মুজাহিদের ফাঁসির এক বছর পূর্ণ হয়ে গেলো। এক-বছর আগে আজকের এই দিনে মুজাহিদের সমর্থক জামাত শিবিরের নিবেদিত প্রাণ কর্মীরা জীবন দিয়ে চেষ্টা করছেন এই দেশের মানুষদের ভুল বুঝিয়ে এটা প্রমাণ করতে যে তাদের নেতা নির্দোষ। অনলাইনে এই কাজটি করার জন্য মুখ্য ভূমিকা পালন করে দশ লক্ষ ফ্যান, ফলোয়ার বিশিষ্ট বাঁশেরকেল্লার অফিসিয়াল পেজ।
উল্লেখ্য জামাত-শিবির পরিচালিত এই পেইজ থেকে নিয়মিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করার জন্য বিভিন্ন কন্টেন্ট আপলোড করা হয় এবং সেসব কন্টেন্টের পেছনে থাকে প্রচুর অর্থ, ফলে সাধারণ মানুষ চাকচিক্যময় নিউজ, ভিডিও দেখে সহজেই হয় বিভ্রান্ত। উল্লেখ্য সাম্প্রতিক সময়ে সাম্প্রদায়িক হামলাগুলোতেও এই ‘বাঁশেরকেল্লা’ এবং তাদের সমর্থক পেইজগুলো ইন্ধন জুগিয়েছে এবং এখনো সাম্প্রদায়িক উসকানি দিয়ে যাচ্ছে।
আজকের লেখায় বাঁশেরকেল্লার কিছু কু-যুক্তি নিয়ে আলোচনা করবো। এই প্রত্যুত্তর গুলো আইনি উত্তর নয়, একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে আমার বিশ্লেষণ।
কাদের মোল্লা আর সাইদীর সময় কেল্লা যেমন এই কাদের সেই কাদের না, এই সাইদী সেই সাইদী না, এই সাকা সেই সাকা না… ম্যাতকার করতো কামারুজ্জামান কিংবা মুজাহিদের বেলায় এসে সেটা আর ওরা করতে পারে নাই। কারণ কামারুজ্জামান ছিলো লোকাল সেলিব্রেটি জামাত নেতা। আর মুজাহিদ বদর বাহিনীর প্রধান হয়ে সে কেবল এদেশেই না পাকিস্তানেও বিরাট বিখ্যাত অনেক আগ থেকেই। তাদের চেহারা পত্রিকায় প্রকাশিত, হঠাৎ করে নাম পাল্টে অন্য কাউকে ফাঁসানোর চেষ্টা করতে পারে নাই।
নিরুপায় হয়ে তখন ছাগুরা যুক্তি দেখায় সাক্ষীরা নাকি মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছে। কিন্তু মিথ্যা সাক্ষ্য গুলো কি জানতে চাইলে তারা হাস্যকর সব ভুল তুলে ধরে। সাক্ষীরা নাকি মিথ্যা কথা বলছে কারণ তারা সাক্ষ্য দেয়ার সময় ৪৪ বছর আগের নির্দিষ্ট কোন একটা সময়ের সাল, দিন, তারিখ ইংরেজিতে ঠিকমত বলতে পারলেও বাংলায় ঠিকমত বলতে পারে নাই!! তাদের সাক্ষ্য ভুল, কারণ তারা প্রাণভয়ে ৭১-সালে থানা-পুলিশ-মামলা করে নাই!!
তাদের সাক্ষ্য ভুল, কারণ তারা তাদের এলাকার সব রাজাকারদের নাম-ঠিকানা জানে না… ইত্যাদি ইত্যাদি। একটা মামলার দেখা গেলো কোন একটা গণহত্যার কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধের সুপিরিয়র নেতৃত্ব দেয়ার অভিযোগ এসেছে, অর্থাৎ কোন একটা জায়গায় সে হত্যাযজ্ঞ চালানোর জন্য নির্দেশ দিয়েছিলো, পাঠক লক্ষ্য রাখবেন ‘নির্দেশ দিয়েছে’, ‘ঘটনাস্থলে উপস্থিত’ থাকেনি। তো সেই মামলার ভিক্টিমেরা সাক্ষ্য দিতে এসে বলেছে তারা ঘটনাস্থলে কামারুজ্জামানকে দেখে নাই কিন্তু সাক্ষী প্রমাণে দেখা গেলো বাইরে থেকে তিনি এটার নির্দেশ দিয়েছিলেন!! সুতরাং এটা নাকি প্রমাণ হয় কামারুজ্জামান নির্দোষ!!
কি আশ্চর্য এদের যুক্তিবোধ!! আপনি কোন একটা জেলা সদর থেকে কিংবা শহর থেকে আপনার প্রশিক্ষিত খুনিদের নির্দেশ দিলেন কাউকে খুন করে আসার। খুন করাও হয়ে গেলো পরিবারের সামনে। প্রতক্ষ্যদর্শী সাক্ষীরা সেখানে আপনাকে দেখলো না। তাহলে কিভাবে প্রমাণিত হয় যে ‘আপনি খুনের নির্দেশ দেন নি?’।
আপনি যুদ্ধের সময় এবং যুদ্ধের পরে দেখছেন আপনার ওপর নির্যাতনকারী এলাকার রাজনৈতিক নেতা, বড় ধর্মগুরু, আপনি তার বিরুদ্ধে কিভাবে মামলা করার সাহস করবেন? ১৯৭১ সালের সংগঠিত অপরাধের প্রত্যক্ষদর্শী আপনি, সেটা আজকে থেকে ৪৫ বছর আগের কথা, এখন আপনার বয়স ষাটোর্ধ, আপনি ১৯৭১ সালের একটা তারিখ ভুলে গেলেই আপনার সাক্ষ্য মিথ্যা হয়ে যাবে!! কি আশ্চর্য এদের যুক্তি!!
দেখা যাচ্ছে ১৯৭১ সালে স্থানীয় বদর নেতা কামারুজ্জামানের নেতৃত্বে হরহামেশা মিটিং মিছিল হয়েছে। সেইসব খবর গুরুত্বসহকারে ছেপেছে তাদের মুখপাত্র ‘দৈনিক সংগ্রাম’। শুধুমাত্র বদরের নেতৃত্ব দেয়ার জন্যই একে ফাঁসি দেয়া যায়, আর আমাদের হাতে তো প্রচুর সাক্ষ্য-প্রমাণ ছিলোই। মজার ব্যাপার হচ্ছে এই সংগ্রাম পত্রিকাটাই এখন জামাতের সবচেয়ে বড় গলার কাঁটা। যুদ্ধের সময় হিংসা-লিপ্সা আর খুনের মন্ত্র দাবনলের মত তারা ছড়িয়ে দিয়েছিলো যেই সংগ্রাম দিয়ে, সেই সংগ্রামের প্রতিবেদনগুলোই এখন তাদের ফাঁসির পয়গামের সিঁড়ি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফিরে আসি আলবদর কিলিং স্কোয়াডের কমান্ডার মুজাহিদের কথায়। এই নরপশু আমার দেখা একজন আদর্শ পারফেক্ট চেহারাধারী রাজাকার। এই লোকটার জন্য সাক্ষী প্রমাণের একটুও অভাব হয় নাই। এর বিরুদ্ধে এত এত সাক্ষ্য প্রমাণ ছিলো যে কোন চাক্ষুষ সাক্ষি ছাড়াই কেবল স্ব-স্বীকৃত বদর বাহিনীর কমান্ডার হিসেবেই তার ফাঁসির দড়ি পরিস্কার হয়ে যায়।
আগ্রহ নিয়ে দেখছিলাম মুজাহিদকে বাঁচানোর জন্য শিবির কি কি যুক্তি নিয়ে আসে। হাস্যকর একটা যুক্তি ছিলো আলবদর হেড-কোয়ার্টার মোহাম্মদপুর ফ্যিজিকাল ট্রেনিং সেন্টারের দারোয়ানের পুত্রের সাক্ষ্য বাতিল করে দেয়ার একটা প্রচেষ্টা। কারণ সাক্ষীর বয়স ছিল ১৪ বছর।
মজার ব্যাপার হচ্ছে মোহাম্মদপুর ফ্যিজিকাল ট্রেনিং সেন্টারে যে মুজাহিদের যাতায়াত ছিল সেটা সংগ্রামের বিভিন্ন প্রতিবেদন ছাড়াও এমনকি পাকিস্তানে পালিয়ে যাওয়া বদর নেতাদের লেখা পাকিস্তানী পুস্তিকায়ও পাওয়া যায়। ১৬ ডিসেম্বর মুজাহিদ বদর নেতাদের পালিয়ে যেতে বলার কথা, মোনাজাত করার কথা এখনো শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে পাকিস্তান জামাতের তরুণ ছাত্রনেতারা।
এই যুক্তি ছাড়া আর পেলাম মুজাহিদের ছেলের ভাষ্য। তার বাবা ১৯৭০ সালের আগে ঢাকা শহরে আসে নাই এবং তখন মুজাহিদের বয়স ছিল মাত্র ২৩ বছর সুতরাং মুজাহিদ ঢাকা শহর চেনে না এবং যেহেতু তার বয়স মাত্র ২৩ সুতরাং সে কোন খুন করে নাই। এছাড়া সে বলেছে কোন বুদ্ধিজীবীকে তার বাবা মেরেছে সেটা নাকি বলা হয় নাই, সুতরাং তার পিতা নির্দোষ।
হাসান জামিল ছিলো কাদের মোল্লা পুত্র, ওয়ামি কামারুজ্জামান পুত্র, আজমি গোলামের পুত্র। এদের তাও কিছু স্মার্ট যুক্তি দিতে দেখেছি কিন্তু মুজাহিদের পুত্র পুরাই গোবর-মস্তক। বুদ্ধিশুদ্ধি তার ঘটে নাই তেমন।
তার মতে- ১৯৭০ সালে তার বাবা ঢাকায় আসেন গ্রামের অবুঝ-বলদ-লাজুক-বোকা এবং শান্ত, চুলে চপচপে তেল দেয়া ২৩ বছরের বাচ্চা ছেলে হয়ে। তার ভাষ্যমতে দৃশ্যকল্প চিন্তা করলে দেখা যায় সে ঢাকা শহর চেনে না, রাস্তায় রাস্তায় এতিমের মত ঘুরে বেড়ায়, অসহায়ের মত জীবন ধারণ করে। অথচ শহরে এসেই এক বছরের মাথায় এই অবুঝ-বলদ-লাজুক-বোকা এবং শান্ত, চুলে চপচপে তেল দেয়া ২৩ বছরের বাচ্চা ছেলেটা পাকিস্তানের মূলধারার পত্রিকাগুলোতে দুর্দান্ত প্রতাপে লেখালেখি শুরু করে। তাও চিঠিপত্র কিংবা প্রেমের কবিতা নয় সরাসরি উপ-সম্পাদকীয়।
আর সেসব কলামের শিরোনাম হয় ‘অস্ত্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র- যুক্তি নয়’, ‘বুদ্ধিজীবীদের নিধন করতে হবে’, ‘যেখানেই মুক্তিবাহিনী সেখানেই আল-বদর’ আরও কত কি। সেসব লেখায় ধুমধাম মানুষকে খুন করতে বলা হয়, অস্ত্র হাতে ঝাঁপিয়ে পড়তে বলা হয়, হিন্দুদের খতম করতে বলা হয়। এই শান্ত ছেলেটা হাজার-হাজার মানুষের সমাবেশে বক্তব্য দিয়ে বেড়ায় তাও প্রধান অতিথি হয়ে। সেই সব সমাবেশ থেকে স্বয়ং তার বক্তব্যেই নির্বিচারে মানুষ খুন করতে বলা হয়!!
তার বিরুদ্ধে নাকি কোন বুদ্ধিজীবীকে মারা হয়েছে সেটার উল্লেখ নাই, আহারে আমার অবুঝ-বলদ-লাজুক-বোকা এবং শান্ত, চুলে চপচপে চুলে তেল দেয়া ছেলে! যেই লোকটা সমস্ত অপারেশনের সুপিরিয়র নেতৃত্ব দিয়েছে; তাকে আলাদা করে কোন বুদ্ধিজীবীর হত্যাকাণ্ডের দায় দিতে হবে?
জেনারেল নিয়াজি পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর প্রধান। তার বিরুদ্ধে কি সরাসরি ছুরি হাতে কাউকে খুন করার, বেয়োনেট চার্জ করার, ব্রাশফায়ার করার চাক্ষুষ সাক্ষী পাওয়া সম্ভব? এখন কাউকে সরাসরি খুন করেনি বলে কি সে তিরিশ লক্ষ মানুষের খুনের নেতৃত্ব দেয়ার দায় থেকে মুক্ত হয়ে যাবে?
মুজাহিদ পুত্র বললেন তার বাবার বয়স একাত্তরে মাত্র ২৩। আসলেই তাই মুজাহিদের জন্ম ১৯৪৮ সালে, হিসেবে ১৯৭১ সালে তার বয়স ২৩ বছরই হয়। এবারে আসুন আরও কিছু তথ্যের সামনে দাঁড় করাই আপনাদের… তাহলে বুঝতে পারবেন ২৩ বছর কি আসলেই ‘মাত্র ২৩’ বছর কি না?
বীরশ্রেষ্ঠ মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল-
(জন্ম: ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৪৭- মৃত্যুঃএপ্রিল ১৮, ১৯৭১) বয়সঃ ২৪ বছর
বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর-
(জন্ম: ৭ মার্চ, ১৯৪৯ – মৃত্যু: ১৪ ডিসেম্বর, ১৯৭১) বয়সঃ ২২ বছর
বীরশ্রেষ্ঠ মোহাম্মদ হামিদুর রহমান-
(জন্ম:২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫৩ – মৃত্যু: ২৮ অক্টোবর, ১৯৭১) বয়সঃ ১৮ বছর
এরা যুদ্ধ করেছিলেন। দুর্দান্ত প্রতাপে জালেম পাক সেনাদের হত্যা করেছিলেন। তাঁদের মত যোদ্ধারা ছিলেন বলেই আজ আমরা এই মাটিতে দাঁড়িয়ে কথা বলতে পারছি…
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








