ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’ বাংলাদেশ থেকে চলে গেলেও তার ক্ষত চিহ্ন রেখে গেছে। এর প্রভাবে এখনো সাগর উত্তাল। ‘মোরা’র তাণ্ডবে সরকারি হিসাবে ৫২ হাজার পরিবারকে ক্ষতিগ্রস্থ বলা হলেও বেসরকারী হিসাবে এর সংখ্যা আরো অনেক বেশি।
ক্ষতিগ্রস্ত গৃহহারা মানুষগুলো খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। রমজান মাস হওয়ায় এসব মানুষের দূর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। সরকারিভাবে ১১৯ মেট্রিক টন চাল আর নগদ ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হলেও এখনো ত্রান পৌঁছেনি ক্ষতিগ্রস্থদের মাঝে। তবে জেলা প্রশাসক বলছেন যথা সময়ে ত্রাণ পৌছে যাবে। বৃহস্পতিবার কক্সবাজারের দুর্গত এলাকায় আসবেন সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের ১৮ সদস্যের ত্রাণ দল।
ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’র আঘাতে কক্সবাজারে জেলার অধিকাংশ এলাকার ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত ও বিপুল পরিমাণ গাছপালা ভেঙ্গে পড়েছে। সরকাবি হিসাবে ঘুর্নিঝড় ‘মোরা’র আঘাতে কক্সবাজার জেলার কুতুবদিয়া, মহেশখালী, পেকুয়া, রামু, উখিয়া ও টেকনাফে ৫২ হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। কিন্তু বেসরকারীভাবে ক্ষতির পরিমাণ আরো বেশি হতে পারে বলে জানান কক্সবাজার অধিকার ফোরামের সভাপতি জয়নাল আবেদীন। তিনি বলেন, এখনো সরকারের হাতে পুরোপুরি হিসাব যায়নি। মাঠ পর্যায়ে ভালো করে জরিপেরও আহবান জানান জয়নাল আবেদীন।
কক্সবাজার শহরের উপকুলীয় এলাকা চরপাড়া, বন্দরপাড়া ও ফদনার ডেইল এলাকায় অধিকাংশ বাড়িঘর তছনছ হয়ে গেছে। এসব এলাকার মানুষ এখন দিন পার করছে খোলা আকাশের নিচে। বুধবার সকালে গিয়ে দেখা যায় ফদনার ডেইলের বাসিন্দা ট্রলারের শ্রমিক রহিম উদ্দিন, লবণ চাষী আবুল কাশেম ও রহিমদ উদ্দিন পুরো পরিবার নিয়ে ভেঙ্গে যাওয়া বাড়ির পাশে খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছে। ষাটোর্ধ্ব রহিমা বেগম জানালেন, বাড়ির সাথে সাথে সব মালামালও বাতাসে নিয়ে গেছে। তাই গত রাতে পানি খেয়ে রোজা রেখেছি। বুধবার বিকেল ৫টা পর্যন্ত এ এলাকায় সরকারের কোন ত্রণ পৌঁছায়নি বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছে।
কক্সবাজার পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর এস আই আকতার কামাল জানান, তার এলাকার ১ হাজার বাড়িঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। অনেকে এখন গৃহহারা। সরকারি কোন ত্রাণ এখনো এলাকায় পৌছায়নি। তবে ত্রাণের জন্য তিনি চেষ্টা করে যাচ্ছেন বলে জানান।
টেকনাফের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ এলাকা সাবরাং-এর শাহপরীর দ্বীপের ইউপি সদস্য ফজলুল হক জানান, তার এলাকায় ৯৫ শতাংশ বাড়ি ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। পুরো এলাকায় একটি বাড়িও ভালো নেই। বুধবার বিকেল ৫টা পর্যন্ত তার এলাকায় সরকারি কোন সাহায্য পৌছায়নি বলে জানান। তবে তার ওয়ার্ডের নামে ত্রাণ বরাদ্দ হওয়ার কথা তিনি জানতে পেরেছেন। বৃহস্পতিবার ঐ ত্রাণ তার এলাকায় পৌছাবে বলে তাকে জানানো হয়েছে।
মহেশখালীর দুর্গম ইউনিয়ন ধলঘাটাতেও সরকারি ত্রাণ পৌছায়নি বলে জানান ইউপি চেয়ারম্যান কামরুল ইসলাম। তবে পাশের ইউনিয়ন মাতারবাড়িতে সাড়ে ৫মেঃ টন চাল পৌছার পর তা বিতরণ করা হয় বলে ইউপি চেয়ারম্যান মাাষ্টার মোঃ উল্লাহ জানিয়েছেন। তিনি জানান, যে ত্রান পাওয়া গেছে তা পর্যাপ্ত না। আরো অনেক ত্রান প্রয়োজন।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’র আঘাতে জেলায় ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে ৫২হাজার ৫৩৯টি পরিবার। এর মধ্যে সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৭ হাজার ২৩টি পরিবার, আংশিক ক্ষতি হয়েছে ৩৫ হাজার ৫১৬টি পরিবার। এসময় গাছের নিচে চাপা পড়ে ৪ জন নিহত ও আহত হয়েছে ৬০ জন। এছাড়াও রামু উপজেলাতে প্রায় ৩০ একর, উখিয়ায় ৪০২ একর, টেকনাফে ১৩৮২ একর ও মহেশখালীতে ১৪৮১ একর জমির ফসল ও পানের বরজের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
তবে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রাখার কথা জানিয়ে জেলা প্রশাসক মো: আলী হোসেন বলেন, গত দুইদিনে কক্সবাজার জেলার ৮টি উপজেলায় ১১৯ টন খাদ্য সামগ্রী ও নগদ ১০ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক কাজী আব্দুর রহমান জানান, নৌ বাহিনীর দুটি জাহাজ বিভিন্ন খাদ্য সামগ্রী সম্বলিত ৫ হাজার প্যাকেট সেন্টামার্টিনে ও ৪ হাজার প্যাকেট কুতুবদিয়াতে বিতরণ করেছে।
মহেশখালী কুতুবদিয়ার সংসদ সদস্য আশেক উল্লাহ রফিক জানান, তার এলকার মানুষগুলো সরকারি ত্রাণের অপেক্ষায় না থেকে নিজেরা ক্ষতিগ্রস্থ গৃহ তৈরিতে নেমে পড়েছে। সরকার পর্যাপ্ত ত্রাণ দিচ্ছে। তিনি জানান, বৃহস্পতিবার সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের ১৮ সদস্যের ত্রাণ দল আসবেন। এ দলে মাহবুবল আলম হানিফ,জাহাঙ্গীর কবির নানক সহ বেশ কেন্দ্রীয় নেতারা থাকবেন। তারা মাতারবাড়ী,কুতুবদিয়া ও টেকনাফে ত্রাণ বিতরন করবেন।








