‘আপনার বিড়াল আছে, কিন্তু কুকুর নেই, সেক্ষেত্রে বিড়াল দিয়েই আপনাকে শিকারে যেতে হবে। আপনার একা লড়াই করা উচিত নয়।’
২০১০ সালের দিকে নালিশটা ছিল হোসে মরিনহোর। যাকে নিয়ে এই মন্তব্য সেই করিম বেনজেমা এক মৌসুম আগে লিওঁ থেকে রিয়াল মাদ্রিদে এসে চাপ সইতে না পেরে ধুঁকছেন। বিষয়টা মানতে কষ্ট হয়েছিল তখনকার লস ব্লাঙ্কোস কোচ মরিনহোর। তার মতে মাঠে শিকারী কুকুর অর্থাৎ, একজন দক্ষ ফরোয়ার্ড হওয়ার কোনো যোগ্যতা তখন ছিল না বেনজেমার!
মরিনহো হয়তো এখন সেই মন্তব্যের জন্য আফসোস করতে পারেন। হয়তো অতীত ভুলেও যেতে চাইবেন। কিন্তু স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম এএস সেটা হতে দিচ্ছে না। বেনজেমার গোল উদযাপনের বিশাল এক ছবি প্রথম পৃষ্ঠায় ছাপিয়ে গত বুধবার তারা শিরোনাম করেছে, ‘সেই বিড়াল এখন সিংহ!’
কীভাবে বিড়াল থেকে সিংহ হয়ে উঠলেন বেনজেমা? জানতে ফিরে যেতে হবে ২০১১ সালের দিকে। এক মৌসুমের ধাক্কা সয়ে ফরাসি ফরোয়ার্ড একটু একটু করে নিজেকে মেলে ধরতে শুরু করেছেন। রিয়ালের কোচ তখন ম্যানুয়েল পেল্লেগ্রিনি। বেনজেমা ওই মৌসুমে ৩২ গোল করলেন ঠিকই, কিন্তু সুবিধা করে উঠতে পারছেন না। কারণ, সব পারফরম্যান্সই যেন আড়ালে চলে যাচ্ছিল ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো নামের এক মহাতারকার আড়ালে। বাধ্য হয়ে তাই বলেই বসলেন, ‘আমি আর বিড়াল নই, আমি এখন সিংহ!’
রিয়ালের সমর্থকরা কখনই সেই কথা আমলে নেয়নি। বরং সময় সুযোগ পেলেই তাকে নিয়ে করেছে কটাক্ষ-সমালোচনা, দিয়েছে দুয়ো। এমনকি মাদ্রিদে অর্ধযুগ কাটিয়ে দেয়ার পরও সেটা কমেনি, বরং বেড়েছে। বেনজেমার গোলগুলো তাদের চোখে পড়েনি, গোল করতে ব্যর্থ হওয়া বেনজেমার সমালোচনা নিয়েই বরং ব্যস্ত সকলে। বাধ্য হয়ে মুখ খুলতে হয়েছে রোনালদোকে। ২০১৮ সালে রিয়াল সোসিয়েদাদ ম্যাচে ৫-২ গোলে জেতার পরও তাকে বলতে হয়েছে, তার সতীর্থকে যেন দুয়ো না দেন রিয়াল সমর্থকেরা।
সেই রোনালদো আজ জুভেন্টাসে। কিন্তু তার কথা মানতে বাধ্য হচ্ছে রিয়াল সমর্থকরা। বলা ভালো বাধ্য করেছেন বেনজেমাই। ২০০৯ সালে লিওঁ থেকে আসার পর এই প্রথম যেন ফরাসি ফরোয়ার্ডের অস্তিত্ব চোখে পড়ছে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর দর্শকদের। রোনালদোবিহীন রিয়াল মাদ্রিদ যে এ মৌসুমে এখন পর্যন্ত পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে, তার পেছনে একক কৃতিত্ব দাবি করতেই পারেন বেনজেমা!

একটা পরিবর্তন যে হয়েছে সেটা টের পাওয়া গেছে রোনালদোর জুভেন্টাসে চলে যাওয়ার পরপরই। কারণ পর্তুগিজ ফরোয়ার্ড যতদিন ছিলেন, বেনজেমার কাজ ছিল গোল করা নয়, রোনালদোকে দিয়ে করানো। তিনি নিজেও যে একজন ফরোয়ার্ড সেটা যেন ভুলতে বসেছিলেন বেনজেমাও।
সেটি নিয়ে একাধিকবার প্রকাশ্যে হতাশা প্রকাশ করতে দেখা গেছে বেনজেমাকে। আরএমসি স্পোর্টকে সাক্ষাৎকারে একবার বলেও দিয়েছেন, ‘আপনার যদি একটা রকেট (গ্যারেথ বেল) আর একজন গোলস্কোরার (রোনালদো) থাকে তখন আমার মতো খেলোয়াড় দিয়েই বৃত্তটা পূরণ করা সম্ভব।’
‘যখন রোনালদোর মতো একজন ফিনিশার থাকে তখন আমাকে বাধ্য হয়ে ভিন্ন ভূমিকায় খেলতে হয়। তখন আমাকে নিজের জায়গা ধরে রেখে অন্যের জন্য খেলা বানিয়ে দিতে হয়।’
রিয়ালে এখন রোনালদো নেই। অন্যের জন্য খেলা না বানিয়ে নিজেই এখন পরিপূর্ণ ফরোয়ার্ড হয়ে খেলার স্বাদ পাচ্ছেন রিয়ালের ‘নাম্বার ৯’। কোচ হিসেবে পাচ্ছেন স্বদেশী জিনেদিন জিদানকে। চলতি বছর দ্বিতীয়বারের মতো জিজুর রিয়ালের ডাগআউটে ফেরার পর লা লিগার শেষ ১৫ ম্যাচে ১৩ গোল করেছেন বেনজেমা। ২০১৯ সালে স্পেনে তার চেয়ে কেবল এগিয়ে আছেন লিওনেল মেসি। আর পুরো ইউরোপজুড়ে রবার্ট লেভানডোভস্কি ও কাইলিয়ান এমবাপে আছেন বেনজেমার চেয়ে এগিয়ে।
খেলার জন্য এখন স্বাধীনতা পাচ্ছেন বেনজেমা, পাচ্ছেন বিস্তৃত জায়গা। বাতাসেও বেশ দক্ষ হয়ে উঠেছেন। ২০১৯ সালে নয়টি গোল এসেছে হেডের মাধ্যমে।
রিয়ালের জার্সি গায়ে বেনজেমার গোল এখন ২২৭। ক্লাবের ষষ্ঠ সর্বোচ্চ গোলসংগ্রাহক তিনি। সামনে যে গোলের পরিমাণ আরও বাড়বে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে বেনজেমার বয়সের দিকে তাকালেই জাগে চমক। তার বয়স এখন ৩১। যে সময়টাতে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স থাকে পড়তির দিকে। তখনই যেন আরও পূর্ণতা পাচ্ছেন এ ফরোয়ার্ড। যেন মরিনহোর কথাই ফলে গেছে। বিড়াল থেকে আস্তে আস্তে সিংহ হয়ে উঠেছেন বয়সের সঙ্গে পারফরম্যান্স দিয়ে। সেটা প্রমাণ করে চলেছেন ‘বেনজি’!








