২০ বছর আগেও লড়াইটা ছিল বন্ধুত্বের সঙ্গে সম্প্রীতির। আইসিসির সাবেক প্রধান জগমোহন ডালমিয়া তখন বাংলাদেশকে পাদপ্রদীপের আলোয় আনার চেষ্টায় সহযোগীতার হাত বাড়ান। ১৯৯৯ সালে কেনিয়াকে তৃতীয় দল করে ঢাকায় ভারত-বাংলাদেশকে নিয়ে একটি ত্রিদেশীয় সিরিজ করার উদ্যোক্তাও ছিলেন তিনি।
২০০০ সালে বাংলাদেশ টেস্ট স্ট্যাটাস পায়, যাতে ভূমিকা ছিল আইসিসির তখনকার প্রধান ডালমিয়ার। ক্রিকেটীয় ক্ষমতার কেন্দ্র উপমহাদেশে রাখতে বদ্ধপরিকর ডালমিয়া এশিয়া থেকে আরেকটি টেস্ট দল বের করে আনতে চাচ্ছিলেন। ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে হারিয়ে সেই পথটা সহজ করে দিয়েছিল বাংলাদেশ।
এরপর একটা সময় পর্যন্ত সবকিছু ঠিকই ছিল। ডালমিয়া আইসিসিতে বাংলাদেশকে কথা বলার সুযোগ করে দিলেন। তার অভিভাবকত্বে ভারত হয়ে উঠল বাংলাদেশের বড় ভাই! কিন্তু ডালমিয়া যেটা করতে পারলেন না সেটা হল ভারতের মাটিতে টাইগারদের খেলার সুযোগ!
বাংলাদেশের সঙ্গে খেলা হলে সময়ের অপচয়, পৃষ্ঠপোষক পাওয়া যায় না, এমন সব খোঁড়া যুক্তিতে বিসিবিকে দূরে সরিয়ে রাখে ভারত। সেই ক্ষোভ একটা সময় জমতে জমতে বড় ভাইয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কটা হয়ে উঠল সৎ ভাইয়ের মতো। ভেতর ভেতর নিজেদের প্রস্তুত করা শুরু করল বিসিবি (বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড)।
বাংলাদেশ যে একটা দল হয়ে উঠছে ভারত সেটা টের পায় ২০০৭ সালের বিশ্বকাপে। তামিম ইকবাল নামের এক সদ্য কৈশোর পেরনো তরুণ জহির খানের মতো পেসারকে উইকেট থেকে বেরিয়ে এমন ছক্কা মারলেন, বিশ্বকাপ থেকে ভারতের ছিটকে যাওয়ার প্রতীক হয়ে রইল সেটিই। এর আগে ২০০৪ সালে বাংলাদেশের কাছে প্রথমবার হারের স্বাদ পেলেও ভারতের কাছে সত্যিকারের ক্ষত হয়ে থাকল বিশ্বমঞ্চে হার!
সেই হারের বদলা ২০১১ বিশ্বকাপে ঠিকই নিয়ে ছেড়েছে ভারত। দুই দলের সব তিক্ত সম্পর্ক চুকেবুকে গেছে, যখন ভাবা হচ্ছিল এমনই! তখনই মরা আগুনে ঘি ঢেলে দেয় ২০১৫ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল। মধ্যখানে ২০১০ সালে ‘বাংলাদেশ খুব সাধারণ এক দল, যারা ২০ উইকেট নিতে পারে না’ বলে যে আগুনটা জ্বালানোর চেষ্টা করেছিলেন বীরেন্দ্র শেবাগ, পরে ঢাকা টেস্টে ভারতের ১৮ উইকেট তুলে নিয়া সেই কথার ঠিকই জবাব দিয়ে ছেড়েছিল টাইগাররা।
এতকিছুর পরও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের তিক্ত সম্পর্কের শুরু ওই ২০১৫ বিশ্বকাপে। রোহিত শর্মার কোমরের নিচে বল নো ডেকে বিতর্কের শুরু করেন ইয়ান গৌল্ড ও আলিম দ্বার আম্পায়ারদ্বয়। পরে বিশাল এক শতক হাঁকিয়ে ম্যাচটা বাংলাদেশের হাত থেকে কেড়ে নেন রোহিতই। ম্যাচে মাহমুদউল্লাহর এক ক্যাচ যখন সীমানার দড়িতে দাঁড়িয়ে নিলেন ফিল্ডার রায়না, আর আম্পায়াররা আউট বলে দেন, তখন ক্ষোভে ফুঁসেছে লাল-সবুজের পুরো সমর্থক গোষ্ঠী। আদতে সেসময়ই জন্ম হয় পাকিস্তানের বাইরে ভারতের এক নতুন চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী। সঙ্গে ভারতীয় টিভি চ্যানেলের ‘মওকা মওকা’ নামের এক টিভি বিজ্ঞাপন বাংলাদেশি সমর্থকদের ক্ষোভের আগুনে পারদ হয়ে আসে!
বিশ্বকাপের পরপরই ঘরের মাটিতে ২-১এ ওয়ানডে সিরিজ জিতে সেই জ্বালা জুড়ায় বাংলাদেশ। সেই সিরিজ থেকেই বিশ্ব চিনল মোস্তাফিজুর রহমান নামের এক পেস প্রতিভাকে। প্রথম দুই ওয়ানডেতে ১১ উইকেট নিয়ে যিনি একাই ধসিয়ে দিয়েছিলেন ভারতকে। আর বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলে ‘মওকা মওকা’ নামের টিভি বিজ্ঞাপনের পাল্টা হিসেবে জন্ম নিয়েছিল ‘ব্যাম্বো ইজ অন’ নামের আরেক টিভি বিজ্ঞাপন।
২০১৫ বিশ্বকাপের জ্বালা কমেছে কী কমেনি। বাংলাদেশ-ভারত লড়াইয়ে তখনই আগুন জ্বালিয়ে যায় ২০১৬ সালে টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে গ্রুপপর্বের ম্যাচ ও এশিয়া কাপের ফাইনাল। টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে জয় থেকে ৩ রান দূরে থাকতে মুশফিকুর রহিমের উল্লাস ও পরে সেই ম্যাচে হারের পর ভারতীয় ক্রিকেটারদের পাল্টা জবাব ভোলেনি বাংলাদেশের সমর্থকরা। সেই বিশ্বকাপের সেমিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে ভারতের হারের পর মুশফিকের টুইট লড়াইটা জমিয়ে রাখে আরও। ওই বছরই এশিয়া কাপের ফাইনালে ভারতের কাছে হারের জ্বালা আছে বাংলাদেশের। আর চলতি বছরের শুরুতে ভারতের বিপক্ষে নিধাস ট্রফির শেষ ওভারের দুঃখ তো নতুন ক্ষতই জন্ম দিয়েছে টাইগার সমর্থকদের মনে।
এবারের এশিয়া কাপের শুরুতে অনেকের ধারণা ছিল পুরো টুর্নামেন্টই হতে চলেছে ভারত বনাম পাকিস্তানের লড়াই। সূচিটা সাজানোও ছিল সেভাবে। কিন্তু সব পাশার দান উল্টে দিয়ে ফাইনালে ভারতের প্রতিপক্ষ বাংলাদেশ। পরপর দুই এশিয়া কাপের ফাইনালে মুখোমুখি হতে চলছে এ দুই দল। তাতে যে ফাইনাল মোটেও ফিকে হবে না সেটির প্রমাণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দুই দেশের সমর্থকদের পাল্টাপাল্টি অবস্থান। মাঠের কথা তো তোলাই থাকল সময়ের হাতে। পাকিস্তানকে ছাপিয়ে ভারতের আসল প্রতিপক্ষ এখন মাশরাফীরাই, সেটা প্রমাণে মাত্র এক ধাপ দূরে টিম টাইগার্স। আর ফাইনালটা যদি চলেই আসে বাংলাদেশের ঘরে, তাহলে ভারতের সঙ্গে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীতায় নতুন এক মাত্রা যোগ হবে, সেটি না বললেও চলে!
**ক্রিকইনফো অবলম্বনে







