিকভাবে পুনর্নিমাণ করে চলেছে।
ইউক্রেনের ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত রাষ্ট্র এবং পশ্চিমাদের সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্ক তৈরি, ঐতিহাসিকভাবে ইউক্রেনের রাশিয়ার অন্তর্ভুক্তি এসবকিছু মিলিয়ে পুতিন ইউক্রেন দখলে বদ্ধ পরিকর ছিলো। কিন্তু ইউক্রেনের সৈন্য, নেতা এবং জনগণের ক্রমাগত প্রতিরোধের কারণে রুশ বাহিনীকেও বাধা পেতে হচ্ছে।
তবে ইউক্রেনের এই লড়াইয়ে সামনের সারিতে থেকে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে দেশটির নারীরা। বিগত এক দশকের নানান সংঘাতে ইউক্রেনের নারীরা এক দৃঢ়চেতা মনোবল এবং বলিষ্ট অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। সেই দৃঢ় চেতনা এবং বলিষ্ট কণ্ঠস্বর দিয়েই স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্রের যুদ্ধে নিজেদের পরিবার এবং দেশকে রক্ষা করে চলেছে তারা। আন্তর্জাতিক সচেতনতা বাড়াতে এবং তাদের গণতান্ত্রিক জীবনধারা রক্ষার জন্য তারা হাতে তুলে নিয়েছে মাইক্রোফোন।
ইউক্রেনেরজুড়ে রাজনীতিবিদ, কূটনৈতিক থেকে শুরু করে সুশীল সমাজের বিশেষজ্ঞ, গৃহিণী থেকে বিশ্ব সুন্দরী, সাধারণ নারী থেকে শিল্পী সকল স্তরের নারীরা তাদের দেশকে রক্ষা করার জন্য হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছেন।
প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ভিক্টর ইয়ানুকোভিচের ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে অ্যাসোসিয়েশন চুক্তিতে স্বাক্ষর না করার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গণতান্ত্রিক ইউরোপের অংশ হওয়ার দৃঢ় ইচ্ছা প্রকাশ করে কয়েক হাজার ইউক্রেনীয় শুরু করেছিলো ‘মর্যাদার লড়াই’। এই লড়াইয়ের মূলে ছিল নারী এবং এতে অংশগ্রহণকারীদের ৫০ শতাংশই ছিলো নারী। রাজধানী কিইভের রাস্তাগুলি ছিলো তাদের দখলে, তারা একই সাথে বিক্ষোভের সামনের সারিতে থেকে চিকিৎসা ও খাদ্য সরবরাহ, তহবিল সংগ্রহ, ব্যারিকেড টহলের মতো কাজ করেছে অন্যদিকে আইনি পরিষেবা প্রদানের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পাদন করে লড়াইয়ে অংশগ্রহণকারীদের সমর্থন দিয়ে যাচ্ছিলো।
সে সময় থেকে ইউক্রেন অনেক নাটকীয় পরিবর্তন এবং গণতান্ত্রিক সংস্কারের মধ্য দিয়ে গেছে। ২০১৪ সালের নভেম্বরে ইউক্রেনের পার্লামেন্টে সাতচল্লিশ জন মহিলা নির্বাচিত হয়েছেন। ইউক্রেন পার্লামেন্টের ১১ শতাংশ নারী নির্বাচিত হওয়া ছিলো দেশটির জন্য একটি রাজনৈতিক মাইলফলক। তারা স্বচ্ছ, জবাবদিহিতামূলক আরও সমৃদ্ধ ইউক্রেন গড়ে তোলার উদ্দেশ্য নিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলো।
২০১৯ সালের নির্বাচনের পর পার্লামেন্টে নারীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ২০ শতাংশে উন্নীত হয়, যা ইউক্রেনীয় বিষয়ে তাদের বৃহত্তর রাজনৈতিক ভূমিকাকে তুলে ধরে। ২০১৪ সাল থেকে রাশিয়ান আগ্রাসনের মোকাবিলায় নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ইউক্রেনীয় সশস্ত্র বাহিনীর ২০শতাংশ নারী এবং নতুন একটি আইনের অধীনে, যুদ্ধের পদে কাজ করার এবং পুরুষদের সমান পদোন্নতি অর্জনের অধিকার নিশ্চিত করেছে।
এছাড়া অনেক নারী আইন প্রয়োগকারী এবং অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থাগুলিতেও কাজ করে তাদের প্রতিশ্রুতি এবং দক্ষতা প্রদর্শন করছে।
জেলেনস্কি প্রশাসনের সাথে, উচ্চ পর্যায়ের মন্ত্রী পদে নারীর সংখ্যাও গুণগতভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। মর্যাদার লড়াইয়ের পর থেকে লিঙ্গ সমতা একটি উচ্চাকাঙ্খী লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাই নারীদের ক্ষমতায়নের জন্য অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিকভাবে আরও অনেক কিছু করা দরকার বলে অভিমত তাদের।

নতুনভাবে শুরু হওয়া রাশিয়ার পূর্ব ইউক্রেনে সংঘাতের ফলে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হওয়া ২০ লাখের বেশি নাগরিকদের সংকট নারীদের উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। কিন্তু তা স্বত্তেও তারা লড়াই করার ইচ্ছা হারায়নি। বিগত দশকে, গণতন্ত্রীকরণ প্রক্রিয়ায় অবদান রাখায় প্রশংসিতও হয়েছেন নারীরা।
ইউক্রেনের এই সাহসী নারীরা দেশের ভবিষ্যতের জন্য সমান অবদান রেখে চলেছেন এবং তারাই দেশটিতে অসাধারণ পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে রাডা কর্তৃক পাস করা নতুন আইন নারীদের নিবন্ধিত হতে এবং টেরিটোরিয়াল ডিফেন্স ফোর্সে সেবা দেওয়ার অনুমতি দেয়। যা একটি ইতিবাচক উন্নয়ন হিসেবে দেখা হয় এবং বিশ্বাস করা হয় এর মাধ্যমে ঐতিহ্যগত জেন্ডার নিয়মগুলোতেও পরিবর্তন আসবে। টেরিটোরিয়াল ডিফেন্স ফোর্সের জন্য আইন প্রণয়নকারী বেশ কয়েকজন নারী সংসদ সদস্য এখন নিজেরাই সামনের সারিতে কাজ করছেন।
ইউক্রেনের নাগরিক সমাজ ইউক্রেনের গণতান্ত্রিক উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি। মাত্র কয়েকদিন আগে, ইউক্রেনের নাগরিক সমাজের নেতারা রাশিয়ান ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে বোমা হামলার কারণে আন্তর্জাতিক সমর্থন চেয়ে কিয়েভ ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেছিলেন। সে ঘটনায় উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো চুয়ান্নটি স্বাক্ষরের মধ্যে ৫০ শতাংশই নারী।
বর্তমান ইউক্রেনের যে সংকট তা কল্পনার বাইরে এবং এর পরিণতি আরও ভয়ঙ্কর। কিন্তু যা অনিবার্যভাবে ঘটে চলেছে তা হল নারীরা অস্ত্র, মাইক্রোফোন, যুদ্ধের প্রচেষ্টাকে সমর্থন, তাদের পরিবারের ভরণপোষণ এবং প্রতিবেশী দেশে আশ্রয় নেওয়ার সময় তাদের সন্তানদের দায়িত্ব নেওয়ার মাধ্যমে ইউক্রেনের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। যুদ্ধে তাদের অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বও অনুপ্রেরণাদায়ক।
এ যুদ্ধ কীভাবে নারীদের জীবনে প্রভাব ফেলছে তা বুঝতে আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন জাতিসংঘ, ন্যাটো এবং ইউরোপের নিরাপত্তা ও সহযোগিতা সংস্থাগুলোর এই মর্মান্তিক মানবিক সংকটের দিকে আরও বিশেষ মনোযোগ দেওয়া উচিত। এই নারীদের কণ্ঠস্বর সবার কাছে পৌঁছে দেয়া হতে পারে একটি অনন্য কৌশল।
গণতান্ত্রিক দেশ গঠনের জন্য লড়াই করে যে নারীরা নতুন এক ইউক্রেন গড়েছে এবং তারা এখন নতুন যুদ্ধে অংশ নিয়ে তাদের পরিবার এবং দেশকে রক্ষা করছে। সরকার ও সুশীল সমাজের নারী নেতৃবৃন্দকে এই সংঘাতের সমাধান এবং একটি গণতান্ত্রিক ইউক্রেন গঠনের লক্ষ্যে সংঘাত পরবর্তী সকলদিক পুনর্গঠনে একত্রে কাজ করতে হবে।
লেখক: ডা. ভালবোনা জেনেলি জাতীয় নিরাপত্তা অধ্যয়নের একজন অধ্যাপক এবং জর্জ সি. মার্শাল ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর সিকিউরিটি স্টাডিজের স্ট্র্যাটেজিক ইনিসিয়েটিভ বিভাগের প্রধান।







