একদিনে অর্জিত হয়নি স্বাধীনতা। গৌরবময় ঐতিহ্য নিয়ে ধাপে ধাপে স্বাধীনতা লাভ করেছে বাংলাদেশ। দীর্ঘ নয় মাসের এই সংগ্রামে বাংলাদেশকে স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করেছে ভিনদেশী কিছু শিল্পী বন্ধু। বাংলাদেশের স্বাধীনতার লাল সূর্য ছিনিয়ে আনতে ভিনদেশী এসব শিল্পীদের অপরিসীম ভূমিকা ছিল।
২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকায় গণহত্যা শুরু করে। এই খবর ২৭ মার্চ ভারতের অধিকাংশ সংবাদপত্রে ছবিসহ ছাপা হয়। সেই খবর মন ছুঁয়েছিল বলিউডের সেই সময়ের অনেক তারকার। বাংলাদেশের নিরস্ত্র মানুষের ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার বিবরণ জানার পর আবেগাপ্লুত হয়ে পরেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী ওয়াহিদা রেহমান। সেই সময়ের ব্যস্ততম এই অভিনেত্রী খুব অল্প সময়ের মধ্যেই মুম্বাইয়ের বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী ও চলচ্চিত্র তারকাদের সঙ্গে দেখা করে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত তৈরি করেন। তারকাদের এগিয়ে আসার কারণে প্রচুর অর্থনৈতিক সহায়তাও পেয়েছিল স্বাধীনতাকামী মানুষ। শর্মিলা ঠাকুর, সুনীল দত্ত এবং নার্গিস দত্তও হাত বাড়িয়েছিলেন বাংলাদেশের বন্ধু হিসেবে।
প্রতিটি আন্দোলনের সাথেই ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে থাকে গান। যুদ্ধের দিনগুলোতে মুক্তিকামী মানুষের বিদ্রোহী সত্তাকে জাগিয়ে তুলেছিল গান। বিশেষ করে স্বাধীন-বাংলা বেতারের সংগীত সংশ্লিষ্টরা মুক্তিযোদ্ধা আর শরণার্থীদের মনে প্রেরণা যুগিয়েছিল। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সাথেও জড়িত ছিলেন অনেক বিদেশী শিল্পী। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে তখন কলকাতার শিল্পী অংশুমান রায়ের গাওয়া ‘শোন একটি মুজিবরের থেকে’, বাপ্পী লাহিড়ীর সুরে আবদুল জব্বারের গাওয়া ‘হাজার বছর পরে’ এবং ‘সাড়ে সাত কোটি মানুষের আরেকটি নাম’ গানগুলো খুব জনপ্রিয় ছিল। এছাড়াও হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, লতা মুঙ্গেশকর, সলিল চৌধুরী, আশা ভোঁসলে, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, পণ্ডিত রবি শংকর, ওস্তাদ আলী আকবর খান, ওস্তাদ আল্লারাখা খান, বনশ্রী সেনগুপ্ত, দ্বিজেন, শ্যামল, মানবেন্দ্র, সত্যব্রত দত্ত, ভূপেন হাজারিকা, নির্মলা মিশ্র, রাহুল দেববর্মণ, দেবব্রত বিশ্বাস, ললিতা ধর চৌধুরী, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, উত্পলা সেন, অংশুমান রায়, নির্মলেন্দু চৌধুরী, শচীন দেববর্মণ, মিন্টু দাশগুপ্ত, বাপ্পি লাহিড়ী এবং আরও অনেক শিল্পী স্বাধীনতার যুদ্ধে সংগীত সৈনিক ছিলেন। বাঙালির স্বাধীনতার আকুতিকে সংগীতের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন এই মহান শিল্পীরা। স্বাধীন বাংলা বেতারের পাশাপাশি শিল্পীরা ভারতের শরণার্থী শিবিরে সংগীত পরিবেশন করেন অনেক ভারতীয় শিল্পী। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে সংগীত পরিবেশন করে তা থেকে যে অর্থ উপার্জিত হয়, তা তুলে দেওয়া হয় অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের হাতে।
কনসার্টের মাধ্যমে বাঙালির সংগ্রামের কথা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিয়েছিলেন অনেক শিল্পী। ভারতের প্রখ্যাত সেতারশিল্পী পণ্ডিত রবি শঙ্করের অনুরোধে বাংলাদেশের মানুষদের সহায়তা করার জন্য জর্জ হ্যারিসন আয়োজন করেন ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’। ১৯৭১ সালের ১ আগস্ট নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ারে আয়োজিত এই কনসার্টে যোগ দেন স্পেনের রিংগো স্টার ও লিওন রাসেল, পপ গায়ক বব ডিলান, যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের গায়িকা জোয়ান রায়াজ, জার্মান সঙ্গীতশিল্পী ক্লাউস ভুরম্যান, এরিক ক্ল্যাপটন, ভারতের সেতারশিল্পী পণ্ডিত রবি শঙ্কর, সরোদশিল্পী ওস্তাদ আলী আকবর খান ও তবলাশিল্পী ওস্তাদ আল্লারাখা। শিল্পী জোয়ান বায়াজ আসতে না পারলেও কনসার্টের জন্য লিখেছিলেন তাঁর অমর ‘বাংলাদেশ বাংলাদেশ’ গানটি। এছাড়াও গানের আসর বসেছিল লন্ডনের অ্যালবার্ট হলে এবং বার্লিনের আলেকজান্ডার প্লাজায়।
১৯৭১ সালের নভেম্বরে ইংল্যান্ডের ৭টি শহরে আয়োজন করা হয় ‘কনসার্ট ইন সিমপ্যাথি’। বাংলাদেশ, ভারত এবং ইংল্যান্ডের নামী সব শিল্পীদের অংশগ্রহণে আয়োজিত হয় এই কনসার্ট। এছাড়াও বাংলাদেশের স্বাধীনতা প্রত্যাশীদের সাহায্যের জন্য লতা মুঙ্গেশকর, ওয়াহিদা রেহমান এবং শর্মিলা ঠাকুরের আয়োজনে কনসার্ট ‘স্ট্রিংস অ্যান্ড স্টারস-এ ক্রাই ফর হেল্প’ অনুষ্ঠিত হয়। এই কনসার্টে অংশগ্রহণ করেন অশোক কুমার, আশা পারেখ, অমিতাভ বচ্চন, সুনিল দত্ত, নার্গিস, অরুনা ইরানীসহ আরও অনেক বলিউড তারকা।
স্বাধীনতা যুদ্ধে বিদেশী শিল্পীদের এই অংশগ্রহণ স্বাধীনতাকামী মানুষ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের মনে জুগিয়েছে সাহস এবং শক্তি। দেশী শিল্পীদের পাশাপাশি বিদেশী শিল্পীরা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানকে দেখিয়েছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন। তাদের নিঃস্বার্থ অংশগ্রহণের জন্যই স্বাধীন বাংলাদেশের আকাশে উড়ে লাল-সবুজ পতাকা।








