ইউরোপের বড় সব ফুটবল লিগই শুরুর অপেক্ষায়। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ ও ফ্রান্সের লিগ ওয়ান এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। সিরি অ, বুন্দেসলিগা ও স্প্যানিশ লা লিগাও প্রস্তুত। উয়েফার বিচারে এক নম্বর ফুটবল লীগ লা লিগা শুরু হচ্ছে ১৯শে আগস্ট। প্রথম খেলাতেই চ্যাম্পিয়ন রিয়াল মাদ্রিদকে খেলতে হবে প্রতিপক্ষ দেপোর্তিভো লা করুনার মাঠে। আর রানার্স আপ বার্সেলোনা প্রথম দিন নিজেদের মাঠে স্বাগত জানাবে রিয়াল বেটিসকে। মৌসুমের প্রথম এল ক্লাসিকো অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ২০শে ডিসেম্বর। আর ফিরতি এল ক্লাসিকো হবে ৬ই মে। রিয়ালের শিরোপা ধরে রাখা, বার্সেলোনার শিরোপা উদ্ধার, অ্যাটলেটিকোর ধারাবাহিকতা ধরে রাখা এমন অনেক প্রশ্ন সামনে রেখেই শুরু হচ্ছে এবারের লা লিগা।
রিয়ালকে থামাবে কে
কেউ কি মাদ্রিদকে থামাতে পারবে? নতুন মৌসুম শুরুর আগে এমনই প্রশ্ন বাতাসে ভাসছে। গত পাঁচ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো লা লিগা শিরোপা জেতে রিয়াল মাদ্রিদ। শিরোপা ধরে রাখার প্রশ্নে এবারও ফেবারিট দেখাচ্ছে জিদানের দলকে।
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে হারিয়ে উয়েফা সুপার কাপ জয়ের পর চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনাকে রীতিমত গুড়িয়ে দিয়ে স্প্যানিশ সুপার কাপও জিতে নিয়েছে রিয়াল।
২০১৭ মৌসুমজুড়ে দুর্দান্ত ছিলেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। সুপার কাপের প্রথম লেগেও বার্সার বিপক্ষে অল্প সময় খেলে গোল পেয়েছেন। কিন্তু লাল কার্ডের কারণে দ্বিতীয় লেগে খেলতে পারেননি। মাঠে নামতে পারবেন না লা লিগার চার ম্যাচেও। কিন্তু রিয়াল দেখিয়েছে রোনালদোকে ছাড়াও তারা কম যায় না। ম্যান ইউ ও বার্সেলোনার বিপক্ষে সিআর সেভেনের অভার বুঝতেই দেয়নি জিদানের অন্য সেনারা। বিশেষ করে মার্কো অ্যাসেসিও। রোনালদো অনুপস্থিতি তাকেই হয়তো সবচেয়ে বেশি লাভবান করবে।
রিয়ালের দায়িত্ব নেয়ার পর প্রতি ৯৭ দিনে একটি করে ট্রফি জিতেছেন জিদান। তারপরও নতুন মৌসুমকে ইঙ্গিত করে জিজু বলেছেন, কঠিন সময় আসছে। জেমস রদ্রিগেজ(বায়ার্না মিউনিখ) ও আলভারো মোরাতা(চেলসি) চলে যাওয়ার আক্রমণে কিছুটা ঘাটতি দেখা দেয় জিদানের। কিন্তু ম্যানইউর বিপক্ষে সেই ঘাটতি পুষিয়ে দেয়ার ইঙ্গি দিয়েছেন ‘ব্যালাস্টিক’ ইসকো। দুরন্ত পারফর্ম করে জিদানের চিন্তা দূর কারা পাশাপাশি সেদিন ম্যাচসেরা হয়েছিলেন তিনি।

রোনালদো, বেল ও বেনজামাদের পাশাপাশি বার্নাব্যুতে বিস্ময় এবং আস্থা বাড়াচ্ছেন অ্যাসেনসিও। মরক্কোর এই ফরোয়ার্ড এল ক্লাসিকোতে মাত্র ১৫ মিনিটেই বিপ্লব ঘটিয়ে দেন। রক্ষণে রামোসের সঙ্গে অসাধারণ খেলছেন কাসেমিরো।
রক্ষণ ও আক্রমণ ভাগের সঙ্গে সমান পাল্লা দিয়ে চলছেন গোলরক্ষক কাইলর নাভাস। মানইউ থেকে ডেভিড ডি গিয়াকে আনতে না পারলেও নাভাসের উপর আস্থা রাখছে ক্লাব ও সমর্থকরা। সব মিলিয়ে রিয়াল দেখাচ্ছে স্প্যানিশ ফুটবলে কিভাবে ফুল ফোটাচ্ছে তারা।
বার্সার গুছিয়ে ওঠার চ্যালেঞ্জ
বার্সেলোনা প্রাক-মৌসুমে এখন পর্যন্ত একটি ভয়াবহ অবস্থার মধ্যে আছে। নেইমারকে হারানোর মধ্যে দিয়ে ধাক্কার শুরু। এরপর স্প্যানিশ সুপার কাপে যাতেচ্ছাই হার। নেইমারের বিকল্প হিসেবে ফিলিপ কৌতিনহো বা উসমান ডেম্বেলেকে এখন পর্যন্ত দলে টানার ব্যর্থতা।
নেইমার দল ছাড়ার পর তারই স্বদেশী পাউলিনহোকে কিনেছে বার্সা। কিন্তু বিতর্ক উঠেছে এই ব্রাজিলিয়ানকে নিয়ে। পাউলিনহোকে ব্যর্থতার জন্য দুবছর বেঁচে দিয়েছিল ইংলিশ ক্লাব টটেনহ্যাম তাকেই কেন কিনল বার্সা। প্রশ্ন আছে তার খেলার মান নিয়েও। পাউলিনহো বার্সা ঘরানার সঙ্গে মানানসই কি না থাকছে সে প্রশ্ন। মেসির বয়স ৩০, রাকিটিচ ২৯ তারপরও সমবয়সী পাউলিনহোকে দলে নেয়াকে ভালভাবে দেখছে না সমর্থকরাও।
বর্তমান অবস্থার কারণে ক্লাবের সভাপতি জোসেফ মারিয়া বার্তেমেউ ঘড়িরকাঁটার সঙ্গে জনপ্রিয়তা হারাচ্ছেন। বলা হচ্ছে, এরই মধ্যে তিনি পূর্বসূরি সান্দ্রো রোসেলের চেয়ে কম জনপ্রিয় হয়ে গেছেন। সেইসঙ্গে দলের প্রাণভোমরা লিওনেল মেসিকে কিছুটা হতাশ ও ক্লান্ত মনে হচ্ছে।

একটা সময় বার্সেলোনার মূল আদর্শ ছিল লা মাসিয়ার খেলোয়াড়দের গড়ে নেয়ার পর মূল দলে খেলানো। কিন্তু এখন লা মাসিয়ানদের সেখানে মূল একাদশে প্রবেশ প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠছে। যার কারণে তরুণ খেলোয়াড়রা নিয়মিত খেলার জন্য বার্সা ছেড়ে অন্য জায়গায় চলে যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে নতুন মৌসুমে শিরোপা উদ্ধারের পথে কঠিন সময়ের মুখোমুখি হবে বার্সেলোনাকে। ট্রান্সফার উইন্ডো বন্ধ হওয়ার আগে ক্যাম্প ন্যুতে নিজস্ব মানের নতুন রিক্রুট করতে হবে তাদের।
অ্যাটলেটিকোর ধারাবাহিকতা
গত কয়েকটি মৌসুম ধরেই ধারাবাহিক পারফর্ম করেছে অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ। সেই ধারাবাহিকতার রাস্তা ধরে গ্রিজম্যান এবং সিমিওনের জুটি এবারও রিয়াল মাদ্রিদ এবং বার্সেলোনার পেছনে থাকা সেরা হতে পারে অ্যাটলেটিকো।
এবার মাঠে নামার আগে নতুন স্টেডিয়াম অপেক্ষায় আছে গ্রিজম্যানদের জন্য। কিন্তু লিগে তৃতীয় স্থানটা যেন তাদের জন্য এক রকম নির্ধারিত হয়ে গেছে। তবে এবার নতুন মাঠে নতুন করে এক নম্বর হওয়ার স্বপ্ন দেখতে পারে সিমিওনের দল।
চলতি দলবদলের ঝড়ের মধ্যে এখনও আছেন গ্রিজম্যান ও সিমিওনে। তারা দুজনেই দলে থাকায় সাহস যোগাচ্ছে অ্যাটলেটিকো সমর্থকদের। ২০০৪ সালের পর একমাত্র দল তো তারাই, যারা রিয়াল-বার্সার আধিপত্যে ছেদ ফেলতে পেরেছে। এই তারা দুটি ইউরোপা লিগ জিতেছে এবং দুবার উঠেছে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে।
নতুন মৌসুম সামনে রেখে শক্তি বাড়ানো চিন্তায় রয়েছে অ্যাটলেটিকো। পুরনো সৈনিক ডিয়েগো কস্তাকে চেলসি থেকে ঘরে ফেরানোর চেষ্টা করছে। যদিও ট্রান্সফার ফির জটিলতায় সেটি এখন আলোর মুখ দেখেনি। নতুন মাঠে এবার দর্শক ধারণ ক্ষমতা বেড়েছে। ফলে আয় বাড়বে অ্যাটলেটিকোর। আর্থিক লাভের সঙ্গে বাড়তি দর্শকদের সামনে ভাল ফলাফলের দায় থাকবে গ্রিজম্যানদের।

ব্যাটেল অ্যাট দ্য বটম বা শেষের যুদ্ধ
এই মৌসুমে লা লিগার শেষ পর্যন্ত ছয় বা সাতটি দলকে অবনমন অনিশ্চয়তার মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে। এর মধ্যে প্রথমবারের টপ ডিভিশনে উঠেছে জিরোনা। দ্বিতীয় বিভাগ থেকে সর্বোচ্চ গোল স্কোর করে উঠে আসায় প্রত্যাশার চাপ অনেক বেশি থাকবে তাদের উপর।
শঙ্কায় থাকবে গেটাফে। গত মৌসুমে বাজে পারফর্মেন্সের জেরে এবার প্লে-অফ খেলে লিগে জায়গা নিতে হয়েছে তাদের। খেলোয়াড়দের এখন পর্যন্ত যা অবস্থা তাতে গেটাফে নির্ঘুম রাত কাটাতে পারবে বলে মনে হয় না।
অবনমনের শঙ্কায় কাটাতে কতটা এগোতে পারবে লেভান্তে, লা করুনা, আলাভেজ ও আইবার প্রশ্ন থাকছে সেটা নিয়েও। ফুটবলটা মহান,তাই আশা-নিরাশা সত্ত্বেও ফুটবলটা উপভোগ করুন দর্শক।







