মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিম এবং সংখ্যাগুরু বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রজন্ম ধরে চলে আসা দ্বন্দ্ব আর অবিশ্বাস এবার সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে।
বৌদ্ধ বেসামরিক জনগোষ্ঠীকে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সরকারের সশস্ত্র সহায়তা এবং সেনাবাহিনীর মাধ্যমে বারবার কঠোর অভিযান সহিংসতা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান। বর্তমানে রাখাইন সমস্যা সমাধানে গঠিত এক কমিশনের প্রধান তিনি।
অং সান সু চি’র সরকার আর এখনো নিরাপত্তাসহ প্রধান খাতগুলোতে ক্ষমতায় থাকা সেনাবাহিনীর মধ্যে দ্বন্দ্বের কারণে অবস্থা আরও খারাপ হচ্ছে বলেও জানান কফি আনানসহ আরও অনেক বিশেষজ্ঞ।

দেশটির বিক্ষুব্ধ ও সংঘাত কবলিত রাখাইন রাজ্যের রাজধানী সিতওয়ের একপ্রান্তে একটি ক্যাম্পে আটক অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন রোহিঙ্গা মুসলিম গোষ্ঠীর নেতা কিয়াও হলা অং।
ব্রিটিশ গণমাধ্যম গার্ডিয়ানকে তিনি জানান, সেখানকার অবস্থা খুবই খারাপ। ৭৭ বছর বয়সী এই প্রাক্তন আইনজীবী মিয়ানমারের সাবেক সামরিক সরকারের সময় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য বেশ কয়েকবার জেলে গেছেন। এসব ব্যাপারে দেখে তিনি অভ্যস্ত।
কিন্তু এবারের পরিস্থিতি অনেকটাই ভিন্ন বলে জানান তিনি। “সেনাবাহিনী এসে সবাইকে সতর্ক করে গেছে যেন অপরিচিত কাউকে জায়গা না দেয়া হয়,” বলেন কিয়াও।
সিতওয়ের কিছু উত্তরে রাখাইনের মংদাও শহরে সেনাসদস্য ও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে গড়ে উঠছে তীব্র দ্বন্দ্ব। সেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর একটি বিদ্রোহী দলের চালানো কয়েক দফা হামলায় পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে গেছে। হামলাগুলোতে হামলাকারী দলটিকে এলাকাবাসী সাহায্য করেছে – এ অভিযোগে ওই এলাকাসহ অন্যান্য রোহিঙ্গা আবাসস্থলেও ব্যাপক কঠোর অভিযান চালানো হচ্ছে।

গত ৯ অক্টোবর তিনটি সীমান্ত চৌকিতে ৯ পুলিশ ও ৫ সেনা সদস্য নিহত হলে একে এমনই একটি ‘আক্রমণ’ উল্লেখ করে নিজ নিজ গ্রাম রক্ষার জন্য বৌদ্ধ বেসামরিক জনগোষ্ঠীদের সশস্ত্র প্রশিক্ষণ দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী।
কঠোর দমন প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে বিভিন্ন স্থানে এখন পর্যন্ত দফায় দফায় সংঘর্ষে কমপক্ষে ৬৯ জন রোহিঙ্গা ও ১৭ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিহত হয়েছে। নিহত রোহিঙ্গারা একটি জঙ্গি দলের সদস্য বলে দাবি করেছে মিয়ানমার সরকার।
সর্বশেষ অভিযানে হেলিকপ্টার থেকে লোকজনের ভীড় লক্ষ্য করে সেনাবাহিনীর ছোঁড়া গুলিতে কমপক্ষে ৩০ জন নিহত হয়েছে। সরকারের দাবি, নিহতদের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র, ছুরি এবং বর্শা ছিল। তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, নিহতদের বেশিরভাগই বেসামরিক নিরস্ত্র রোহিঙ্গা।
হেলিকপ্টার থেকে গুলিবর্ষণের ঘটনার পর থেকে ২০১২ সালে জাতিগত দাঙ্গার পর থেকে বিভিন্ন ক্যাম্পে আটকে থাকা রোহিঙ্গারা কয়েকজন একসঙ্গে জড়ো হতেও ভয় পাচ্ছে, যেন সেনাবাহিনী কোনো কিছু সন্দেহ করে না বসে। কমপক্ষে একটি গ্রামে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে অধিবাসীদের সবার ঘরের বেড়া ভেঙ্গে ফেলার নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছে গার্ডিয়ান।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিওতে সাধারণ রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ, এমনকি শিশুদের গায়ে গুলির ক্ষতচিহ্ন দেখা গেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’র ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ২০১৪ ও ২০১৫ সালের স্যাটেলাইট ইমেজে দেখা গেছে, গ্রামের পর গ্রাম মাটিতে মিশে গেছে। বেশ কিছু এলাকায় সেনা সদস্যদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ করেছেন রোহিঙ্গা নারীরা।
তবে এই অভিযোগের সবগুলোই অস্বীকার করেছে সেনাবাহিনী। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বলছে, সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়েছে। রোহিঙ্গারা নিজেদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে সরকারের ওপর অভিযোগ আনছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

সরকারের দাবি, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অবৈধ অভিবাসী। যদিও সেখানকার বেশিরভাগই বহু প্রজন্ম ধরে মিয়ানমারে বসবাস করে আসছে।







