একজন গ্রামের নায়ক! তাকে নানা সময়ে নানান চরিত্রে নানা ভাবে দেখা গেছে। ‘লাঠিয়াল’ থেকে শুরু করে ‘সুজনসখী’। কখনো বা সারেং বউয়ে সারেং হিসেবে আবার দেখা গেছে ‘মিয়াভাই’ হিসেবেও। এমনকি তাকে সাহেব হিসেবে দেখেছে বাংলার সিনেমাপ্রেমীরা। এরকম নানান চরিত্রের মধ্যদিয়ে তিনি পাঁচটি দশক পার করেছেন। বর্ণাঢ্য চলচ্চিত্র জীবন তার আর তার এই বর্ণাঢ্য জীবনের কথা নিয়ে তিনি হাজির হয়েছিলেন চ্যানেল আইয়ে। শনিবার দুপুরে। কারণ এই দিনটি ছিলো তার জন্মদিন! বলছিলাম গুণী শিল্পী ও তুখোড় অভিনেতা ফারুকের কথা। এদিন নিজের সম্পর্কে বেশকিছু কথা বলেন তিনি:
জন্মদিন যেভাবে পালন করেন:
আমি জন্মদিন পালন করি না। কিন্তু তাও সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ জানাই। একসময় অনেক আনন্দ নিয়ে জন্মদিন পালন করতাম। কিন্তু ছোটবেলায় মায়ের মৃত্যুর পর জন্মদিন উদযাপন থেমে ছিল। এরপর ফিল্ম ইন্ড্রাস্ট্রিতে আসার পর জন্মদিন খুব ধুমধাম করে পালন করতো সবাই। কারণ আমাদের ফিল্ম ইন্ড্রাস্ট্রিতে এই জন্মদিন বা বিশেষ দিন গুলিকে বেশ আয়োজনের মধ্যদিয়েই পালন করার রীতি প্রচলিত ছিল। কিন্ত আমি এটা করি না। করি না কারণ এটা আমার মনের ব্যাপার। মূলত ১৯৭৫-এর পর থেকেই আমি জন্মদিন পালন করা বন্ধ করে দিয়েছি। তবে ইউনিটের সবাই জন্মদিন উদযাপন করলে সেটাতে আবার নাও করি না। কারণ আমাকে ভালবেসেই তারা এসব করে, কিন্তু আমি তো সেটা ছুড়ে ফেলে দিতে পারি না।
মানুষেরা ভালোবাসাই সত্য:
আসলে প্রেম ছাড়া প্রাণে বাঁচি না যে কথাটা আছে এটা একদম সত্য। ‘সুজনসখী’ আমার ভীষণ জনপ্রিয় একটি চলচ্চিত্র। এটি পরবর্তী সময়ে আবারো পুণঃনির্মান করা হয়েছিল কিন্তু প্রথম যে ‘সুজনসখী’ সেটার প্রেমে এখনো মানুষ পড়ে আছে। এটি কলকাতাতেও রিমেক করা হয়েছিল। তবে আতা ভাইয়ের ‘সুজনসখী’র মত পরবর্তীতে আর কোন ‘সুজনসখী’ নির্মিত হয়নি। সেটি অনেক গুলো কারণ থাকতে পারে, তবে গানের ব্যাপারটি সাংঘাতিক ভাবে কাজ করেছে এখানে। এই যে গানটি, ‘প্রেম ছাড়া প্রাণে বাঁচি না’ লাইনটি এতটাই সত্য যে সেটা মানুষকে টাচ করে। এবং আসলেই সত্য যে ‘ভালোবাসা ছাড়া পৃথিবীই নেই, ভালোবাসতেই হবে, ভালোবাসা থাকতেই হবে’।
যেভাবে ‘মিয়া ভাই’ উপাধী:
মিয়া ভাই কেন তা আসলে নিজেও বুঝি না। তবে বিষয়টা ভাল লাগে যখন কেউ ‘মিয়া ভাই’ বলে ডাকে। তবে এটা শুরু হয়েছিল মুলত ‘লাঠিয়াল’ ছবি থেকে। ‘লাঠিয়াল’ ছবিতে একটি সিক্যুয়েন্সে আমার ‘মিয়া ভাই’ ছিলো আনোয়ার হোসেন। সেখানে উনাকে লোকজন বলে তোমার ভাই তো অনেক অন্যায় করছে, জুলুম করছে মানুষের উপর। তো সেটার বিচার তোমাকে করতে হবে। তখন উনি এসে মারতে থাকে আমাকে। এক পর্যায়ে মার খেতে খেতে আমার মনে হয়েছে যে সে আমাকে এভাবে মারছে এটা তো সেও অন্যায় করছে। তখন চিৎকার দিয়ে বলে উঠি ‘মিয়া ভাই’। আর আমার সে চিৎকারে সে থমকে যায় এবং লাঠিটি ফেলে চলে যায়। এরপর থেকেই মূলত মিয়া ভাই নামটি প্রচলিত হয়ে ওঠে। সবাই মিয়া ভাই বলে ডাকতে শুরু করে। আমি তখন বুঝতাম না কেন সবাই ‘মিয়া ভাই’ বলে ডাকে। তবে এটার কারণটা হলো বিচার-আচার, কারো দুঃখ, কাউকে সাহায্য করা এগুলোর জন্যই মূলত ‘মিয়া ভাই’ বলে ডাকত। মিয়া ভাই ডাকটি বড় অন্তরের ডাক, বড় হৃদয়ের ডাক।মাঝে মাঝে একটা কথা মনে হলে খুব আনন্দ হয় এবং সেই সাথে কষ্টও পাই। সেটি হলো, যখন এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবো তখন অনেকেই বলবে মিয়া ভাই আর থাকলো না। এ বিষয়টি যেমন আনন্দ দেয় ঠিক তেমনি কষ্টও দেয়। কষ্ট দেয় কারণ সবাইকে ছেড়ে চলে যেতে হবে।
রঙিন দিনে সাদাকালো গল্প:
আমাদের সময়তো ছবিই হত সাদা কালো। কালার ফিল্ম হতো না। তখনো তৈরিই হয়নি কালার ফিল্ম। সাদা কালোতে কিছু অন্যরকম মজা আছে। আমি প্রথম জীবনে যখন আমেরিকা যাই তখন আমি দুই সুটকেস ভরে খালি ফিল্মের বই কিনে এনেছিলাম। বইগুলো আনার পর আমি শুধু ছবি গুলোকে দেখতাম। পড়তাম না। এরমধ্যে অনেককিছু পাওয়া যায়। যেমন, লাইটিং, এক্সপ্রেশন ইত্যাদি। অবাক করা বিষয় হলো এই স্টিল পিকচারের মধ্যে অনেক রকম কথা আছে। মনে হয় ছবিগুলো কথা বলছে।
জীবন্ত মনে হয় ছবিগুলোকে। এথেকেই বোঝা যায় সাদা-কালোতে যে ছবিগুলো হয়েছে এটা অন্যরকম কিছুই না। মূল বিষয়টি হল গল্প। তারপর হল স্ক্রিনপ্লে, ডায়ালগস, অভিনয়, পরিবেশ এর সবকিছুর সংমিশ্রনে ছবিটি হয়। কিন্তু আমরা বর্তমানে যে টার্মটি ব্যবহার করে থাকি আমরা বলি আরে এটা তো কালার ফিল্ম। কালার ফিল্মে আরো ডিটেল বিষয়টি ফুটে ওঠে, কিন্তু সেটা এখন হচ্ছে না। এটা যখন হবে তখন আসলে বোঝা যাবে এটি কত বড় এইটি জায়গা।
ফারুক যখন পরিচালক:
আমার খুব ইচ্ছে হয় ছবির পরিচালনায় আসতে। তবে আমি জানি না আমি সেটা করে যেতে পারব কিনা। তবে আমি একবার বলেছিলাম আমি দেশভাগ নিয়ে ছবি নির্মাণ করব, মানবিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ছবি করতে পারি, অটিস্টিকদের নিয়ে ছবি তৈরি করতে পারি, রাজনীতি নিয়েও ছবি নির্মাণ করার ইচ্ছে আছে। তবে আমি এসব করতে পারব কিনা তা জানি না। বা সময় পাব কিনা তা জানি না। তবে সময় যদি আসে ওই টু-কে রিজুলেশনের প্রজেক্টর মেশিন যতক্ষণ আসবে না, সিনেমা হল যতক্ষণ ঠিক হবে না ততক্ষণ সিনেমা বানানো আমার জন্য ঠিক হবে না।
ছবি: তানভীর আশিক







