অরল্যান্ডোর ক্লাবে হামলার ঘটনা নিয়ে সোচ্চার সারাবিশ্ব। সেই বিষয় নিয়েই এবার ফেসবুকে পোস্ট দিলেন প্রবাসী শিক্ষক ও গবেষক সেজান মাহমুদ। ফেসবুক পোস্টে তিনি লিখেছেন, শহরের এলজিবিটি ক্লাব ‘পালস’-এ গুলি করে ৫০ জনকে হত্যা, ৫১ জনকে আহত করেছে ‘ওমর সিদ্দিক মতিন’ নামের একজন। আপনারা জানবেন সে কে, কেন এই কাজ করেছে। এখানে তার ধর্ম বিশ্বাস কোনো ভূমিকা রেখেছে কি না, কেউ কেউ ষড়যন্ত্র তত্ত্ব খুঁজবে, মুসলমানদের বিরুদ্ধে ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি এই ঘটনা নিয়ে বলার আগে মাত্র দুই সপ্তাহ আগে আমার একটা অভিজ্ঞতা বলি;
আমার শহরের এক মুরব্বি তাদের বাড়িতে দাওয়াত করেছেন। তিনি মসজিদ কমিটির প্রেসিডেন্ট ছিলেন, পড়ালেখা করেছেন ভারতের আই আই টিতে, কিন্তু কথাবার্তায় অনেক লিবারেল মানুষ, আমার সঙ্গে প্রায়ই ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত নিয়ে আলোচনা হয়। আমরা তাদেরকে খুব শ্রদ্ধাও করি। সেই ভাবির রান্না এতো ভালো যে আমার ছেলেরা পর্যন্ত সেই বাসার দাওয়াত হলে বলবে, উই লাভ দ্যাট অ্যান্টি’স কুকিং। সেই ভাবি ফোনে বললেন, শুধু ছাত্রদের দাওয়াত দিয়েছি আর দু’একজন আপনাদের মতো।
সেখানে গিয়ে দেখলাম সব ছাত্রেরা নেই। বিশেষ করে ছাত্রদের মধ্যে যারা একটু লিবারেল তাদের কেউ-ই নেই। বেশির ভাগ-ই ধার্মিক, প্রাক্টিসিং মুসলমান। এর মধ্যে ফিজিক্স-এ পিএইচডি করছে এমন একজনের সঙ্গে আমার কথোপকথনের একাংশঃ
(কথা প্রসঙ্গে একজন লেখালেখি নিয়ে জিগ্যেস করায় আমি আমার সায়েন্স ফিকশনের কথা বললাম) তখন সেই ছাত্রের কমেন্ট, আপনাদের মতো পপুলার সায়েন্স যারা লেখে তারাই সায়েন্সের বড় ক্ষতি করে।
কীভাবে? (আমি জিজ্ঞেস করি)
একজন বিখ্যাত ফিজিসিস্ট বলেছেন যা এক্সপেরিমেন্ট দিয়ে প্রমাণ করা যায় না তা যতো ভালো আইডিয়া হোক তার কোনো মূল্য নেই।
আমি জানি এই কথাটা কোন ফিজিসিস্ট বলেছেন। কেন বলেছেন, কখন বলেছেন। আমি ইচ্ছে করেই বলি, এই কথা যতো বড় বিজ্ঞানী-ই বলুক না কেন তিনি একজন ‘গর্দভ’ যদি তিনি তোমার মতো করে এটা বলে থাকেন।
কী? আপনি ফাইনম্যান কে গর্দভ বলছেন?
তুমি যেভাবে তার কথাটা উপস্থাপন করলা সেইভাবে বললে তিনি গর্দভ। কিন্তু আমি জানি তিনি সেভাবে বলেননি। তুমি কন্টেক্সট এর বাইরে এনে কথাটা বলছো। পৃথিবীর সব কিছু কি এক্সপেরিমেন্ট করে প্রমাণ করা যায়? আইনস্টাইনের অর্ধেক তত্ত্ব ছিল যা প্রমাণ করা যেতো না, এখনকার অর্ধেক কেন নব্বইভাগ ধারণা এই মহাবিশ্ব নিয়ে প্রমাণ করা যাবে না। আইনস্টাইন নিজেই বলেছেন ‘ইমাজিনেশন ইজ মোর পাওয়ারফুল দেন নলেজ’। তাহলে কেন বলছ আমার মতো পপুলার সায়েন্স রাইটাররা বিজ্ঞান কে নষ্ট করছে? জুল ভার্ন যখন সাবমেরিন বর্ণনা করেছিলেন, টাইম মেশিন বর্ণনা করেছিলেন তখন সবি ছিল কল্পনা আর এখন অনেক কিছুই বাস্তব, কল্পনা না থাকলে আবিষ্কার হয়?
আমি জানি এগুলোর সঠিক উত্তর আসবে না। বাধ্য হয়েই অপ্রিয় প্রশ্নটা করি- তাহলে ঈশ্বর বা আল্লাহতে বিশ্বাস করো কেন? এটা তো এক্সপেরিমেন্ট করে প্রমাণ করতে পারবে না?
আমি জানি এখন উত্তেজনা বাড়বে। এবং আলোচনা চলতে থাকে ধর্মগ্রন্থে বিজ্ঞানের কি কি আছে এই জাতীয় সত্যিকার হাস্যকর কথাবার্তায়, ধর্ম না থাকলে এথিক্স থাকবে কীভাবে এইসব প্রশ্ন করলো আরেক ছাত্র। আমি বললাম ‘এথিক্যাল থিওরি’ আমি পড়াই, সুতরাং তোমাদের তর্ক করার ইচ্ছা থাকলে এগুলো জানতে পারো, কিন্তু তোমাদের প্রিমিটিভ লেভেলের কথাবার্তার সঙ্গে আমি তর্ক করতে চাই না। তবুও আলোচনা চলতে চলতে এক পর্যায়ে বুঝাতে চেষ্টা করলাম যে ঈশ্বর বা আল্লাহ মহান। তিনি জানবেন কে ভালো আর কে মন্দ। পৃথিবীর সাত বিলিয়ন লোকের সবাই তো মুসলমান না তাহলে তারা কি ভালো মানুষ না?
সেই ছাত্র অনেকটা লাফ দিয়ে আমার পাশের চেয়ার এসে দাঁত মুখ খিচিয়ে বলে, আল্লাহ মহান তা আপনি বলার জন্যে না। আল্লাহ নিজেই বলেছেন তিনি মহান।
আমি বললাম, আমিও তাই বললাম। আল্লাহ মহান তা নিজেই বলেন। এখন বলো এই বিশ্বের সাত বিলিয়ন লোকের এক বিলিয়ন বা একটু বেশি মুসলমান, বাকি ছয় বিলিয়ন অন্য ধর্মের। সেই ছয় বিলিয়ন লোকের প্রতি বছর যে বাচ্চা কাচ্চা হয় তাদের তো নিজেদের ধর্মের ব্যাপারে কোনো হাত নেই। আল্লাহ-ই তাদের জন্ম দিচ্ছেন বিধর্মীদের ঘরে। তাহলে তারা কেন খারাপ হবে?
যথারীতি উত্তর নেই। কিম্বা উত্তর হলো, তারা বড় হয়ে ভালো ধর্ম বেছে নেবে। এদের মানুষের সংস্কৃতি, বেড়ে ওঠা এগুলো নিয়ে কোনো বাস্তবসম্মত ধারণাই নেই। ধর্মের ব্যাপার এলেই এরা অন্ধ হয়ে যায়।
এরপর সেজান মাহমুদ আরো লিখেন, হ্যাঁ, এবার আসল কথায় আসি। এই ছেলেটি আমেরিকায় যখন আসে তখন শান্তশিষ্ট একটি ছেলে ছিল, কোনো কথাই বলতো না। আমেরিকার স্বাধীনতা, অর্থ ভোগ করে ফিজিক্সে একটা ডিগ্রী নিচ্ছে, কথায় কথায় ফাইনম্যান, কোয়ান্টাম ফিজিক্সের রেফারেন্স দিচ্ছে, রেফারেন্স দেবে, কিন্তু অন্তরে বিশ্বাস করে (নিজেই বলেছে) ইসলাম রাজনীতি থেকে আলাদা না এবং একে প্রতিষ্ঠা করতে যে কোনো যুদ্ধেরও দরকার আছে। এই ছেলের ইতিহাস নিলে হয়তো বের হয়ে আসবে জামাত বা এরকম কোনো ধর্মীয় দলের অনুসারী না হলেও সিমপ্যাথিটিক। এদের মতো মানুষদের মধ্য থেকেই কিন্তু সাড়ে চার হাজার লোক আইসিসে যোগ দিয়েছে। এরা সুযোগ পেলে যে একদিন এই ওমর মতিনের মতো এলজিবিটি বা সেক্যুলার মানুষদের মারতে আসবে না, তার কি নিশ্চয়তা? আর ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো কেউ যদি বলে এদের আমেরিকায় ঢুকতে দেয়া উচিত নয়। তাহলে দোষ দিতে পারবেন? সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো আমেরিকায় বসবাসকারী প্রায় অর্ধেকের বেশি মুসলমান এক্সট্রিমিস্ট দলগুলোর প্রতি নানান কারণে সমবেদনা পোষণ করে (পিউ রিসার্চের সার্ভের মতে)।
আমি আগেও বহুবার বলেছি, ধর্ম হোক আর যাই হোক, যা মানুষ কে ঘৃণা শেখায়, হত্যা করতে শেখায় তা কোনোদিন মহৎ কিছু নয়। মহত্ব মানুষকেই অর্জন করতে হয়। একমাত্র মানবিকতা, ভালবাসা দিয়েই সেই মহত্ব আসে। ধর্ম যদি পালন করতে চান তাহলে সেই মহত্বের দিকগুলোকে সামনে আনুন। না হলে ইতিহাস হবে আস্তাকুঁড়ে।







