মৎস্য খাতের ভবিষ্যৎ কৌশল নিয়ে মিশরে ‘অ্যাকোয়াকন’ সম্মেলন

মিশরে অনুষ্ঠিত অ্যাকোয়াকন সম্মেলনে মাছের শিল্পের আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করছে।. Channel i News – চ্যানেল আই নিউজ
মৎস্য চাষ বা অ্যাকোয়াকালচার খাতের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের জন্য উন্নত মানের মৎস্য খাদ্যের কোনো বিকল্প নেই বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। গত ৯ জুলাই মিশরের কায়রোতে অনুষ্ঠিত ‘অ্যাকোয়াকন’ (AquaCON) সম্মেলনে মৎস্য খাতের ভবিষ্যৎ কৌশল ও টেকসই উন্নয়ন নিয়ে এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। ইউ.এস. সয়াবিন এক্সপোর্ট কাউন্সিল (ইউএসএসইসি) এবং ওয়ার্ল্ডফিশ মিশর যৌথভাবে এই সম্মেলনের আয়োজন করে।
সম্মেলনে মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা এবং দক্ষিণ এশিয়া (মেনা-সা) অঞ্চলের মৎস্য খাতের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, পুষ্টিবিদ, শিক্ষাবিদ এবং মার্কিন সয়াবিন কৃষকরা অংশ নেন।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাপী মৎস্য ও অ্যাকোয়াকালচার উৎপাদন রেকর্ড ২৩৫ মিলিয়ন টনে পৌঁছেছে, যা বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তায় এই খাতের গুরুত্ব প্রমাণ করে। সম্মেলনে জানানো হয়, মিশর বর্তমানে আফ্রিকার বৃহত্তম মৎস্য উৎপাদনকারী দেশ। অন্যদিকে, বাংলাদেশ বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম মৎস্য উৎপাদনকারী দেশ এবং দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন সয়াবিনের সবচেয়ে বড় বাজার। দেশ দুটিতে মৎস্যখাতের এই দ্রুত প্রবৃদ্ধি এই অঞ্চলে মানসম্মত ফিডের চাহিদাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
সম্মেলনে মৎস্য খাদ্যের ক্ষেত্রে পুষ্টিমান ও ধারাবাহিকতার ওপর জোর দেওয়া হয়। উপস্থাপিত এক গবেষণার তথ্যমতে, মার্কিন সয়াবিনে অন্যান্য অঞ্চলের (যেমন ব্রাজিল) সয়াবিনের তুলনায় ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫ গুণ কম (মার্কিন সয়াবিনে ১.২৪% এবং ব্রাজিলে ৫.৭৮%)। এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সয়াবিন প্রাকৃতিকভাবে রোদে শুকানো হয়। অন্যদিকে, দক্ষিণ আমেরিকায় আর্দ্র আবহাওয়ায় ফসল কাটার পর কৃত্রিমভাবে যান্ত্রিক ড্রায়ার দিয়ে শুকানোর ফলে তাপজনিত কারণে সয়াবিনের পুষ্টিগুণ কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রাকৃতিকভাবে শুকানো মার্কিন সয়াবিনের হজমযোগ্যতা ও বিপাকীয় শক্তির মাত্রা বেশি থাকে, যা মৎস্য খাতের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সাহায্য করে।
ইউএসএসইসি-এর মেনা-সা (MENASA) অঞ্চলের নির্বাহী পরিচালক কেভিন রোপকে এ প্রসঙ্গে বলেন, “ফিড মিলগুলোতে মার্কিন সয়াবিন যে ধারাবাহিক মান বজায় রাখে, তা মৎস্য খামারিদের পরিচালন ব্যয় ও ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। এই নির্ভরযোগ্যতাই মার্কিন সয়াবিনকে বাজারে আলাদা অবস্থান দিয়েছে।”
সম্মেলনে ফিড উৎপাদনে পরিবেশগত প্রভাব বা টেকসই চর্চার (Sustainability) বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। উৎপাদকদের দাবি, মার্কিন সয়াবিনের কার্বন নিঃসরণের মাত্রা তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে কম। ‘ইউ.এস. সয় সাসটেইনেবিলিটি অ্যাসুরেন্স প্রোটোকল’ (এসএসএপি)-এর মাধ্যমে এটি নিশ্চিত করা হয়, যা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের পরিবেশগত (ESG) শর্ত পূরণে সহায়তা করে।
ইউএসএসইসি-এর ভাইস চেয়ার এবং ইলিনয়ের সয়াবিন কৃষক রবার্টা সিম্পসন-ডলবিয়ার বলেন, “মার্কিন কৃষকরা মাটি প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে ফসল তোলা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে টেকসই কৃষি চর্চা নিশ্চিত করেন।”
ইউএসএসইসি-এর বাংলাদেশ টিম লিড খাবিবুর রহমান কাঞ্চন চ্যানেল আইকে বলেন, “বাংলাদেশ বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম মৎস্য উৎপাদনকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক মাছের বাজারে বাংলাদেশের তেমন অংশগ্রহণ নেই। ‘অ্যাকোয়াকনে’ বাংলাদেশের মৎস্যখাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তিবর্গদের যুক্ত করার মূল উদ্দেশ্য বিশ্ববাজার সম্পর্কে তাদের সম্যক ধারণা দেওয়া।”
অ্যাকোয়াকনে বাংলাদেশ থেকে অংশ নেন আইপিআরএস এক্সপার্ট ফেরদৌস মুরাদ। তিনি চ্যানেল আইকে বলেন, কায়রোতে আয়োজিত এই সম্মেলনে অংশ নিয়ে একটি বিষয় খুব পরিষ্কার হয়েছে। বাংলাদেশে মাছ উৎপাদনে যতটুকু এগিয়েছে তার চেয়েও বেশি এগুনোর পথ সারাবিশ্বে ছড়িয়ে আছে। আমাদের শুধু উদ্যোগ নিতে হবে।
সম্মেলনে বিশেষজ্ঞরা একমত হন যে, মেনা-সা অঞ্চলে প্রোটিনের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে মৎস্য খাতের যে বিস্তার ঘটছে, সেখানে একটি নির্ভরযোগ্য, উচ্চমানসম্পন্ন ও পরিবেশবান্ধব খাদ্য উপাদান হিসেবে মানসম্মত সয়াবিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।






