মহাপরাক্রমশালী মুঘল সম্রাটদের বিপক্ষে বিক্রম দেখিয়ে বাংলার একটি অংশে স্বাধীনভাবে রাজত্ব করা বারো ভূঁইয়াদের শেষ স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে টিকে আছে ভূঁইয়াদের প্রধান ঈশা খাঁর পুত্র মুসা খানের নামে তৈরি মসজিদ। বাহ্যিক চাকচিক্য হারালেও নান্দনিক নির্মাণ শৈলীতে তৈরি এ স্থাপনা এখনও সচল রয়েছে জামে মসজিদ হিসেবে। কার্জন হল চত্ত্বরে অবস্থিত এ মসজিদে নিয়মিত জুমাসহ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন মুসল্লিরা।
তবে পর্যাপ্ত যত্ন ও তত্ত্বাবধানের অভাবে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের পূরাকীর্তি হিসেবে সংরক্ষিত মসজিদটি হারিয়েছে তার স্বাতন্ত্র্য। পূর্বদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তত্ত্ব বিভাগ, উত্তরে বিজ্ঞান অনুষদের ডিনের কার্যালয় ও অগ্রণী ব্যাংকের শাখা, দক্ষিণে শহীদুল্লাহ হল এবং ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান অনুষদের ডিনের কার্যালয়ের মাঝখানে তিন গম্বুজবিশিষ্ট মুসা খান মসজিদটি অনেকটা লোকচক্ষুর অন্তরালেই ঢাকা পড়ে আছে। ইতিহাস জানা না থাকলে দেখার পরেও অনুমান করা কষ্ট এটি ইতিহাসের একটি অমূল্য নিদর্শন।

গঠন
মুসা খান মসজিদটি দেখতে রমনার তিন নেতার মাজারের পেছনে অবস্থিত খাজা শাহবাজের মসজিদের মতোই। মাটি থেকে বেশ খানিকটা উঁচুতে অবস্থিত মসজিদটি। মঞ্চের মতো অংশে রয়েছে ছোট ছোট প্রকোষ্ঠ। যা এখন বন্ধই পড়ে থাকে।
মসজিদের দক্ষিণ পাশ দিয়ে বারো ধাপ সিঁড়ি পেরুনোর পর আসে মসজিদের দরজা। পূর্ব দিকে খোলা বারান্দা। পুরো মসজিদের দেয়াল বেশ চওড়া। মসজিদটির পূর্ব-পশ্চিমের দেয়াল ১ দশমিক ৮১ মিটার এবং উত্তর-দক্ষিণের দেয়াল ১ দশমিক ২ মিটার করে চওড়া বলে জানা গেছে। পূর্ব পাশের দেয়ালে তিনটি এবং উত্তর-দক্ষিণে দুটি খিলান দরজা।
মসজিদের ভেতরের অংশের পশ্চিম দেয়ালের মধ্যে একটি প্রধান ও তার পাশে দুটি ছোট মেহরাব। পুরো মসজিদটির দেয়াল সজ্জিত মুঘলরীতির নকশায়। বাইরের দেয়ালের চার কোণে চারটি মিনারখচিত আট কোণ বুরুজ। তার পাশে ছোট ছোট মিনার। বুরুজ ও ছোট মিনার রয়েছে ১৬টি। ছাদে তিনটি গম্বুজ। মাঝেরটি বড়। ওপরের কার্নিশ নকশাখচিত।

নির্মাণ ইতিহাস
বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুসারে, প্রধান প্রবেশপথের ওপরে একটি শিলালিপি ছিল, কিন্তু তা এখন আর নেই। জনশ্রুতি অনুযায়ী বলা হয় যে, মসজিদটি বারো ভূঁইয়া প্রধান ঈসা খান এর পুত্র মুসা খান (মৃত্যু ১৬২৩ খ্রি) নির্মাণ করেন। কিন্তু ইমারতের স্থাপত্যিক রীতি ঐতিহ্যগত ধারণাকে সঠিক বলে গ্রহণ করে না। মসজিদটির খোপ নকশাকৃত সম্মুখ ভাগ, গম্বুজের নিচে উন্মুক্ত প্রবেশপথ, অষ্টকোণাকার পিপার উপর স্কন্দাকৃতির গম্বুজ এবং অতিরিক্ত মিনারসহ কোণার বুরুজগুলি তথাকথিত মুসা খান মসজিদটিকে নিকটবর্তী খাজা শাহবাজ খান মসজিদ এর (১৬৭৯ খ্রি) সাথে প্রায় সাদৃশ্যপূর্ণ বলে প্রতীয়মান করে।
এ কারণে মসজিদটির নির্মাণকাল ওই একই সময়ের ধরা যেতে পারে। এটি শায়েস্তা খান এর আমলে নির্মিত অথবা পরবর্তী সময়ে মুসা খানের পৌত্র মুনওয়ার খানের তৈরি এবং নির্মাতা তার পিতামহের স্মরণে মুসা খানের নাম অনুযায়ী এর নামকরণ হয়।
বর্তমান অবস্থা
ঐতিহাসিক এ নিদর্শনটি পরিচালনার দায়িত্ব এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলের। মসজিদে মোট চারজন কর্মচারী থাকার কথা থাকলেও ইমাম এবং খাদেম ছাড়া বাকী দুটি পদ এখনও খালিই রয়েছে। ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মাওলানা মো. মামুনুর রশীদ।
মসজিদটির বর্তমান কার্যক্রম তুলে ধরে চ্যানেল আই অনলাইনকে তিনি বলেন: এখানে নিয়মিত পাঁচওয়াক্ত নামাজ আদায় করা হয়। কার্জন হলের শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ছাড়াও আশেপাশের হলের শিক্ষার্থীরা এখানে নামাজ আদায় করতে আসেন। তবে জুমার দিনে ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন আসেন নামাজ আদায় করতে।
ছাঁদ বেয়ে মসজিদের ভেতরে পানি প্রবেশ করায় গত রোজার ঈদের আগে সেটি সংস্কার করে ভেতরের অংশে নতুন করে রঙ করা হয়েছে বলে জানান ইমাম।
মসজিদটি এখন কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে জানতে চাইলে শহীদুল্লাহ হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক আইনুল ইসলাম চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: আমাদের হল কাছে হওয়ায় এটি হল থেকেই পরিচালনা করা হয়। তবে ইমামসহ অন্যান্যদের বেতনভাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেন্দ্রীয়ভাবে দেওয়া হয়। লোকবলও নিয়োগ করা হয় কেন্দ্রীয়ভাবেই।
হলের দায়িত্বে থাকলেও মসজিদটির রক্ষণাবেক্ষনের দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট অনুষদের বলে জানান শহীদুল্লাহ হলের প্রভোস্ট।








