মিয়ানমারে নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রতিনিয়ত নতুন করে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ঢল থামাতে এবং নিজ দেশেই একটু নিরাপদ ঠাঁইয়ের ব্যবস্থা করে দেয়ার জন্য রেডক্রসের আন্তর্জাতিক কমিটির মাধ্যমে মিয়ানমার সরকারের কাছে রাখাইন রাজ্যে একটি সেফ জোন বা নিরাপদ অঞ্চল করার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে যখন রোহিঙ্গা নিধনের অভিযোগ তখন সেখানে কীভাবে প্রস্তাবিত নিরাপদ অঞ্চল বাস্তবায়ন করা হতে পারে?
এমন প্রশ্নের জবাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক আমেনা মহসিন চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, এই অঞ্চল গড়তে হলে অনেকগুলো ঝামেলা আছে। প্রথমত মিয়ানমারকে এই বিষয়ে একমত হতে হবে। কেননা তারা সেই অঞ্চলটা করতে চায় কি না সেটাও বড় ফ্যাক্টর। এছাড়া নিরাপদ অঞ্চল হলে সেটা নিয়েও অনেক কথাবার্তা রয়েছে। পাশাপাশি এই ‘সেফ জোন’ কতটা সেফ সেটাও ভাবনার বিষয়।
তবে মিয়ানমার না চাইলেও সেখানে নিরাপদ অঞ্চল করা সম্ভব বলে মনে করেন আমেনা মহসিন। তিনি বলেন, যদি তারা একমত পোষণ নাও করে তাহলে জাতিসংঘের মাধ্যমে এই অঞ্চল করা যেতে পারে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ চাইলে এটা করতে পারে। কিন্তু সেখানে তেমন কোন উদ্যোগ দেখছি না। ফলে সেটা খুব একটা কার্যকর হবে বলে মনে হচ্ছে না।
একই বিষয়ে চ্যানেল আই অনলাইনের সঙ্গে কথা বলেছেন সাবেক সেনাপ্রধান অবসরপ্রাপ্ত লে. জেনারেল হারুন-অর-রশীদ। তিনি বলেন, বিশ্বের অনেক জায়গায় সেফ জোন রয়েছে। তাই মিয়ানমারের রাখাইনেও সেফ জোন হতে পারে। নিরাপদ অঞ্চলে জাতিসংঘের কোনো পর্যবেক্ষক বা গ্রুপ থাকে যারা সেফ জোন মনিটর করে। রোহিঙ্গারা কোনো সশস্ত্র হামলা চালালে সেটাও তারা অবজার্ভ করবে, আবার রোহিঙ্গাদের উপর আর্মি কোন নির্যাতন চালালে সেটাও পর্যবেক্ষণ করবে। সেখানে কোন সশস্ত্র আচরণ হবে না। সাধারণ নাগরিক জীবন থাকবে।
নিরাপদ অঞ্চলকে এর থেকেও উন্নত করতে হলে ‘ইউএন ডিপ্লয়মেন্ট’ লাগবে বলে মনে করেন এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক। তিনি বলেন, এমন অনেক জায়গায় আমরা কাজ করেছি, সেটাকে বলে অবজারভার মিশন।
তবে শুধু সেফ জোন ঘোষণা করলে হবে না। সেখানে বরং এর কার্যকারিতা থাকতে হবে। তাহলেই সেটা বাস্তবায়ন সম্ভব বলে মনে করেন সাবেক এই সেনা প্রধান।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সেনাবাহিনীর বহুদিন ধরে চলমান সংঘর্ষ-সহিংসতা সঙ্কট সমাধানে ২০১৬ সালের আগস্টে গঠিত হয় অ্যাডভাইজরি কমিশন অন রাখাইন স্টেট। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে ওই কমিশন এক বছরের তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন দলের প্রধান অং সান সু চির কাছে জমা দেয় চলতি বছরের ২৪ আগস্ট।
৬৩ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদন জমা দেয়ার কয়েক ঘণ্টা পরই ২৪ আগস্ট দিবাগত রাতে ত্রিশটি পুলিশ ও সেনাচৌকিতে রহস্যজনক হামলার ঘটনা ঘটে। হামলায় নিহত হয় নিরাপত্তা বাহিনীর ১২ সদস্য। তারপরই হামলার জন্য রোহিঙ্গা ‘জঙ্গি’দের দায়ী করে জবাব হিসেবে সেনাবাহিনী পুরো অঞ্চলে হত্যাযজ্ঞ শুরু করে।
সেনাবাহিনীর ওই হামলায় এখনও পর্যন্ত ৪শ’র বেশি মানুষ মারা গেছে, আর প্রাণভয়ে লাখ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে পাড়ি জমাচ্ছে বাংলাদেশে। নৌপথে পালিয়ে আসার পথে নৌকাডুবিতেও বাড়ছে মৃতের সংখ্যা।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, আনান কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়ন না করার উদ্দেশ্যেই মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এই হত্যাকাণ্ড শুরু করে।







