বিপদাপন্ন প্রাণীর তালিকায় থাকা সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার আরও ঝুঁকিতে পড়তে যাচ্ছে জলদস্যুদের তৎপরতায়। অপরাধমূলক কাজ চালাতে নিজেদের এলাকা আরও বাড়াতে এবং স্থানগুলো নিরাপদ রাখতেই মূলত তারা চোরা শিকারে লিপ্ত হচ্ছে।
আবার ঔষধ তৈরিতে এবং অতিন্দ্রিয় ক্ষমতার উৎস হিসেবে বাঘের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ব্যবহারের প্রচলনও ঝুঁকিতে ফেলেছে বাঘকে। তাছাড়া স্থানীয়দের মাঝে গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে তাদের মঙ্গলেও হত্যা করা হচ্ছে বাঘ।
সুন্দরবনে বাঘ নিধনের এমন কারণগুলো উঠে এসেছে বিবিসিতে প্রকাশিত নিকি রাস্টের এক প্রতিবেদনে। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব কেন্টের সামিয়া সাইফ এবং তার সহকর্মীদের এক গবেষণা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে যা তৈরি হয়, যেখানে বাঘ চোরাশিকারের চারটি প্রধান কারণ উল্লেখিত হয়েছে। চলতি বছরের অক্টোবরে ওরিক্স জার্নালে গবেষণাটি প্রকাশিত হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, পূর্বে সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনটিতে অনেক বাঘের দেখা মেললেও এখন রয়েছে হাতেগোনা, মাত্র ১০০টি। ব্রিটিশ উপনিবেশকালে শিকারের ফলে ম্যানগ্রোভ বনটিতে বাঘের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে হ্রাস পায়। এরপর ১৯৭৪ সালে নিষিদ্ধ করা হলেও চোরাশিকারের ফলে বাঘের সংখ্যা কমছেই।
(১) বাঘ শিকারের প্রথম কারণ নিরাপত্তা বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। যেহেতু প্রতিবছরই বাঘের হামলায় নিহত হয় ৩০ জন মানুষ; (২) স্থানীয়দের গরু ধরে নিয়ে যাওয়ার কারণেও অনেকে ক্ষিপ্ত হয়ে বাঘ হত্যা করে; (৩) এছাড়াও বন্যপ্রাণীর অবৈধ বাণিজ্যও কারণ। প্রথাগত ঔষুধ তৈরিতে বাঘের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, ঘরের সাজসজ্জায় বাঘের চামড়ার বহুল চাহিদার কারণে পেশাদার চোরাকারবারিরা এতে আকৃষ্ট হয়। (৪) চতুর্থ এবং সর্বশেষ কারণটি হলো সংগঠিত জলদস্যুরা, যারা নিজেদের এলাকায় টহল দেয়, চাঁদাবাজি করে এবং জেলেদের অপহরণ করে। আরও একটা পরিচয়ও রয়েছে তাদের, তাহলো বাঘ শিকারি। 
স্থানীয় এক গ্রামবাসীর সূত্রে সাইফ জানায়, জলদস্যুরা বাঘ দেখলেই হত্যা করে। মাছধরার জাহাজের একজন মালিক জানায়, তার ১৭ জন লোককে জলদস্যুরা অপহরণ করেছিলো। তাদের একজন জলদস্যুদের ট্রলারে তিনটি বাঘের খুলি দেখে। অপহৃতরা তাদের বহুল চোরাশিকারের সাক্ষী।
জলদস্যুর জীবন থেকে ফিরে আসা একজন জানায়, বনের নতুন এলাকায় প্রবেশ করলে সে বাঘের পায়ের ছাপ খুঁজে দেখতো। আর তা পেলে বাঘকে খুঁজে বের করে গুলি করে হত্যা করতো সে।
জলদস্যুরা এখন পর্যন্ত কতটি বাঘ হত্যা করেছে তা স্পষ্ট নয়। এছাড়াও বাঘ হত্যা স্থানীয় সংস্কৃতিরও অংশ। স্থানীয়দের প্রতি মঙ্গলকামনার ইঙ্গিত স্বরূপও বাঘ হত্যা করে জলদস্যুরা। বিষয়টি অদ্ভুত ঠেকলেও জনমনে গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে তারা তা করে থাকে।
এই জলদস্যুদের ঠেকাতে ব্যর্থ স্থানীয় প্রশাসনও। আধুনিক অস্ত্র থাকায় এই জলদস্যুরা নিরাপত্তা রক্ষীদেরও তোয়াক্কা করে না। ২০০৯ সালে জলদস্যুরা দুইজন ফোরেস্ট গার্ডকে হত্যা করে। সেবছরই প্রকাশিত বাংলাদেশ টাইগার এ্যাকশন প্ল্যানে জঙ্গলের নিরাপত্তা বাড়াতে ওয়াইল্ড লাইফ ক্রাইম ইউনিট গঠনের সুপারিশ করা হয়।
তবে এদের সুস্থ জীবনে ফিরে আসার পথনির্দেশও করেন সাইফ তার গবেষণায়। চোরাশিকারিরা সফল ওয়াইল্ড লাইফ ট্র্যাকার হয়ে উঠতে পারে, বিশ্বের অন্যান্য জায়গায় এমন উদাহরণ রয়েছে। এমনটি সুন্দরবনের ক্ষেত্রেও ঘটতে পারে। যেহেতু তারা বন সম্পর্কে ভালো জানে।
জলদস্যুর জীবন ত্যাগ করার ইতিবাচক উদাহরণও সৃষ্টি হয়েছে সম্প্রতি। শাস্তি কমানোর সরকারের আশ্বাসের প্রেক্ষিতে আত্মসমর্পণও করেছে তারা। আরও কয়েকজন রয়েছে যারা এই জীবন ছেড়ে আসতে চান বলে সাইফ দেখতে পান।








