পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতারের পরে কয়েক দফায় জ্ঞান হারান ফজিলাতুন নেছা মুজিব। সেসময় ধানমন্ডি ৩২ থেকে বের হয়ে বিভিন্ন জায়গায় থাকার জন্য কত অনুনয়-বিনয় করেছিলেন, কিন্তু বঙ্গবন্ধুর পরিবার পাকিস্তানি আর্মি জানলে যে কোন সময় আক্রমণ করতে পারে এই ভয়ে কেউ তাদেরকে থাকতে দিতেন না, বাসা ভাড়া দিতেন না। যে সব জায়গায় এক দুই দিনের জন্য থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল, পরিচয় জানার পর তড়িৎ গতিতে অন্যের নিরাপত্তার কথা ভেবে বাসা পরিবর্তন করতে হয়েছে।
এ সময়ে শেখ কামালসহ অন্যান্য সন্তানদের দুশ্চিন্তায় কয়েকবার জ্ঞান হারান ফজিলাতুন নেছা মুজিব। প্রকৃত অর্থে বেগম মুজিব ছিলেন একজন তেজস্বী ও অত্যন্ত সাহসী মহিলা। যে কোন বিপদ আপদকে অত্যন্ত ধৈর্য্যরে সহিত মোকাবেলা করার দক্ষতা ছিল ফজিলাতুন নেছা মুজিবের। প্রাথমিক ধাক্কা সামলে তিনিই আবার সকলকে সান্ত্বনার বাণী শোনান, বলেন; আরে এ তো নতুন কিছু না, তোমাদের আব্বা তো প্রায়ই জেলে যান, এবারও গিয়েছেন, সব ঠিক হয়ে যাবে শীঘ্রই।
অন্যদিকে চরম দুঃসময়ের মধ্যে নাতি জয়ের আগমন বার্তা ছিল ফজিলাতুন নেছা মুজিবের সংসারে। এ বাসা হতে ও বাসা করে মালিবাগ চৌধুরী পাড়া হতে মগবাজার। এমন করে অনেক বাসায় ঘোরাঘুরি করেও শেষ রক্ষা হয়নি তাদের। দুঃখ, দুর্দশা যার সবসময়ের সঙ্গী, এমন কঠিন সময়ে তিনি কিভাবে স্বস্তি পাবেন? জীবনের অধিকাংশ সময় কষ্ট আর যাতনার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করতে হয়েছে ফজিলাতুন নেছার পরিবারের।
বঙ্গবন্ধুর স্নেহভাজন এক ব্যক্তির মাধ্যমে আর্মিরা ফজিলাতুন নেছা মুজিবের অবস্থান সম্পর্কে জ্ঞাত হয়। পরবর্তীতে আর্মিরা তাদের গ্রেপ্তার করে ধানমন্ডির ১৮নং রোডের একটি বাড়িতে স্থান দেয়। এ সময় ফজিলাতুন নেছা মুজিবের সাথে ছিলেন হাসিনা, জামাল, রেহানা, রাসেল, এম এ ওয়াজেদ মিয়া ও মমিনুল হক খোকা। কিন্তু জীবনযাপনের তেমন কোন ব্যবস্থাই ছিল না বাড়িটিতে। এ রকম দুর্যোগ পরিস্থিতিতে প্রথম দিনে সারারাত না খেয়ে উপোস থাকতে হয় ফজিলাতুন নেছার পরিবারকে আর ওদিকে খাওয়া দাওয়ার ধুম পড়েছিল সৈন্যদের মাঝে। একজন মা হিসেবে সারারাত সন্তানদেরসহ উপোস থাকা যে কতটা কষ্টের ও বেদনার তা একজন ভুক্তভোগী মাত্রই অনুধাবন করতে পারবেন। পাশাপাশি খালি ফ্লোরে সকলকেই সারারাত সজাগ থাকতে হয়।
ধানমন্ডির ১৮নং রোডের বাড়িতে ফজিলাতুন নেছার কোন আত্মীয়স্বজনকেও প্রবেশ করতে দেওয়া হতো না। ঐ বাড়িতে প্রথমাবস্থায় মমিনুল হক খোকা ও ড. ওয়াজেদ মিয়াকে ঢুকতে আপত্তি জানালেও রেণুর যুক্তিতর্কে বাড়িতে ঢুকতে কোন অসুবিধা করেনি প্রহরারত সৈন্যরা। যদিও বারংবার সার্চিং এর মাধ্যমে ঢুকতে দিত তাদেরকে। যেদিন যুদ্ধের খবর খারাপ ছিল সেদিন খুব খারাপ ব্যবহার করত সৈন্যরা তাদের সাথে, হাতে ব্লেড রেখে ভয় দেখাত নানাভাবে। আর গার্ডে যারা ছিল তাদের ব্যবহার ছিল খুবই উদ্ভট ও কর্কশ স্বভাবের। মনে হয়, তাদেরকে বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পর ঐ বাড়িটিতে পাঠানো হয়। বাইরে থেকে খাবার-পণ্য আনতেও সমস্যায় ফেলত পাকিস্তানি সৈন্যরা। তারা এমনভাবে ব্যবস্থা করেছিল যেন ধুঁকে ধুঁকে শেখ মুজিবের পরিবারকে নিঃশেষ করে দেওয়া যায়।
দেশের এ অস্থির সময়ে শেখ হাসিনার শারীরিক অবস্থা দিনকে দিন খারাপের দিকে চলে গিয়েছিল। ফজিলাতুন নেছা মুজিব মমতার বন্ধনে হাসিনাকে বুকের উষ্ণতার আঁচলে বেঁধে রাখতেন প্রতিনিয়ত। যুদ্ধের সময় গর্ভবতী মেয়েকে নিয়ে গভীর সংকটের মধ্যে পড়েছিলেন। শত বিপদের মধ্যেও তিনি সন্তানদের সামনে কান্নাকাটি করতেন না। বিপদের সময় রেণু তসবীহসহ জায়নামাজে বসে পরতেন। সে সময়টায় বঙ্গবন্ধু পরিবারের সাথে বাড়ির কাজের লোকজন ছায়ার মত লেগে ছিল। সবাইকে নিয়ে অভাব অনটনের মাঝেই চলছিল রেণুর সংসার। তারপরেও উদাসীনতা বা ব্যাকুলতা প্রশ্রয় পায়নি ফজিলাতুন নেছার অন্তরাত্মায়। যুদ্ধাবস্থার খুব দ্রুত অবসান হবে এ বিশ্বাসেই তিনি অন্তরে বেঁচে থাকার বীজ বপন করেছিলেন। তাছাড়া রেণুর জীবদ্দশায় অধিকাংশ সময় সংগ্রাম-আন্দোলন মোকাবিলা করেই সংসার চালিয়েছেন।

যুদ্ধের উত্তাল সময়ে একদিন ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বঙ্গবন্ধুর পরিবারের বিশ্বস্ত মমিনুল হক খোকাকে একটি স্বাক্ষর দেখিয়ে বলেন, দেখুন তো এই স্বাক্ষরটা চিনেন কিনা- মমিনুল হক খোকা বললেন, জ্বি এটি বঙ্গবন্ধুর স্বাক্ষর। পরে ব্যাংকটির কর্মকর্তা বললেন, বঙ্গবন্ধু তার পরিবারের জন্য ব্যাংকে টাকা গচ্ছিত রেখে গেছেন যেন যুদ্ধের সময় এ টাকা কাজে লাগে। ফজিলাতুন নেছা মমিনুল হক খোকার মাধ্যমে জানতে পেরেছিল ব্যাংকে শেখ মুজিব টাকা রেখে গিয়েছিলেন যেন তিনি জেলে থাকাবস্থায় পরিবারের কোন আর্থিক কষ্ট না হয়। এ সংবাদটুকু এবং প্রয়োজনের সময় আর্থিক যোগান পাওয়ার সম্ভাবনার বিষয়টি ফজিলাতুন নেছাকে পুলকিত করে তোলে। কারণ, তিনি জেনেছিলেন এবং অভিজ্ঞতার মাধ্যমে অর্জন করতে পেরেছিলেন বঙ্গবন্ধু জেলে থাকাকালীন সময়ে তারা বাসা ভাড়া পেত না, কেউ তেমন স্বেচ্ছায় যোগাযোগ করতেন না বঙ্গবন্ধুর পরিবারের নিজস্ব প্রয়োজনে। বঙ্গবন্ধু জানতেন, পাকিস্তানি জান্তা যুদ্ধের দিকেই অগ্রসর হচ্ছেন এবং সে সময়ে ফজিলাতুন নেছার বিপদ এবং কষ্টের তীব্রতা অনুধাবন করতে পেরে তিনি এ কাজটি করে গিয়েছিলেন।
যুদ্ধের উত্তাল সময়ে সন্তানসম্ভবা শেখ হাসিনা ধানমন্ডির ১৮নং রোডের বাড়িতে ফজিলাতুন নেছার সঙ্গেই থাকতেন। বাড়িটিতে অল্প কয়জন মানুষ ছাড়া কাউকেই প্রবেশ করতে দেওয়া হত না। খুব কড়া নজরদারি রাখা হত পাকিস্তানি আর্মিদের মাধ্যমে। একদিন প্রসব বেদনায় কাতর শেখ হাসিনা, হাসপাতালে নেওয়ার প্রস্তুতি হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল- হাসিনার সাথে ফজিলাতুন নেছা মুজিবকে হাসপাতালে যাওয়ার অনুমতি দেয়নি পাকিস্তানি সৈন্যরা। একবার ভাবা যায়, মেয়েটি সন্তানসম্ভবা; এহেন সংকটের মুহূর্তে মাকে সন্তানের সাথে যাওয়ার অনুমতি প্রদান করা হয় না। আপনি কি ডাক্তার যে আপনার মেয়ের সাথে হাসপাতালে যাবেন, এ বলে রেণুকে হাসপাতালে যাওয়ার অনুমতি দেয়নি কর্তৃপক্ষ। অবশ্য পাকিস্তানি জান্তাদের মানবিক বিবেচনা, বিবেকবোধ বলে কিছুই ছিল না, ছিল না স্বাভাবিক বিচারভঙ্গি। সন্তানের জীবন-মরণ মুহুর্তেও মা’কে থাকতে দেওয়ার অনুমতি দেয়নি পাকিস্তানি সামরিক জান্তা।
এহেন পরিস্থিতিতে হাসিনাকে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার খুব প্রয়োজন দেখা দেয় এবং অনেক কষ্টে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিন্তু নিকট আত্মীয়দের কাউকে যাওয়ার অনুমতি দেয়নি। তবে সঙ্গত কারণে একজন আয়াকে রাখার অনুমতি প্রদান করা হয়। এ অবস্থায় ফজিলাতুন নেছা অত্যন্ত সুকৌশলে আয়া হিসেবে বঙ্গবন্ধুর বোন লিলিকে ঢাকা মেডিকেলে রাখার ব্যবস্থা করেন। জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ের ঘটনা এটি। চারদিকে যুদ্ধের ডামাডোল। তখন ঢাকা মেডিক্যালকে কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হতো মুক্তিযোদ্ধা এবং রাজনৈতিক কর্মীদের সাথে যোগাযোগ রক্ষার্থে। সকলের তথ্য আদান প্রদানের একটি সুযোগ তথা যোগাযোগ তৈরি হয় ঢাকা মেডিক্যালের মাধ্যমে।
গোয়েন্দাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে ফজিলাতুন নেছা মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পত্রযোগে রণাঙ্গনের খবরাখবর নিতেন এবং দিকনির্দেশনা দিতেন। ফজিলাতুন নেছা মুজিব ছাড়াও স্বাধীনতাকামী অন্যান্য ব্যক্তিরা ঢাকা মেডিক্যালকে কেন্দ্র করে সকলের সাথে যোগাযোগ করতে পারতেন।
চলবে…







