ভ্যাট আরোপের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে আগের অবস্থান থেকে সরে এসেছেন অর্থমন্ত্রী। এনবিআরও তাদের আগের বক্তব্য থেকে সরে এসেছে। তারপরও পরোক্ষ কর হিসেবে সাধারণভাবে যেহেতু ভোক্তাই পণ্য এবং সেবার জন্য ভ্যাট পরিশোধ করেন তাই এক্ষেত্রে আসলে শেষ পর্যন্ত কার পকেট থেকে সরকারি কোষাগারে মূসকের টাকা যাবে তা নিয়ে বিভ্রান্তিও ছড়িয়ে পড়েছে।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, এখন চাপে পড়ে তারা এরকম বলছেন। দু’ মাস পর যে আবার অন্য কথা বলবেন না তার নিশ্চয়তা কোথায়!
নাম প্রকাশ না করে ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির এক শিক্ষার্থী বলেন: এরকম না যে আমরা আজ হঠাৎ রাস্তায় নেমেছি। গত চারমাস ধরে আমরা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করছিলাম। গতকাল পুলিশ আমাদের ওপর গুলি করায় আজ ব্যাপকভাবে আমরা রাস্তায় নেমে আসি। এখন উনারা (অর্থমন্ত্রী এবং এনবিআর) বলছেন যে আমাদের ভ্যাট দিতে হবে না। এতোদিন তারা চুপ ছিলেন কেনো? আসলে আমাদের অভিভাবকদের পকেট থেকেই তারা টাকা নিতে চান। তা না হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যখন নোটিশ দিয়ে টাকা আদায় করছিলো তখনই তারা বলতে পারতেন কে ভ্যাট দেবে।
মাসখানেক আগে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত যে কথা বলেছিলেন সেটা মনে করিয়ে দিয়ে এই শিক্ষার্থী পত্রিকায় প্রকাশিত অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য দেখিয়ে জানান, তিনি (মুহিত) বলেছিলেন: টিউশন ফি’র ওপর যে ভ্যাট তা শিক্ষার্থীদেরই পরিশোধ করতে হবে।
গত ১৪ জুন সিলেটে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘তারা মাসে ৫০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা বেতন দিতে পারলে মাত্র সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট কেনো দিতে পারবে না!’
ওই সময় পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে অর্থমন্ত্রী একবারও বলেননি যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে মূসক পরিশোধ করতে হবে।
সেই অান্দোলন ব্যাপক হয়ে উঠার পর আজ সেই সিলেটে বসেই অর্থমন্ত্রী বলেছেন: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভ্যাট প্রত্যাহার হবে না, ভ্যাট দিতে হবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে। এজন্য শিক্ষার্থীদের ফি বাড়ানো উচিৎ নয়।
আরেক শিক্ষার্থী একথাও মনে করিয়ে দেন, অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় বলেছিলেন, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের মতোই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজগুলোকে ভ্যাট দিতে হবে। ‘কে না জানে যে ওই ভ্যাট পে করতে হয় শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের! অথচ অর্থমন্ত্রী আজ ভিন্ন কথা বলছেন।’
অর্থমন্ত্রীর আজকের বক্তব্যই প্রতিফলিত হয়েছে রাজস্ব বোর্ডের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে যেখানে এনবিআর বলেছে: ভ্যাট আরোপের কারণে টিউশন ফি বাড়ার সুযোগ নেই। বর্তমান টিউশন ফি’র মধ্যেই ভ্যাট অন্তর্ভুক্ত আছে। ভ্যাট পরিশোধের দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের, শিক্ষার্থীদের নয়।
অথচ, শিক্ষার্থীরা বলেন, গত চারমাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড একবারও বলেনি যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ভ্যাট পরিশোধ করতে হবে এবং এজন্য ছাত্র-ছাত্রীদের টিউশন ফি বাড়ানো যাবে না।
বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রাজস্ব বোর্ডের বরাতে ভ্যাট আরোপ করলেও বোর্ডের পক্ষ থেকে কখনোই কোনো আপত্তি জানানো হয়নি বলে তারা জানান।
কারণ হিসেবে রাজস্ব বোর্ড কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে চ্যানেল অাই অনলাইনকে বলেছেন, ভোক্তা বা সেবা গ্রহীতা ভ্যাট পরিশোধ করেন এটাই নিয়ম। তাই এ নিয়ে এনবিআরের কোনো বক্তব্য ছিলো না।
‘এখন যেহেতু আন্দোলন গড়ে উঠেছে তাই নতুন ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে,’ বলে মন্তব্য করেন এক কর্মকর্তা।
তবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ভ্যাট পরিশোধ করতে নতুন যে ব্যাখা তাও সমালোচিত হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ আবু আহমেদ চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: সাধারণতঃ পণ্য ও সেবাখাতে ভ্যাট আরোপিত হয়। শিক্ষা কিন্তু সে অর্থে কোনো কমোডিটি বা সেবা নয়। আর সেভাবে তা বিক্রিও হচ্ছে না।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে মন্তব্য করে এই অর্থনীতিবিদ বলেন: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালিত হওয়ার কথা ট্রাস্টের মাধ্যমে। এজন্য এসব প্রতিষ্ঠানকে সেভাবে লাভজনক প্রতিষ্ঠান বিবেচনা করার যৌক্তিক কারণ আছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।
একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের গুলি এবং তার জের ধরে রাজধানীতে সড়ক অবরোধের ঘটনায় সরকারের অদূরদর্শীতাকে দায়ী করেছেন আবু আহমেদ।
তিনি বলেন,‘ আজ যে কথা অর্থমন্ত্রী এবং রাজস্ব বোর্ড জানালেন, তা আগে বলে দিলে কিংবা ব্যাখ্যা দিলেই হতো’।
তবে তিনি সামগ্রিক পরিস্থিতির জন্য কিছু অসাধু বাণিজ্যিক মানসিকতার বিশ্ববিদ্যালয়কেও দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান এনবিআর-এর ব্যাখ্যার অভাবকে কাজে লাগিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর ভ্যাটের বোঝা চাপিয়ে দিতে চেয়েছিলো। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আতঙ্কিত হওয়াটাই স্বাভাবিক।
একেক বিশ্ববিদ্যালয়ে একেক রকম বেতন-ফি থাকারও সমালোচনা করে তিনি বলেন,‘ভ্যাট আরোপ করায় এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের বরং সুবিধা হয়েছে। ইচ্ছামতো বেতন-ফি বাড়ানোর সুযোগ পেয়েছে তারা। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকেও এখন আর ‘সার্টিফিকেট ব্যবসা’র জন্য উচুঁ গলায় কিছু বলাও যাবে না। কারণ তারা তখন বলবে আমরা তো ভ্যাট দেই।







