স্থগিতাদেশ নিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সুযোগ থাকলেও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের দ্বিধার কারণে তৎপরতা কম। হাইকোর্ট বিভাগের রায়কে স্থগিত করে আপিল বিভাগের আদেশে সাময়িকভাবে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দ্বারা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হলেও ম্যাজিস্ট্রেটদের অনেকেই দ্বিধার মধ্যে আছেন বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে।
এ কারণে অসাধু ব্যবসায়ী সক্রিয় হয়ে উঠছে উল্লেখ করে ওই সূত্রগুলো বলছে, ভ্রাম্যমাণ আদালত কম থাকায় কিছুক্ষেত্রে বাল্যবিয়ের মতো ঘটনা ঘটছে। অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ, ইভটিজিং, চিংড়ি মাছে ক্ষতিকর জিলেটিন পুশ, বালু উত্তোলন, রেস্টুরেন্টে বাসি খাবার এবং মেয়াদ উত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রির মতো অপরাধ বেড়েছে। মাদকদ্রব্যের বেচাকেনাও বেড়েছে কয়েকগুণ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের একাধিক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট চ্যানেল আই অনলাইনকে জানান, মোবাইল কোর্ট পরিচালনার প্রচণ্ড ইচ্ছা থাকার পরও সাময়িক স্থগিতাদেশ নিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনায় আগ্রহ বোধ করছেন না তারা। তাই রুটিন দায়িত্বের মধ্যেই সারছেন কাজ।
ঢাকা জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, এপ্রিল মাসে জেলা প্রশাসকের নিয়ন্ত্রণাধীন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা মাসব্যাপী ৩০৭টি মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে নানা অপরাধে ১,৩৭২টি মামলা দায়ের করে প্রায় ৪৬ লাখ টাকা জরিমানা আদায় ও ৪৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন। মোবাইল কোর্ট বন্ধ করে হাইকোর্টের রায় এবং পরে আপিল বিভাগে এর উপর স্থগিতাদেশের পর ১২ মে থেকে ২৪ তারিখ পর্যন্ত মাত্র ৩৫টি মামলার মাধ্যমে আদায় করা হয়েছে দু’ লাখ টাকা।
রাজধানীতে বিএসটিআই-এর ভেজাল বিরোধী অভিযানও চলছে নাওকাওয়াস্তে। ১২ মে’র পর কোন ফরমালিন বিরোধী অভিযান পরিচালিত হয়নি।
আমের মৌসুমে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাগানে বাগানে টহল দিয়ে কার্বাইড বা অন্যান্য রাসায়নিক দ্রব্য প্রয়োগে সময়ের আগে আম পাকানো রোধ নিশ্চিত করে মোবাইল কোর্ট। দেশের সবচেয়ে বেশি আম উৎপাদনকারী জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আম পাড়ার তারিখ ঠিক করে দেওয়া হয়েছে ২৫ মে । কিন্তু নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের তৎপরতার অভাবে নির্দিষ্ট তারিখের আগেই বাজারেে এসেছে আম।
ম্যাজিস্ট্রেটদের দোদুল্যমান অবস্থার কারণে বিদ্যুৎ বিভাগে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ও বকেয়া আদায়ও বন্ধ আছে। একরকম স্থগিত আছে পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযান। তিনটি অভিযোগ এলেও কোন তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয়নি। ঢাকায় অবৈধ পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন ও বকেয়া আদায়ও বন্ধ আছে।
যশোর জেলায় এপ্রিল মাসে ৮৩টি মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ১৭২ টি মামলায় ১৮৮ জনকে নয় লাখ ৮১ হাজার টাকা অর্থদণ্ড ও ২৭ জনকে কারাদণ্ড দেয়া হয়। চলতি মাসের ১২ তারিখ থেকে ২৪ তারিখ পর্যন্ত মাত্র ৭টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হয়েছে এবং আদায় করা হয়েছে ২০ হাজার টাকা জরিমানা।
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের তত্ত্বাবধানে বাগেরহাট শহর রক্ষা বাঁধের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ভৈরব নদীর পাড় যা কিছুদিন আগে দখলমুক্ত করা হয়েছিল, তা আবারও বেদখল হয়ে যাচ্ছে। মংলা বন্দরের ঘোষিয়াখালী চ্যানেলের নাব্যতার জন্য অপরিহার্য যে নদী ও খালগুলো গত বছর মুক্ত করা হয়েছিল, সেগুলোতে আবারও বাঁধ দিয়ে শুরু হয়েছে দখল প্রক্রিয়া।
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের তৎপরতার অভাবে নেত্রকোণার মদনে পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চলছে পোনা মাছ নিধন। সরকারি আইন অমান্য করে বিভিন্ন জাতের পোনা মাছ প্রকাশ্যে বাজারে বিক্রি হচ্ছে। নির্বাহী ম্যজিস্ট্রেটরা দু’একবার টহলে গেলেও অল্পক্ষণ অবস্থান করে চলে যাচ্ছেন, আগের চেয়ে টহলও কমে গেছে।
ঢাকার কেরানীগঞ্জে ড্রেজার ও বোমা মেশিন ব্যবহার করে শুরু হয়েছে তুলসি খালি ব্রিজের নিচের অবৈধভাবে বালু উত্তোলন। ধামরাই উপজেলায় ৫টি স্থানে অবৈধভাবে ড্রেজার মাধ্যমে মাটি ও বালু উত্তোলন চলছে।
বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় ঢাকা শহরের আড়তগুলোতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে অভিযান পরিচালনা করে পাটের তৈরি ব্যাগ ও অন্যান্য পাটজাত পণ্যের ব্যবহার নিশ্চিত করেছিল। সেখানেও চলছে এক ধরনের স্থবিরতা।
গত ১১ মে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার বিধান বাতিল করেন হাইকোর্ট। ১৪ মে এর উপর ২ জুলাই পর্যন্ত স্থগিতাদেশ দেন আপিল বিভাগ। কিন্তু, দ্বিধাগ্রস্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে মোবাইল কোর্ট কার্যক্রম।








