“বাঁচতে হবে সুন্দর করে জীবন, এগিয়ে যেতে হবে অনেক দূর। বাঁচতে হবে মানুষকে ভালোবেসে, দায়িত্ব নিয়ে কর্তব্য নিয়ে। শুধু নিজের জীবনটা সুখে আনন্দে কাটিয়ে দিলেই চলবে না। বাঁচতে হবে মানুষের জন্য। আর তুমি হচ্ছো সেই ছোট্ট চয়ন যে বিপদে ভয় পাও না, ভেঙে পড়ো না। পড়ে গিয়ে আবার মাথা উচুঁ করে দাঁড়াতে পারো। তুমি তো দারুণ দারুণ সব কাজ করো। তুমি আরও সামনে যেতে পারবে। আমি জানি।”
কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলা হয়েছিল। সেদিন চোখ দিয়ে আমার জল পড়ছিল। এ কথাগুলো তিনি যেদিন বলেছিলেন, সেদিন ছিল ২০১১ সালের অক্টোবর মাস। তার প্রতিটা বাক্য যে কী ভীষণ শেকলের মতো আজও আমাকে বেঁধে রাখে প্রতি মুহূর্তে! আমি বোঝাতে পারবো না। আমি সেই বাঁধন থেকে ছুটতে পারি না। এই কথাগুলো আমাকে আরও বাঁচার অনুপ্রেরণা দেয়। ভালো কাজের পথ বলে দেয়। তিনি আর কেউ নন। তিনি অনেকের জীবনেই অনেক কিছু। তিনি সবার প্রিয় শ্রদ্ধেয় ও ভালোবাসার মানুষ ফরিদুর রেজা সাগর।
তাকে নিয়ে লিখবার যোগ্যতা আমার নেই। তিনি হচ্ছেন বটবৃক্ষ আর আমি হচ্ছি তৃণলতা। তৃণলতা কি বটবৃক্ষকে কিছু দেয়ার স্পর্ধা রাখে? রাখে না। আর এতে তার কিছুই আসে যায় না। প্রিয় মানুষকে নিয়ে কিছু লেখা ভয়াবহ আর অসম্ভব একটা কাজ। কী লিখবো তাকে নিয়ে? কত ঘটনা, কত স্মৃতি! সেই ছোটবেলা থেকে, কত বছর আগে থেকে! সেই ১৯৭৭/৭৮ সাল থেকে! আমি তখন নতুনকুঁড়ি করি। সেই তখন থেকে তিনি আমার ‘সাগর মামা’।
মনে হয় জন্ম জন্মান্তর থেকে এই চেনা, আত্মার সাথে রয়ে গিয়েছেন। বিয়ের পর জানলাম আমার স্বামী অরুণ চৌধুরীর বন্ধু তিনি।(তাই তাকে মামা/ভাই যখন যা মনে আসে ডাকি) আর সবার কাছে, তিনি প্রতিটি মানুষের কাছে বিপদের বন্ধু। যার যে কোন কিছুতেই, যে কোন সমস্যায় সবার আগে হাত বাড়িয়ে দেন বড় হৃদয়ের মানুষটি। সাথে হাত বাড়িয়ে দেয় পুরো চ্যানেল আই পরিবার।
“মনরে আজ কহো যে, ভালো মন্দ যাহাই আসুক, সত্যরে লও সহজে।”- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই কথা আমি ধারণ করি আমার বুকের ভিতর। ২০১১ সালের জুলাই মাসের ১৩ তারিখ আমার আর আমার পরিবারের জীবনে কঠিন দিন নয় শুধু, একটি ভয়াবহ কঠিন একটি দিন ছিল। সেই বিপদের প্রতিটি মুহূর্তের প্রতিটি মানুষের বলা সব কথা, ব্যবহার, ভালো মন্দ তাকানো সব আমার মনে আছে!
আমার ভালো গুণ বলেন/মন্দ গুণ বলেন, আমি কোন কিচ্ছু ভুলি না। মাথায় থাকে, মনের ভিতর থাকে। আর যার কাছে আমি ঋণী বা কৃতজ্ঞ তাকে তো এ জনমে অবশ্যই, আমার মৃত্যুর পরও তাকে আমি মনে রাখতে চাই, রাখবো। যা আমি প্রতিদিন মনে করি। এই মানুষটার সেই দিনের আন্তরিক ব্যবহার আমার চোখে ভাসে। আমার চোখের জল তিনি তার ব্যবহার দিয়ে মুছিয়ে দিয়েছিলেন। আর আমি জানি, আমি কৃতজ্ঞ একজন মানুষ। আসলে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি পুরো চ্যানেল আই পরিবারকে।
আজ এই ফাঁকে মনে করছি কণা রেজাকে। যিনি মনে প্রাণে আমাকে মেয়ে বলে স্নেহ করেন, ভালোবাসেন। আমি তাকে মাম বলে ডাকি। তার প্রতিও ঋণী আমি। ফরিদুর রেজা সাগর সবার জন্য করেন। সবাই তাকে ভালবাসে। কিন্ত তিনি জানেন না, যাদের বিপদে তিনি তার হাতটি বাড়িয়ে দেন তাদের কাছে তিনি কী, কেমন! সবার কথা আমি বলতে পারবো না। আমি আমার কথা জানি। প্রতিদিন প্রার্থনায় আমরা সবার জন্য প্রার্থনা করি। কিন্ত সাগর মামা/ভাই, তার জন্য তার পরিবারের জন্য আমি আলাদা করে বলি আমার প্রার্থনায়।
এই মানুষটা আমাদের জীবনে সেইদিন তার মমতায় ভরা হাতটি বাড়িয়ে না দিলে আমরা ভেসে কোথায় হারিয়ে যেতাম আমি জানি না! যদিও সাগর মামা/ভাই আমাকে বলেন, “চয়ন, যা কিছু করেছো তুমি। আমি উছিলা মাত্র।” আমি মনে মনে হাসি। এই কারণে যে তিনি নিজে বড় কিন্ত প্রতি মুহূর্তে তিনি আমার মত তৃণলতাকে বড় করেন। কারণ তিনি যে বটবৃক্ষ। মানুষকে সম্মান দেয়া, ভালোবাসাতেই তার যত আনন্দ আর ভালো লাগা।
কিছুদিন পর আমার জন্মদিন ছিল। পহেলা ডিসেম্বর। তিনি আমাকে কিছু বই উপহার দিলেন। একটি বই আলাদাভাবে আমার হাতে দিলেন।মানুষের মুখ। বইটা খুলতে বললেন। আমাকে আর আমার স্বামীকে উৎসর্গ করেছেন এই বইটাতে। মুগ্ধ হলাম, চোখে জল এলো। তিনি অনেক ব্যস্ত মানুষ। অনেকের ধারণা তিনি কিছু খেয়াল করছেন না। কিন্ত তার খেয়াল সবার দিকে। সব মনে থাকে তার। এই গুণি মানুষটা একুশে পদক পেলেন। তিনি তো বহু আগেই নিজ যোগ্যতায় তা পেয়ে গেছেন অনেক আগেই। তাই তাকে শ্রদ্ধা আর ভালবাসা।
আর আজ (২২ ফেব্রুয়ারি) তার জন্মদিন, শুভ জন্মদিন তাকে। অনেক দিন বেঁচে থাকুক এই পরম প্রিয় মানুষটি। তাকে এই পৃথিবীর বড় প্রয়োজন। কারণ তার মত মানুষ বিরল। তাকে আমাদের, এই প্রজন্মদের বড় বেশি প্রয়োজন। শুভ জন্মদিন ‘সাগর মামা’। আনন্দময় হোক জীবন। আমি এই পৃথিবীতে থাকি বা না থাকি আপনি থাকবেন সবার মনের ভেতর জন্ম জন্মান্তর।








