‘কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা’ -কথাটা কাব্যে ব্যবহার হয়। তবে প্রবাদটা অনেক সময় ফুটবলেও ব্যবহার হয়। যার প্রয়োগ আরেকবার দেখা যাবে বিশ্বকাপে। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচে কাঁটা দিয়েই কাঁটা তুলতে চায় ক্রোয়েশিয়া। যেখানে লিওনেল মেসিদের ঠেকাতে ক্রোয়েট শিবিরে ‘শত্রু-মিত্র’রাও একীভূত।
আসল ঘটনা কী? ব্যাপার হল বার্সেলোনায় মেসির সতীর্থ ইভান রাকিটিচই ক্রোয়েশিয়ার মিডফিল্ডে অন্যতম ভরসা। সারাবছর মেসির সঙ্গে গায়ে গা লাগিয়ে খেলেন। মাঠের বাইরে মেসির হাঁড়ির খবরটাও তার চেয়ে বেশি কে জানবেন ক্রোয়েশিয়া? তাই ‘কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা’র কাজে মেসিকে আটকাতে রাকিটিচকেই কাজে লাগাতে চাইছেন ক্রোয়েট কোচ জ্লাতকো দালিচ।
বৃহস্পতিবার মেসির আর্জেন্টিনার সামনে ক্রোয়েশিয়া। গ্রুপ ‘ডি’র সবচেয়ে উত্তেজনাকর ম্যাচ। সেই ম্যাচের আগে ক্রোয়েশিয়া কোচ কোনো রাখঢাক না রেখেই বলেছেন, ‘গত তিনদিন ধরে রাকিটিচই আমার প্রধান সহকারী। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, মেসি ও তার দলকে থামাতে আমি আর আমার দল রাকিটিচের দিকেই তাকিয়ে আছি।’
এমনিতেও দলের ফুটবলাদের পরামর্শ নিতে কোনো দ্বিধা করেন না দালিচ। এবার মেসি এন্ড কোং-কে থামাতে কোচের সঙ্গে বসে অঙ্ক কষছেন ক্লাব সতীর্থও। ক্রোয়েট কোচ বলেছেন, ‘রাকিটিচের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে, মেসির সম্পর্কে যা যা তথ্য সে জানে সব আমাকে জানাবে।’
দালিচ এটাও জানেন, মেসির মতো ফুটবলারকে থামাতে এক রাকিটিচে রক্ষা নেই। তাই তিনি মেসিকে থামানোর মিশনে দোসর করছেন ক্লাব ফুটবলের দুই ‘শত্রু’ লুকা মদ্রিচ ও মাতেও কোভাচিচকেও। তারা দুজনেই খেলেন মেসি-রাকিটিচের বার্সেলোনার ‘চিরশত্রু’ রিয়াল মাদ্রিদে। ক্লাব ‘শত্রুতা’ ভুলে রাকিটিচও এক হয়ে গেছেন মদ্রিচ-কোভাচিচের সঙ্গে।
দালিচ বলেছেন, ‘মেসিদের বিরুদ্ধে ম্যাচের আগে মদ্রিচ ও কোভাচিচের সঙ্গেও কথা বলব। কারণ তারা তো ক্লাব ফুটবলে মেসির বিপক্ষ দলে খেলেন।’
মেসিকে আটকানোর ছকে মদ্রিচ-কোভাচিচের সাহায্যের নেপথ্যে জিনেদিন জিদান মডেলও অনুসরণ করবেন ক্রোয়েশিয়া কোচ। জিদান এখন রিয়াল ছাড়লেও বার্নাব্যুর ডাগআউটে থাকতে এই দায়িত্ব ভালোভাবেই সামলেছেন। ফরাসি কিংবদন্তি কীভাবে ছক করতেন সেই পরামর্শ মদ্রিচ-কোভাচিচের কাছ থেকে নেবেন দালিচ, ‘মদ্রিচরা বলতে পারবেন জিদান কীভাবে পরিকল্পনা করতেন।’
এতো কিছুর পরও দালিচ মানছেন, মেসি এতটাই প্রতিভাবান যে, তাকে থামানোর নির্দিষ্ট কোনো অঙ্ক থাকতে পারে না। বলেছেন, ‘মেসিকে থামানোটা একেবারেই সহজ ব্যাপার নয়। আসলে মেসিকে থামানোর আসল লক্ষ্য হল, আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগের জমাট ভাবটা ভেঙে দেয়া।’
হিসাব সোজা, আর্জেন্টিনার বোঝাপড়া ভেঙে দিয়ে মূলত মেসিকে একা করে দেয়াই ক্রোয়েশিয়া কোচের আসল টার্গেট। তার ভাষায়, ‘একজন ফুটবলার অবশ্যই ম্যাচের ফল বদলে দিতে পারে। কিন্তু একটা ভালো দল তার চেয়ে অনেকবেশি কিছু করতে পারে।’
প্রথম ম্যাচে আইসল্যান্ডের বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র করায় এই ম্যাচে জয় ছাড়া আরকিছুই খোঁজার নেই মেসিদের। কিন্তু ক্রোয়েট শিবিরে উল্টো চিত্র। প্রথম ম্যাচে নাইজেরিয়ার বিরুদ্ধে ২-০ গোলে জেতায় আর্জেন্টাইনদের চেয়ে বেশ এগিয়ে থেকে মাঠে নামবে তারা।
তারপরও বৃহস্পতিবারের ম্যাচ ঘিরে নিজেদের চেয়ে আর্জেন্টিনাকে নিয়ে বেশি ভাবনায় দালিচ। নীল-সাদাদের মনস্তত্ত্ব নিয়েও। তার কথায়, ‘আর্জেন্টিনা অবশ্যই আইসল্যান্ডের বিরুদ্ধে ড্র আশা করেনি। তাই আমাদের বিরুদ্ধে তারা তিন পয়েন্টের জন্য সবটুকু দিয়ে ঝাঁপাবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।’
তবে বড় দল বলে চাপটা আর্জেন্টিনার উপরই বেশি মনে করছেন দালিচ। বলেন, ‘তারা বড় দল, তবে বড় দল বলেই তারা চাপ নিয়ে খেলায় অভ্যস্ত।’
নিজের খেলোয়াড়দের চাপমুক্ত রাখতে ফুয়েল হিসেবে দালিচ বলেছেন, ‘আর্জেন্টিনার কাছে এখন সব ম্যাচই বড় ম্যাচ, তাই আমরা তাদের চেয়ে অনেক খোলা মনে খেলতে পারব।’
আর্জেন্টিনা ম্যাচের আগে কিছুটা অস্বস্তিতে ক্রোয়েশিয়া শিবির। কোচের চাওয়া মতো বদলি খেলোয়াড় হিসেবে নামতে চাননি বলে দলের দ্বিতীয় স্ট্রাইকার নিকোলা কালিনিচকে বিশ্বকাপ স্কোয়াড থেকে ছাঁটাই করে দেশেই পাঠিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দালিচ। ফলে নিখাদ স্ট্রাইকার হিসেবে দলে আছেন কেবল মারিও মানজুকিচ।
অন্যদিকে, বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে আইসল্যান্ডের সঙ্গে ড্র করার পর ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচের দলে ব্যাপক ওলট-পালট করতে চান আর্জেন্টিনা কোচ হোর্হে সাম্পাওলি। এই ম্যাচে কৌশলেও কিছু পরিবর্তন আনতে পারেন মেসি-আগুয়েরোদের বস।
হতাশার ড্র’র পর সোমবার অনুশীলনে ‘একটি ভিন্ন কৌশলে’ চেষ্টা করেছেন সাম্পাওলি। অনুশীলনে তিন ডিফেন্ডার নিকোলাস ওটামেন্ডি, নিকোলাস তাগলিয়াফিকো ও গ্যাব্রিয়েল মের্কাদোকে দিয়ে রক্ষণ টেস্ট করেন সাম্পাওলি। মার্কোস রোহোর জায়গায় দেখা যেতে পারে মের্কাদোকে। আর মিডফিল্ডে লুকাস বিগলিয়া ও অ্যাঙ্গেল ডি মারিয়ার মার্কোস আকুনা ও ক্রিস্টিয়ান পাভনকে দেখা যেতে পারে।
এই ম্যাচে আর্জেন্টাইন দলে পরিবর্তনের আরও কারণ রয়েছে। সাম্পাওলির অধীনে এখনও পর্যন্ত যে ১২টি ম্যাচ খেলেছে আর্জেন্টিনা, এর একটিতেও একই দল নামাননি তিনি।
এক ম্যাচ শেষে গ্রুপের পয়েন্ট টেবিলে আর্জেন্টিনা তিনে। আর ক্রোয়েশিয়া আছে একনম্বরে। বৃহস্পতিবার হারলে পরের রাউন্ডে ওঠা আরও কঠিন হয়ে যাবে মেসিদের। যদিও ক্রোয়েশিয়া কোচ রসিকতা করে বলেছেন, ‘আমাদের ম্যাচে তেমন কিছু হলে আমরা কিন্তু নিজেদের অপরাধী মনে করব না।’








