লিওনেল মেসি ফিরতেই চেহারা পাল্টে গেল বার্সেলোনার। যা ধরা পড়ল চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ইন্টার মিলানের বিপক্ষে। লুইস সুয়ারেজের জোড়া গোলে ইতালিয়ান ক্লাবকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে জয়ের ধারায় ফিরেছে আর্নেস্টো ভালভার্দের দল।
চ্যাম্পিয়ন্স লিগে নতুন মৌসুমে নিজেদের প্রথম ম্যাচে গোলশূন্য ড্র করেছিল বার্সা। তাই ‘গ্রুপ অব ডেথের’ লড়াইয়ে ঘরের মাঠে কোনো ধরনের অঘটন ঘটলে ছিল বিদায়ের শঙ্কা। ম্যাচের শুরুতে গোল খেয়ে অনুমানের চেয়ে বেশি আশঙ্কায় যখন স্প্যানিশ জায়ান্টরা, তখনই দলকে উদ্ধার করেন লুইস সুয়ারেজ। জোড়া গোলে দারুণ এক জয় এদেন দেন উরুগুইয়ান তারকা।
ম্যাচে গোল না পেলেও দুর্দান্ত খেলেছেন মেসি। গোল ছাড়া সবই করেছেন এলএমটেন। চলতি মৌসুমে সবমিলিয়ে নয়টি ম্যাচ খেলেছে বার্সা। বুধবার রাতের আগে যার মাত্র একটিতে সর্বোচ্চ ৪৫ মিনিট খেলতে পেরেছেন মেসি। লম্বা সময় মাঠে না থাকার প্রভাব শুরুতে চোখেও পড়ে। নিজেকে মানিয়ে নিতে প্রথমার্ধে একটু সময় নেন। দ্বিতীয়ার্ধে মাঝ মাঠ থেকে ম্যাচের স্টিয়ারিং ধরে যা করলেন তা কেবল তার অতীতকে স্মরণ করায়।
চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ‘এফ’ গ্রুপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করেছিল বার্সেলোনা। ড্র হয়েছিল প্রথম ম্যাচে ইন্টার-স্লাভিয়া প্রাগের লড়াইও। তবে জার্মান দলটি এদিন স্লাভিয়াকে হারিয়েছে। তাই পয়েন্ট খোয়ালে কিছুটা হলেও সমস্যায় পড়ত বার্সা। কিন্তু এমনকিছু হতে দেননি সুয়ারেজ-মেসিরা।
ঘরের মাঠে তখন দর্শকরা ঠিকমতো আসনও গ্রহণ করতে পারেননি। বার্সা খেলোয়াড়রাও নিজেদের পজিশন ঠিক করেননি। এমন অবস্থায় ম্যাচের তৃতীয় মিনিটেই ন্যু ক্যাম্প স্তব্ধ করে দেন লৌতারো মার্টিনেজ। যাকে সাহায্য করেন বার্সারই এক সাবেক সেনা, অ্যালেক্সিস সানচেজ। মাঝ মাঠে জটলা থেকে তার বাড়ানো বল দারুণভাবে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বাঁ-প্রান্ত থেকে কোনাকুনি শটে লক্ষ্যভেদ করেন আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ড।
বার্সায় বেশকয়েক মৌসুম খেলার কারণে ন্যু ক্যাম্পের প্রতিটা ঘাসই চেনে সানচেজকে। তিনি যেমন পুরনো সৈনিক, তেমনি সম্ভব্য সৈনিক হয়ে ওঠার আশায় মার্টিনেজ। কিছুদিন আগেই তার ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছে বার্সা। প্রথম গোল করে বার্সা তাকে কেন চায় সেটা প্রমাণ করেন মার্টিনেজ।
গোল খেয়ে একটু একটু করে গুছিয়ে নেয় বার্সা। ১৫ মিনিটে গোল শোধ করার ভালো সুযোগও পেয়েছিলেন অ্যান্থনিও গ্রিজম্যান। সার্জিও রবের্তোর ক্রস থেকে ফাঁকায় হেড নিয়েছিলেন। কিন্তু তার হেড বাইরের জাল কাঁপায়। চার মিনিট পর সার্জিও বুসকেটসের শট বারপোস্টের অনেক উপর দিয়ে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। ২৫ মিনিটে মেসির দূরপাল্লার শট ঝাঁপিয়ে পড়ে ঠেকিয়ে দেন ইন্টার গোলরক্ষক সামির হেন্দানোভিচ।
৩৩ মিনিটে বড় বাঁচা বেঁচে যায় বার্সেলোনা। আরও একটি গোল প্রায় খেতে বসেছিল স্বাগতিক দলটি। সানচেজের বাড়ানো বলে একেবারে ফাঁকায় শট নেয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন নিকোলো বারেল্লা। দারুণ ট্যাকলে সে যাত্রা দলকে রক্ষা করেন নেলসন সেমেদো। চার মিনিট পর তো অবিশ্বাস্য মার্ক-আন্দ্রে টের স্টেগেন। অ্যান্থনিও কেনদ্রেভার ক্রস থেকে দুর্দান্ত এক হেড দিয়েছিলেন মার্টিনেজ। কিন্তু তার চেয়েও অসাধারণ দক্ষতায় বাঁ-দিকে ঝাঁপিয়ে তা ঠেকিয়ে দেন বার্সার জার্মান কিপার।
৪০মিনিটে ডি-বক্সে ঢুকে জোরাল এক শট নিয়েছিলেন স্তেফানো সেনসি। কিন্তু অল্পের জন্য তা লক্ষ্যে থাকেনি। পরের মিনিটে ডি-বক্সের অনেক বাইরে থেকে নেয়া সুয়ারেজের শটে তেমন জোর না থাকায় বাঁ-দিকে ঝাঁপিয়ে ঠেকাতে কোনো সমস্যা হয়নি ইন্টার গোলরক্ষক সামিরের।
৪৩ মিনিটে তো একেবারে ফাঁকায় থেকে হেড দেয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন সানচেজ। কিন্তু বল ঠিক জায়গায় রাখতে পারেননি বার্সেলোনার সাবেক ফরোয়ার্ড। পরের মিনিটে মেসির পাস থেকে দুই ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে ডানপ্রান্ত দিয়ে ভালো শট নিয়েছিলেন আর্থার মেলো। কিন্তু অল্পের জন্য বারপোস্টের উপর দিয়ে দিয়ে গেলে হতাশা বাড়ে স্বাগতিকদের।
প্রথমার্ধে সমানতালে লড়াই হলেও দ্বিতীয়ার্ধে প্রায় পুরোটাই ছিল বার্সেলোনার দাপট। সে ধারায় সমতায় ফিরতেও খুব বেশি সময় নেয়নি দলটি। ৫৮ মিনিটে দারুণ এক গোল দিয়ে সমতা ফেরান সুয়ারেজ। মেসির পাস থেকে আসা বলে আড়াআড়ি ক্রসে বল বাড়ান ম্যাচে তাল খুঁজে না পাওয়া বুসকেটসের বদলি হিসেবে নামা আর্তুরো ভিদাল। তার উড়ন্ত ভলি ডি-বক্সের বাইরে থেকে বাতাসে ভেসেই দারুণ এক সাইড ভলিতে জাল খুঁজে নেন সুয়ারেজ।
সমতায় ফিরে আরও তেঁতে ওঠে বার্সেলোনা। ৬১ মিনিটে ব্যবধান বাড়ানোর দারুণ সুযোগ ছিল গ্রিজম্যানের। কিন্তু তার শট বাইরের জাল কাঁপায়। অ্যাটলেটিকো থেকে এসে এখনো ন্যু ক্যাম্পে ছন্দ পাচ্ছেন না গ্রিজম্যান। তার পরিবর্তে উসমান ডেম্বেলেকে নামানোর পর খেলায় আরও গতি বাড়ে বার্সার। নেমেই ফরাসি তরুণের নেয়া বুলেট এক শট অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।
কাঙ্ক্ষিত গোলটি ৮৫ মিনিটে পায় স্বাগতিকরা। দলকে এগিয়ে দেন সেই সুয়ারেজ। অবশ্য এ গোলের মূল অবদানই ছিল মেসির। প্রায় মাঝ মাঠ থেকে একক দক্ষতায় কাটিয়ে ডি-বক্সের সামনে বল দেন সুয়ারেজকে। বল ধরে এগিয়ে বুদ্ধিদীপ্ত শটে ইন্টার গোলরক্ষককে পরাস্ত করেন এ ফরোয়ার্ড।
৮৯ মিনিটে গোল পেতে পারতেন মেসিও। ডেম্বেলের ক্রস থেকে জোরাল শট নিতে পারেননি। ফলে সহজেই সে বল ধরে ফেলেন ইন্টার গোলরক্ষক সামির।
ম্যাচ শেষে সুয়ারেজ বলেছেন, ‘আমি কখনোই যুদ্ধ ছাড়ি না। এরকম প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে আমাদের জন্য এটা অত্যন্ত মূল্যবান জয়। আমরা সচেতন ছিলাম যে, আমরা যদি প্রথমার্ধের মতো খেলতে থাকি তবে আমরা হারাতে পারি। কিন্তু মূল বিষয়টি ছিল আমরা ধৈর্য ধরি এবং সম্ভাবনা তৈরি করতে সক্ষম হই।’
আর বার্সা কোচ ভালভার্দে বলেছেন, ‘ইন্টার খুবই ভয়ঙ্কর দল। কোনোরকম সুযোগ পেলে তারা আরও বেশি ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। এই ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠা তাদের জন্য কোনো কাকতালীয় ব্যাপার নয়। তবে শেষ পর্যন্ত ‘যুদ্ধের ময়দানটা’ আমরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছি।’
ইন্টার বস কন্তের মন্তব্য, ‘এরকম পারফরম্যান্সের পর প্রশংসা পেয়ে ভালো লাগল, তবে আমরা এই ম্যাচ থেকে আরও অনেক বেশির প্রাপ্য ছিলাম। আমরা প্রমাণ করেছিলাম যে, আমরা বার্সার জন্য আসল সমস্যা সৃষ্টি করতে পারি, তবে আমাদের লজ্জা আমরা শেষ পর্যন্ত সেটা নিতে পারিনি।’







