আগের ছয় ক্লাসিকোতে গোল পাননি। চ্যাম্পিয়ন্স লিগে দুই লেগে জুভেন্টাসের বিপক্ষে গোল নেই। দল টুর্নামেন্টের বাইরে ছিটকে গেছে। ভেতরে ভেতরে তেঁতে ছিলেন হয়তো! লা লিগায় চলতি মৌসুমের সর্বোচ্চ স্কোরার আবার তিনিই। ক্লাসিকোর সর্বোচ্চ গোলদাতাও। লিওনেল মেসির তাই অনুপ্রাণিত হওয়ার মত রসদও নিজের ভেতরেই ছিল। এরপরও মার্সেলোর আঘাতে যখন ঠোঁট-মুখ বেয়ে রক্ত ঝরল, সেটি কি আরো বেশি করে তাঁতিয়ে দিয়েছিল মেসিকে? যার আগুনে শেষ অবধি পুড়ে অঙ্গার রিয়াল।
পুরো ম্যাচে জাদুকরী মুহূর্ত উপহার দিয়ে দিনশেষে বিজয়ীর কাতারে ফুটবল মহানায়ক। সেইসঙ্গে বার্সার জার্সিতে এদিন ৫০০তম গোলের অনন্য মাইলফলকও স্পর্শ করেছেন মেসি।
রিয়ালের ঘরের মাঠ সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে রোববার রাতে মৌসুমের দ্বিতীয় এল ক্লাসিকোতে স্বাগতিকদের ৩-২ গোলে হারিয়েছে বার্সেলোনা। লিওনেল মেসির জোড়া গোলের সঙ্গে স্কোরের খাতায় নাম তুলেছেন ইভান রাকিটিচ।
মার্সেলোর সঙ্গে মেসির রক্তা-রক্তি ঘটনাটা ম্যাচের ২০ মিনিটের সময়ের। ম্যাচ তখনো গোলশূন্য। দুরন্ত গতিতে ছুটতে থাকা মেসির কাছ থেকে বল কেড়ে নিতে যেয়ে কনুই দিয়ে আঘাত করে বসেন মার্সেলো। মেসি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। ঠোঁটে আঘাতের স্থান থেকে রক্ত ঝরা শুরু করে মাঠেই।

কনুইয়ের আঘাতে মুখ বেয়ে আসা রক্ত নিয়ে বার্সার প্রাণভোমড়া মাঠের বাইরেও চলে যান। তবে ফিরতেও দেরি করেননি। দ্রুত নিরাময় নিয়ে বার্নাব্যুর সবুজ গালিচায় ফেরেন। পরে মুখে টিস্যু গুঁজে দ্রুত খেলার মোড় পাল্টে দিতে থাকেন আক্রমণের পর আক্রমণ শানিয়ে।
পরের গল্পটা হয়তো সকলের জানাই হয়ে গেছে। বার্সা তখন পিছিয়ে। মেসির পায়েই সমতায় আসে অতিথিরা। এসময় ম্যাচের ৩৩ মিনিটে বুসকেটসের বাড়ানো বল রাকিটিচকে খুঁজে পায়। সেটি রাকিটিচ বাড়িয়ে দেন মেসির দিকে। আর্জেন্টাইন অধিনায়ক বক্সে ঢুকে প্রথমে ডান পায়ে কারভাহালের থেকে বল সরিয়ে নেন, পরে বাঁ-পায়ের দর্শনীয় শটে কেইলর নাভাসের হাতের নীচ দিয়ে জালে জড়িয়ে দেন।
এরমধ্য দিয়ে লা লিগায় হওয়া ক্লাসিকোতে ১৫তম গোল করে রিয়ালের কিংবদন্তি আলফ্রেডো ডি স্টেফানোকে টপকে সর্বোচ্চের রেকর্ডটি নিজের করে নিয়েছেন মেসি।
পুরো ম্যাচেই অবশ্য মেসিকে মেরে খেলেছে স্বাগতিকরা। ৭৭ মিনিটে মেসিকে ফাউল করেই লালকার্ডে মাঠ ছেড়ে সার্জিও রামোস দলকে বিপদেই ঠেলে দেন। এরপরও ৮৫ মিনিটে স্বাগতিকরাই সমতায় ফেরে জেমস রদ্রিগেজের গোলে। পরে যখন পয়েন্ট ভাগাভাগিতে মাঠ ছাড়ার উপক্রম, তখনই আবারো দৃশ্যপটে মেসি। জানান দেন, জাদুর আরো আছে বাকি!

ম্যাচ যোগ করা সময়ে। শেষের বাঁশি বাজবে বাজবে ক্ষণ। মেসি তখনও ভালোভাবেই ম্যাচে ছিলেন। ছিল ম্যাজিক্যাল মুহূর্তও। জয়সূচক গোলের জন্য ওঁত পেতে ছিলেন। সার্জিও রবের্তো মাঝ মাঠ থেকে বল নিয়ে ভোঁ-দৌড় দেন। পরে বক্সের কাছে যেয়ে খুঁজে পান জর্ডি আলবাকে। আলবা সেটি ঠেলে দেন মেসির দিকে। যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটের এই গোলেই জয়ের উল্লাসে মাতে বার্সেলোনা। ফুটবল জাদুকর বাঁ-পায়ের বাঁকানো শটে দারুণ ফিনিশিংয়ে জাল খুঁজে নেন।
চলতি লা লিগায় মেসির যেটি ৩১তম গোল, আর বার্সেলোনার জার্সিতে সব মিলিয়ে ৫০০তম সাফল্য। দ্বিতীয় গোলটির পর জার্সি খুলে বার্নাব্যুর পিনপতন নীরবতা নামা গ্যালারির দিকে সেটি তুলে ধরেন পাঁচবারের বর্ষসেরা ফুটবল জাদুকর। নিজের নামের পাশে যোগ করে নেন একটি হলুদ কার্ডও।
অকারণ এক হলুদ কার্ডেই থামলেন মেসি। তিনি তো আর রক্ত ঝরাতে পারেন না। অবশ্য অন্তরালের রক্তও কম ঝরছিল না তখন। সেটিও মেসির কারণেই। রিয়ালের খেলোয়াড়-কর্মকর্তা বা সমর্থক, কার হৃদয়ে রক্ত ঝরায়নি মেসির এই পারফরম্যান্স?
আর জয়ে ৩৩ ম্যাচে ৭৫ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের শীর্ষে উঠে গেছে বার্সা। টিকে থাকছে শিরোপার স্বপ্নের লড়াইয়ে। এক ম্যাচ কম খেলে সমান পয়েন্ট নিয়ে গোল ব্যবধানে পিছিয়ে দুইয়ে রিয়াল।








