আমি তখন একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় সহকারী সম্পাদক হিসেবে কাজ করি। সর্বসাকুল্যে বেতন পাই পনেরো শ টাকা। নব্বই সালের শেষ দিককার কথা বলছি। সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মহিবুর রহিম বাবুল ছিলেন সেই সাপ্তাহিকের সম্পাদক। সাপ্তাহিকের নাম ‘প্রতিশ্রুতি’।
অফিসটা ছিল বাসস ভবনের পেছনের দোতলা বিল্ডিঙের দু’রুমের এক অফিস ঘর। সেসময় আমার কলিগ ছিলেন সদাহাস্য ‘কিম্পুরুষ’ উপন্যাসের স্রষ্টা শক্তিমান গল্পকার-সাংবাদিক, অভিনেতা, নাট্যকার বিপ্লব দাশ, শিশুসাহিত্যিক আমীরুল ইসলাম ও গবেষক আহমাদ মাযহার, ছড়াকার আসলাম সানী, গল্পকার সাইদুজ্জামান রওশন। মাঝে মাঝে আমাদের অফিসে আসতেন আরেক বিখ্যাত ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটন। আমাদের রিটন ভাই। পুরান ঢাকার বাসিন্দা বলে আমরা তিনজন একসঙ্গে হলেই আমরা নিজেদের মধ্যে ঢাকাইয়া ভাষায় কথা বলতাম।
সাপ্তাহিক প্রতিশ্রুতি অফিসে তখন অনেকেই আসতেন। তবে একজনের কথা এখনও বেশ মনে আছে। ভদ্রলোক কথা বলতেন ডবল স্পেস দিয়ে প্রায় তোতলাতে তোতলাতে। তিনি যখন কথা বলতেন তখন তার চোখ দুটো চাকমা মানুষদের মতো ছোট হয়ে আসত। তিনি যখন কথা বলতেন তখন আমরা বেশ অস্বস্তির মধ্যেই পড়ে যেতাম। তিনি যখন নকুল দানার মতো চোখ করে ডবল স্পেস দিয়ে কথা বলতেন তখন তার প্রতি আমাদের এক ধরনের করুণা ( বিরক্তিও…) শত ধারায় প্রসারিত হতো আর আমরা মনে মনে বলতাম, ‘আরে ব্যাটা তোতলার পো তোতলা, এত কষ্ট কইরা তোরে কোন হালায় কইছে রাজনীতি লয়া আমাগোর সামনে পণ্ডিতি মারাইতে? আর কোন মামদার পো-ই বা তরে কন্টাক দিছে এইসব গালগল্প করতে…!’
তো সেই তোতলা গোছের ভদ্রলোকটি মাঝে মাঝে আমাদের অফিসে আসেন। চা খান। তারপর আমরা কেউ শুনতে চাই বা না চাই তিনি প্রায় গোত্তা খেয়ে দেশের চলমান রাজনীতি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন। বেশ ভাব নিয়ে রাজনীতির ওপর ভর দিয়ে বিশ্লেষণ শুরু করে দেন। বিপ্লব দাশ আমাদের পত্রিকায় রাজনৈতিক ধারাভাষ্যসহ নিয়মিত একটি রম্যও লিখতেন ‘বিপ্লব দাশ এমনিবাশ’ নামে। বিপ্লব দা লেখার সময় কথা বলতে বা শুনতে পছন্দ করতেন না। কেউ কথা বললে নিজের লেখা লিখে যেতেন আর ভেতরে ভেতরে ভীষণ বিরক্ত বোধ করতেন। ডবল স্পেসের ভদ্রলোকের কথায় বিরক্তিতে আচ্ছন্ন বিপ্লব দা একসময় তার একটা নাম দিয়েছিলেন, সব জান্তা শমসের…।
সব জান্তা এই শমসের ‘দৈনিক আন্ধারমানিক’, দৈনিক গার্বেজ’ টাইপ মার্কা পত্রিকার সম্পাদকীয় পেজে রাজনীতির বিশ্লেষণ-টিশ্লেষণ করে কঠিন ভাষায় সব লেখা লেখেন। কোন একটা পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগে বিনা বেতনসহ প্রায় পেটে ভাতে কাজ করেন- এসবই শোনা কথা। সফেদ পাজামা পাঞ্জাবীতে তার মেধার যেন কোনো অন্ত নেই। সম্পাদকীয় টাইপের কঠিন কঠিন বিষয়ের বাইরে গিয়েও এই প্রতিভাবান নিজ প্রতিভার স্বাক্ষরও রাখেন ‘ অস্ট্রেলিয়ার কাক কেন সাদা’, ‘সত্যজিতের সিনেমার শিল্প মূল্য’, ‘মানুষের পূর্বপুরুষের বাস কোথায়’- ‘লাকি খানের ঝাঁকি নৃত্য’ জাতীয় মার্কা কাট পিস ধরনের ফিচার লেখেন। শুধু কি তাই! ‘রবীন্দ্রনাথের যৌন দুর্বলতা’, ‘মেরিলিন মনরোর দেহ সৌষ্ঠবের আসল রহস্য’, ‘ কবরীকে প্রথম যেদিন দেখি’, বাংলা সিনেমার গন্তব্য কোথায়?’ শিরোনামে প্রবন্ধ লেখেন। আমাদের অফিসে এসে তিনি নিষ্ঠার সাথে সেসব লেখার ফিরিস্তি দেন। পারলে সেসব লেখার কাটিং পর্যন্ত দেখান। আমরা তার এসকল কর্মকাণ্ড নিষ্ঠার সঙ্গে শুনি আর দেখি। দেখি আর শুনি।
একদিন লোকটা আমার পাশে এসে বসে বেশ আলাপ জুড়ে দিলেন। আমি তখন ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলা, সংবাদে, আজাদ, আমার দেশ পত্রিকায় নিয়মিত গল্প-ফিচার লিখি। খেলাঘর, কচিকাঁচার আসর, চাঁদের হাঁটের সাহিত্য সভা করি। এসব খবর সে জানে।
কথা বলতে বলতে একসময় তিনি গলাটাকে বেশ ভারী করে ঢাকাই সিনেমার বাবা চাচা চরিত্রে অভিনয় করা শওকত আকবরের মতো ভাব নিয়ে আমাকে (যেহেতু অফিসে আমি বয়সে সবার ছোট) বললেন, ‘জানো মাহবুব আমিও না একসময় তোমাদের মতো গল্প-টল্প, ছড়া-টড়া লিখেছি। এতদিন পর এখন তোমাদের দেখে ভাবছি সেসব নিয়ে বই-টই বের করব কিনা!’
গল্প-ছড়া তো বুঝলাম, টল্প-টড়া আবার কী জিনিস!
আপনার ভিত্তে এত প্রতিভা! এই প্রতিভা এতদিন বাক্সবন্দী কইরা রাইখা দিছেন? খুব অন্যায়, খুব অন্যায় – ভেতরে ভেতরে একথা বললাম ঠিকই কিন্তু প্রকাশ্যে তাকে বললাম,
‘ দেরি না করে শিগগিরই আপনার ভেতরের এই মাল বই-টই করে আউট করা উচিত।’
আমার কথা শুনে বিপ্লব দাশ শরীরে কাপন লাগা এক ধরনের হাসি দিলেন।
‘সমস্যায় পড়েছি বইয়ের নাম নিয়ে-’
‘কী নাম রেখেছেন?’
‘অনেক নামই তো দিলাম মাহবুব কিন্তু কোনোটাই পছন্দ হচ্ছে না-’
আমাদের কথাবার্তার মধ্যে বিপ্লব দা ঢুকলেন,
‘দাদা বইয়ের নাম নিয়ে সব বিখ্যাত লেখকরাই সমস্যায় পড়েন, আপনিও পড়বেন- এটাই নিয়ম। তবে বইয়ের নাম দিতে সাধনা করতে হয়।’
বোঝা গেল বিপ্লব দার কথায় ভদ্রলোক বেশ আশ্বস্ত হয়েছেন।
‘জি দা দা আপনি ঠিক বলেছেন। আমার বইটার একটা নাম আপনিই দিয়ে দেন- ’ বলে তিনি মুখে এক ধরনের বানানো কৃত্রিম হাসি ঝুলিয়ে রাখলেন। ভদ্রলোক আমাদের অফিস থেকে নিষ্ক্রান্ত হলে বিপ্লব দাকে বললাম, ‘দাদা আপনে তো ভেজাল কইরা দিলেন।’
বিপ্লব দা সবসময় শিশুর সারল্যে হেসে হেসে কথা বলতেন। তিনি আমাকে বললেন,
‘কেন রে কী ভেজাল করলাম আমি!’
‘এই যে সব জান্তা শমসেরের বইয়ের নামের দায়িত্ব যে নিলেন-’
বিপ্লব দা হেসেই চলেছেন,
‘নাম তো তখনই আমার মনে আইসা গেছিল মাগার হের সামনে কইবার পারি নাই-’
‘নাম আইসা গেছিল মাগার কন নাই? ক্যালা?’
বিপ্লব দা তখনো হাসছিলেন।‘আমি বললাম, দাদা কন হের বইয়ের নাম কী দিছেন-’
‘এই ধরনের আঁতকা লেখকগো বইয়ের নাম তো একটাই হইবার পারে-’
বলে বিপ্লব দা হেসেই চলেছেন।
‘কী নাম দিছেন?’
‘দুইটা নাম দিছি। একটা হইল ‘যা ছিঁড়েছি’ আরেকটা হইল ‘যা বেঁধেছি’
এবার বিপ্লব দাশ নিজের হাসি দেখতে না পেলেও আমার অফুরান হাসি দেখছেন।
বিপ্লব দাশ মারা গেছেন তাও দুই যুগ হয়ে এলো।
এরপর থেকে ডবল স্পেসে কথা বলা সবজান্তা শমসের টাইপের লোকটাকে যখনই কোনো সভা সমিতি, টক শোতে দেখি তখন আমার সামনে ভেসে ওঠে বিপ্লব দার শিশু সারল্যে ভরে থাকা মুখ। বিপ্লব দার আলো ঝলমলে হাসি। আহা! বিপ্লব দাশের মতো শক্তিমান মানুষেরা সেই সময় কিভাবে যে এধরনের অশিক্ষিত মেধাবীদের চিনতে পেরেছিলেন ভাবলে এখন গা শিউরে ওঠে।








