আইন প্রণেতাদের বাসভবন লক্ষ্য করে মূত্রত্যাগের দৃশ্য পৃথিবীতে বিরল। প্রাচীর ঘেঁষে সবুজ ছাউনি ঘেরা ন্যাম ভবনে দেশের অতি সম্মানিত আইন প্রণেতাদের একাংশ স্বপরিবারে থাকেন। তার সঙ্গে লাগোয়া প্রাচীর। সেখানেই ২৩-২৪ ফুট প্রশস্ত রাস্তা। দুপাশে প্রাচীর আর মাঝখানে রাস্তাটি আগে যাই থাক, এখন খারাপ না। বেশ হন হন করে মোটরচালিত রিক্সা চলে, নাখালপাড়া রেলগেট টু ফার্মগেট অটো ও টেম্পু চলে। প্রাইভেট কার মাইক্রোবাস চলে। সকাল থেকে গভীর রাত এই গলিটি বেশ ব্যস্ততম। কিন্তু রিক্সাচালক কিংবা পথচারীর প্রস্রাবের বেগ এসব ব্যস্ততাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয়।
এই গলির মাঝামাঝি প্রাচীরের গোড়ায় দাঁড়িয়ে বা বসে জলবিয়োগের দৃশ্য চলতি পথের মানুষ নিয়মিত দেখতে পান। সকাল থেকে দুপুর হতে হতে মানুষের প্রস্রাব ন্যাম ভবনের প্রাচীর যতখানি পারে শুষে নেয়। বাকিটা প্রাচীরের গোড়ায় নর্দমার ময়লার সঙ্গে মিশে রাস্তার দিকে যাত্রা করে। বিকেলের দিকে মাঝে মাঝেই গলির মাঝামাঝি রাস্তাটি পুরোপুরি ভিজে ওঠে। লুকাস মোড় কিংবা ছাপড়া মসজিদের সামনের রাস্তা থেকে গলির দিকে ঢুকতেই মানুষের পেশাবের উগ্রগন্ধে মাথা ঘুরে ওঠে। গা গুলিয়ে যায়।
কিন্তু কিছু করার নেই। প্রাচীরের গায়ে পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যর্থ শ্লোগান হয়ে শোভা পায় ‘এখানে প্রস্রাব করা ও ময়লা ফেলা নিষেধ’। হ্যা এখানে কেউ ময়লা ফেলেন না বটে, তবে পেশাব করেন। কখনো মনে হয়, রিক্সাওয়ালা ভাইয়েরা পেশাব জমিয়ে রাখেন এখানে এসে ছাড়ার জন্য। এমনও দেখেছি দুটি রিক্সা দাঁড়িয়ে আছে, আর দুজন রিক্সাঅলা প্রাচীরে মাথা ঝুঁকিয়ে চাপমুক্ত হচ্ছেন। মোবাইলে ক্লিকের যুগে এসব দৃশ্য দেখে আমারও পকেটে হাত চলে যায়। মোবাইল বের করি। ক্যামেরা সিলেক্ট করি। ততক্ষণে পার হয়ে যায়। অনেকদিন ছবি তুলতে চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়ে আবার মোবাইল ফিরিয়ে পকেটে পুরেছি। আবার অনেক সময় মায়াও হয়। মনে হয়, সব মানুষেই বাইরে বেরিয়ে কখনো তীব্র পেশাবের বেগ-এ দিশেহারা অবস্থায় পড়েছেন। পড়ে থাকেন। বের হওয়ার আগে চাপমুক্ত হওয়ার অভ্যাস সবার থাকে না।
আসলে ব্যাপারটি হচ্ছে আইন প্রণেতার বাসভবন লক্ষ্য করে পেশাব। এটি পরিকল্পিত কিছু নয়। কোনোকিছুর প্রতিবাদও নয়। এটি কাকতালীয় এক সত্যি ঘটনা। যেটি প্রতিদিন ঘটে চলেছে।ঢাকার অন্যসব এলাকার মতো নাখালপাড়াও তার বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। এই নাখালপাড়ার অনেক ইতিহাস ও স্মৃতি রয়েছে।
রেললাইনের ওপর দীর্ঘ বাজার, ঘনবসতির জন্য এই এলাকার রয়েছে ভিন্ন পরিচিতি। রেললাইন কেন্দ্রিক বস্তিসহ একসময়ের অনেকগুলো বস্তিকে ঘিরে এখানে মাদক ও সন্ত্রাসের রাজত্ব ছিল। সেই দিন এখন পাল্টে গেছে। এখন নাখালপাড়া এলাকাটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, এমপি হোস্টেলসহ গুরুত্বপূর্ণ বেশকিছু স্থাপনার ঠিকানা হিসেবে গর্বিত।
এলাকাবাসীর আরো গর্ব রয়েছে এই এলাকার কৃতিসন্তানের তালিকায় বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা আসাদুজ্জামান খান কামাল এমপির নাম থাকায়। তার জন্ম মনিপুরিপাড়ায় হলেও তাকে নাখালপাড়ার সন্তান হিসেবে নিয়েই এলাকাবাসীর এই গর্ব। তিনি নাখালপাড়া এলাকাকে সন্ত্রাস ও মাদকমুক্ত করেছেন বলে জানা যায়। এলাকাবাসী বলে থাকেন, নাখালপাড়া পাল্টে গেছে অনেক দিক থেকেই। কিন্তু একটি সভ্য হয়ে ওঠা এলাকার একটি গলি পেশাবের গলি বা যুৎসই করে বললে ‘মূতের গলি’ নাম পেয়ে যাবে, ভাবতেও খারাপ লাগে। মূতের গলি’ ব্যাপারটি শুনতে ভূতের গলির কাছাকাছি মনে হয়। ছন্দে মিলও পাওয়া যায়। তারপরও খারাপ লাগে।
আমার মনে হয় ন্যাম ভবনের ওপর থেকে একটু কষ্ট করে সোজাসুজি নীচে তাকালে ‘মূতের গলি’র মূত্রকাণ্ড চোখে দেখা সম্ভব। নিশ্চয়ই অনেকেই দেখেছেনও। হয়তো উগ্রগন্ধও তাদের নাকে পৌঁছেছে। হয়তো এ বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণের কথা নিয়মিতই তারা ভুলে যাচ্ছেন।
যত্রতত্র মুত্রত্যাগ বন্ধে এ সরকারের ২০১৪-১৮ সেশনের ধর্মমন্ত্রী অর্ধ্যক্ষ মতিউর রহমানের একটি উদ্ভাবনী উদ্যোগ সবার কাছে প্রশংসিত হয়। বিভিন্ন প্রাচীর ও ভবনের দেয়ালে আরবি অনুবাদ করে লেখা হয় ‘এখানে প্রস্রাব করা নিষেধ’। তাতে জলবিয়োগকারীরা ভয় পেয়ে সাবধান হয়ে যান। এ নিয়ে বেশ রসাত্মক একটি ভিডিও রয়েছে ইউটিউবে। যা হোক, এমন উদ্যোগ নিলেও নাখালপাড়ার একটি গলি মানবমুত্রের অভিশাপ থেকে মুক্তি পায়।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








