পুরান ঢাকার যে মুন সিনেমা হলের মালিকানা নিয়ে মামলার প্রেক্ষাপটে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের রায় এসেছিল, সেই আলোচিত সিনেমা হলটির জমি ও স্থাপনার মূল্য বাবদ বাংলাদেশ ইতালিয়ান মার্বেল ওয়ার্কস লিমিটেডকে ৯৯ কোটি ২১ লাখ ৭৩ হাজার ৭৪ টাকা ২৭ পয়সার চেক হস্তান্তর করা হয়েছে।
মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন ৪ বিচারপতির আপিল বেঞ্চে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাষ্টের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ইতালিয়ান মার্বেল ওয়ার্কস লিমিটেডের ব্যাবস্থাপনা পরিচালক মাকসুদুল আলমের হাতে এই চেক তুলে দেয়া হয়।
আদালত আজ অথবা আগামিকাল কিংবা সুবিধাজনক সময়ে জমি রেজিস্ট্রি করে দিতে ইতালিয়ান মার্বেল ওয়ার্কসকে নির্দেশ দিয়ে এবিষয়ে পরবর্তী আদেশের জন্য ৫ জানুয়ারি দিন ধার্য করেছেন।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। আর ইটালিয়ান মার্বেল ওয়ার্কস লিমিটেডের পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি।
আলোচিত এই মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, পুরান ঢাকার ওয়াইজ ঘাটে এক সময়ের মুন সিনেমা হলের মূল মালিক ছিল ইটালিয়ান মার্বেল ওয়ার্কস লিমিটেড কোম্পানি। মুক্তিযুদ্ধের সময় ওই সম্পত্তি ‘পরিত্যাক্ত’ ঘোষণা করা হয় এবং পরে শিল্প মন্ত্রণালয় ওই সম্পত্তি মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের অধীনে ন্যাস্ত করে।
পরে ইতালিয়ান মার্বেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাকসুদুল আলম ওই সম্পত্তির মালিকানা দাবি করলে বিষয়টি মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের অধীনে ন্যাস্ত করা আটকে যায়। এরপর ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমান একটি সামরিক ফরমান ঘোষণা করেন, যাতে বলা হয়, সরকার কোন সম্পত্তিকে পরিত্যাক্ত ঘোষণা করলে আদালতে তা চ্যালেঞ্জ করা যাবে না। এতে করে মুন সিনেমা হলের সম্পত্তির বিষয়টি এর আওতায় পড়ে যায়।
কিন্তু ইতালিয়ান মার্বেল ওয়ার্কস এরপর ২০০০ সালে হাইকোর্টে একটি রিট করে, যেখানে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করা হয়। এরপর ২০০৫ সালের ২৯ আগস্ট হাইকোর্ট এক ঐতিহাসিক রায় দেয়। সে রায়ে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর খন্দকার মোশতাক, বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম, মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা গ্রহণ সংবিধান-বহির্ভূত ও বেআইনি ঘোষণা করা হয়।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ২০১০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের রায় বহাল রাখে এবং ৯০ দিনের মধ্যে মুন সিনেমা হল ইতালিয়ান মার্বেল ওয়ার্কস লিমিটেডকে ফেরত দিতে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টসহ সরকারের সংশ্লিষ্টদের প্রতি নির্দেশ দেয়।
এরপর দীর্ঘ সময়েও মালিকানা ফিরে না পেয়ে ২০১২ সালের ১০ জানুয়ারি ইতালিয়ান মার্বেল কর্তৃপক্ষ তখনকার ভূমিসচিব, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ছয় জনের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ দাখিল করে। সেই অভিযোগের শুনানি করেই আপিল বিভাগ মুন সিনেমা হলের জমি, স্থাপনার মূল্য নির্ধারণের জন্য অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীকে দায়িত্ব দেয়।
এরপর তিনি মুন সিনেমা হল ও এর জায়গার মূল্য ৯৯ কোটি ২১ লাখ টাকা নির্ধারণ করে আপিল বিভাগে প্রতিবেদন দেন। ওই প্রতিবেদন পাওয়ার পর ২০১৮ সালের বছরের ১৮ জানুয়ারি মুন সিনেমা হলের মালিককে এই অর্থ তিন কিস্তিতে পরিশোধের জন্য মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টকে নির্দেশ দেয় আপিল বিভাগ।
কিন্তু নির্ধারিত সময়ে তারা অর্থ পরিশোধ না করায় আপিল বিভাগ দ্রুত অর্থ পরিশোধের জন্য মুক্তিযুদ্ধ কল্যাণ ট্রাস্ট কর্তৃপক্ষকে মৌখিক নির্দেশ দেয়। ওইদিন আদালত বলে, অর্থ পরিশোধ না করলে সংশ্লিষ্ট সবাইকে তলব করা হবে। এরপর মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট আদালতে বলে এত টাকা দিতে তারা দিতে অপারগ, তাই সরকারকেই টাকা পরিশোধ করতে হবে।
এরপর অর্থ মন্ত্রণালয়ের এ সংক্রান্ত এক চিঠি অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম আদালতে উপস্থাপন করেন। সে চিঠিতে বলা হয়, “মুন সিনেমা হল ও এর সম্পত্তির মূল্য বাবদ ৯৯ কোটি ২১ লাখ ৭৩ হাজার ৭৪ টাকা ২৭ পয়সা পরিশোধের জন্য মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের অনুকূলে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এরপর গত ৩০ জুন ইতালিয়ান মার্বেলস ওয়ার্কস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাকসুদুল আলম বরাবর সরকার ৯৯ কোটি ২১ লাখ ৭৩ হাজার ৭৪ টাকা ২৭ পয়সার চেক ইস্যু করে আদালতে উপস্থাপন করেন।
কিন্তু মাকসুদুল আলমের নামে চেক ইস্যু করায় বাংলাদেশ ইতালিয়ান মার্বেল ওয়ার্কস লিমিটেডের আইনজীবী আপত্তি জানান। তিনি মাকসুদুল আলমের পরিবর্তে বাংলাদেশ ইতালিয়ান মার্বেল ওয়ার্কস লিমিটেডের অনুকূলে চেক দেওয়ার আবেদন করেন।
এরপর আপিল বিভাগ বাংলাদেশ ইতালিয়ান মার্বেল ওয়ার্কস লিমিটেডের অনুকূলে চেক দেওয়ার নির্দেশ দেন। সে অনুযায়ী আজ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাষ্টের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ইতালিয়ান মার্বেল ওয়ার্কস লিমিটেডের ব্যাবস্থাপনা পরিচালক মাকসুদুল আলমের হাতে চেক তুলে দেয়া হয়।







