আনন্দি গোপাল জোশিকে ধরা হয় ভারতবর্ষের প্রথম নারী চিকিৎসক হিসেবে। নিশ্চিতভাবে সর্বপ্রথম না হলেও তিনি যে ভারতের একেবারে প্রথম নারী চিকিৎসকদের একজন, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আনন্দিবাই গোপালরাও জোশি ও আনন্দিবাই জোশি নামেও পরিচিত তিনি।
আজ এই ঐতিহাসিক নারীর ১৫৩তম জন্মদিন।
আনন্দি গোপাল জোশি ১৮৬৫ সালের ৩১ মার্চ ভারতের কল্যাণ (বর্তমানে মহারাষ্ট্রের থানে জেলায়) জন্মগ্রহণ করেন। তার জন্মের সময় বর্তমান মহারাষ্ট্রকে বোম্বে প্রেসিডেন্সি বলা হতো।
আনন্দি যোশির পূর্ব নাম ছিল যমুনা। বিয়ের আগ পর্যন্ত এ নামই ছিল তার। বিয়ের পর স্বামী গোপালরাও জোশির নাম তার নামের সঙ্গে যুক্ত হয়। তিনিই যমুনার নাম দেন আনন্দি।
আনন্দি যোশির পরিবার ব্রিটিশ শাসনামলে টানা বহু বছর জমিদার ছিল। কিন্তু ব্রিটিশদেরকে দফায় দফায় অতিরিক্ত পরিমাণে খাজনা দেয়া এবং বছরের পর বছর অর্থনৈতিক লোকসানের মুখে পড়ে যমুনার ছোট বয়সেই পরিবারটি চরম অর্থকষ্টে পড়ে যায়।
উনিশ শতকে ভারতবর্ষে চলমান প্রথা অনুযায়ী যমুনাকে অনেক ছোট বয়সেই বিয়ে দেয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগে তার পরিবার। যার ফল হিসেবে মাত্র নয় বছর বয়সে যমুনার বিয়ে হয় প্রায় ৩০ বছর বয়সী বিপত্মিক গোপালরাও যোশির সঙ্গে। যমুনা পরিবারের সঙ্গে যেখানে থাকতেন সেখানকার একজন পোস্টাল ক্লার্ক বা কেরানি ছিলেন গোপালরাও।
শিশু যমুনাকে বিয়ে করলেও গোপালরাও যোশি ছিলেন নারী শিক্ষার একজন দৃঢ় সমর্থক। ওই সময়ের সমাজের তুলনায় এ ধরনের চিন্তাধারা বেশ অস্বাভাবিক ছিল। আর এ কারণেই গোপালরাওকে তখন অতি প্রগতিশীল মনে করা হতো।
১৪ বছর বয়সে প্রথম মা হন আনন্দি। কিন্তু যথাযথ চিকিৎসা সেবা ও সুবিধার অভাবে তার সেই সন্তান মাত্র ১০ দিনের মাথায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। মাত্র ১৪ বছর বয়সে এত বড় আঘাতের মুখে পড়ে আনন্দি সিদ্ধান্ত নেন ভারতের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে কিছু করার। স্বামীকে জানান, তিনি একজন চিকিৎসক হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
গোপালরাও স্ত্রীর এ সিদ্ধান্তকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছিলেন এবং চিকিৎসা ক্ষেত্রে পড়াশোনার পুরো অর্থও দিয়েছিলেন।
আনন্দির স্বামী আমেরিকান মিশনারি বরাবর চিঠি লিখে আবেদন জানান, যেন আনন্দিকে যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসা বিষয়ক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ দেয়া হয়। এমনকি নিজে যেন স্ত্রীর পাশে থাকতে পারেন সেজন্য যুক্তরাষ্ট্রে নিজের জন্যও উপযুক্ত চাকরি খুঁজতে শুরু করলেন তিনি।
কিন্তু ১৮৮৩ সালে গোপালরাও যোশির হঠাৎ করেই বদলি হয়ে যায় শ্রীরামপুরে (বর্তমান পশ্চিমবঙ্গে)। আনন্দিকে তিনি অনেক কষ্টে রাজি করান যেন শিক্ষা গ্রহণের জন্য আনন্দি একাই যুক্তরাষ্ট্রে যান। স্ত্রীকে সাহস জুগিয়ে তিনি বলেন, আনন্দিকে হতে হবে উচ্চশিক্ষা গ্রহণে ভারতীয় নারীদের জন্য অনুপ্রেরণা।
আনন্দি গোপাল যোশি পেনসিলভানিয়ার উইমেন্স মেডিকেল কলেজে আবেদন করে পড়ার সুযোগও পেয়ে যান। তিনি কলকাতা থেকে জাহাজে করে নিউইয়র্ক পৌঁছান। মাত্র ১৯ বছর বয়সী মেডিকেলের প্রশিক্ষণ শুরু করেন তিনি।
আগে থেকেই কিছুটা ক্ষীণস্বাস্থ্য আনন্দি স্বাস্থ্য আমেরিকার ঠাণ্ডা আবহাওয়া এবং অনভ্যস্ত খাদ্যাভ্যাসের কারণে আরও খারাপ হতে থাকে। এমনকি এক পর্যায়ে যক্ষ্মায়ও আক্রান্ত হয়ে পড়েন তিনি।
কিন্তু এতকিছুর পরেও নিজের উদ্যম হারাননি আনন্দি। সব কষ্ট সহ্য করে তিনি মেডিসিনে এমডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
আনন্দির এই অনুপ্রেরণামূলক জীবনযুদ্ধ ভারতীয় গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের দিন ভারতের সম্রাজ্ঞী, ইংল্যান্ডের রানী ভিক্টোরিয়া তাকে আলাদা করে অভিনন্দন বার্তাও পাঠান।
আনন্দি ছিলেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে মেডিসিনে ডিগ্রি অর্জনকারী ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রথম নারী। তিনি এর মধ্য দিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ভারতীয় নারীদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য।
১৮৮৬ এক বিশাল আয়োজনের মধ্য দিয়ে দেশে স্বাগত জানানো হয় আনন্দিকে। তাকে কোলাপুর এর বিখ্যাত অ্যালবার্ট এডওয়ার্ড হসপিটালের প্রধান চিকিৎসক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়।

কিন্তু ১৮৮৭ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ২২তম জন্মদিনের মাত্র একমাস আগে যক্ষ্মায় মারা যান আনন্দি গোপাল জোশি। নারীদের জন্য আলাদা মেডিকেল কলেজ খোলার স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি তার। আনন্দির মৃত্যু ভারতের সব গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়ে ওঠে। পুরো দেশ কাতর হয়ে পড়ে আনন্দিকে হারানোর শোকে।
আনন্দিকে শ্রদ্ধা জানাতে নিউইয়র্কের পোকিপসি কবরস্থানে তার ভস্ম সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
আনন্দি যোশির সম্মানে এখনও প্রতি বছর লখনৌয়ের এনজিও ইনস্টিটিউট ফর রিসার্চ অ্যান্ড ডকুমেন্টেশন ইন সোশ্যাল সায়েন্সেস ‘আনন্দিবাই যোশি অ্যাওয়ার্ড ফর মেডিসিন’ নামে একটি পুরস্কার প্রদান করে আসছে। শুধু তাই নয়, মহারাষ্ট্র সরকার আনন্দি গোপাল যোশির নামে একটি ফেলোশিপও দিয়ে থাকে।
আনন্দির ১৫৩তম জন্মদিন উপলক্ষে টেক জায়ান্ট গুগল একটি ডুডলও তৈরি করেছে।







