মতামত

মিশন সেভ বাংলাদেশ: কর্পোরেট ও সামাজিক বন্ধনে এগিয়ে চলার গল্প

শাকিব আল হাসান ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের জন্য মিশনে এগিয়ে যাচ্ছে. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ

শাকিব আল হাসান ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের জন্য একটি মিশনে অংশগ্রহণ করছে, যা দেশের উন্নয়নে কাজ করে।. Channel i News – চ্যানেল আই নিউজ

কাছের মানুষেরা ভালো থাকুক, এটা সবাই চায়। কিন্তু তার পাশাপাশি ছিয়াশি হাজার গ্রাম, চৌষট্টি জেলা, আর গোটা দেশের সতেরো কোটি মানুষের ভালোও তো চাইতে হবে। কারণ প্রত্যেকেই আমরা প্রত্যেকের উপর কোন না কোনভাবে নির্ভরশীল। এই শহর ভালো না থাকলে, দেশটা ভালো না থাকলে আমরা নিরাপদে থাকি কি করে? এই পারস্পরিক নির্ভরশীলতার প্রতি বিশ্বাস থেকেই মিশন সেভ বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়েছিল ৮০ দিন আগে।

মার্চের শেষ প্রান্তে করোনা ভাইরাসের আচমকা আক্রমণে অবরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশ। নিম্নবিত্ত মানুষেরা পড়ে গিয়েছিলেন ভীষণ বিপদে। এই দুর্দিনে কীভাবে তাদের সহযোদ্ধা হওয়া যায়- এ নিয়ে আদনান ভাই, তাজদিন ভাই ও আমি আলাপ করতে থাকি। সেযাত্রায় আমাদের সহযোগী হয় দেশের দুই শীর্ষ গণমাধ্যম সমকাল, ডেইলি স্টার এবং সেবা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম সেবা এক্সওয়াইজেড।

এই লকডাউন শুরু হতেই দেশের অসংখ্য দৈনিক আয়ের শ্রমজীবী মানুষের জীবন জীবিকা একপ্রকার বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। হকার, চালক, মিস্ত্রি, শ্রমিকসহ নানা পেশার মানুষ পড়েছেন চরম অনিশ্চয়তার মুখে। এদের পাশে দাঁড়াতে ‘মিশন সেভ বাংলাদেশ’ তিনটি লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু করেছিল: অভাবী মানুষদের খাদ্য সহায়তা প্রদান করা; নিম্ন আয়ের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া এবং করোনা প্রতিরোধী সামাজিক কাজ যেমন- জনবহুল স্থান বা এলাকা জীবাণুমুক্ত করা, করোনা মোকাবেলায় মাস্ক, জীবাণুনাশক সামগ্রী দেওয়া এবং মেডিকেল সাপোর্ট স্টাফদের নানাবিধ সুরক্ষা সামগ্রী বিতরণ ইত্যাদি।

করোনায় দুর্গতদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের উদ্যোগে যাত্রা শুরু করেছিল ‘সাকিব আল হাসান ফাউন্ডেশন’। বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার তার হাতে গড়া প্রতিষ্ঠানটিকে সম্পৃক্ত করেছেন মিশন সেভ বাংলাদেশের সঙ্গে। করোনার এই দুঃসময়ে ভীষণ প্রশংসিত বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনও দেশের এই সংকটে আমাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে নানা উদ্যোগে। একদম শুরু থেকেই আমরা সব অংশীদারদের নিয়ে একটা নির্দিষ্ট ছকে কাজ করেছি। কিছু প্রতিষ্ঠান অনুদান দিয়েছে, কেউবা নিজস্ব পণ্য সরবরাহ করেছে, কেউ আবার স্বেচ্ছাসেবক ও পরামর্শ দিয়ে সাধ্যমত পাশে দাঁড়িয়েছে, একসাথে যুক্ত হয়েছে ১২০ টি প্রতিষ্ঠান।।

দুর্গত মানুষদেরকে সাহায্য দেওয়ার কাজটা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। যেসব স্বেচ্ছাসেবকরা রাস্তায় নেমে, মানুষের কাছে গিয়ে এই কাজ করছেন, প্রাণঘাতী ভাইরাসে তাদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। তাই ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে, সর্বোচ্চ সাবধানতা অবলম্বন করেই আমরা কাজ করার চেষ্টা করেছি, একদম শুরুর দিন থেকেই। মানুষের কাছে ত্রাণ পৌঁছানোর পরিবহন খরচ কমানোর জন্য চারটি পণ্য সরবরাহ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমরা সমন্বয় করেছি, যাতে তাদের লজিস্টিক ও পরিবহন সুবিধা আমরা ব্যবহার করতে পারি, আমাদের পরিবহন খরচটা নুন্যতম হয়। তাদের ওই সহায়তায় আমরা পরিবহন ও সেবা পৌছে দেওয়ার কাজটা একদম সামান্য খরচেই করতে পেরেছি।

স্বচ্ছতার জায়গায় আমরা নিজেদের কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলাম। সেকারণে আমরা ‘আরনেস্ট এন্ড ইয়ং’কে আয়-ব্যয় নিরীক্ষার কাজে যুক্ত করেছি। প্রত্যেকদিন কত টাকার অনুদান এসেছে, কী কী কাজ হয়েছে তার বিবরণ আপডেট করা হয়েছে। আমরা চাইনি, মানুষের জন্য কাজ করতে গিয়ে কোন বিতর্ক বা প্রশ্নের জন্ম দিতে। আমাদের এই মানবিক প্রয়াসের গল্পগুলো অনেকেই ভালোবেসে বিভিন্ন মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। সেকারণে আমরা নানা জায়গা থেকে আর্থিক অনুদান পেয়েছি।

মিশন সেভ বাংলাদেশ বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও এনজিও থেকে ১৩ জুন পর্যন্ত ১ কোটি ৭৮ লাখ ৫২ হাজার ১২২ টাকা অনুদান হিসেবে পেয়েছে। যা দিয়ে আমরা দেশের ১৬ টি জেলার ১১৫১৯ টি পরিবারের ৫১ হাজার ৮৩৬ জনকে দুই সপ্তাহের খাদ্য সহায়তা দিতে পেরেছি। ৪০৪টি পরিবারের ১৮১৯ জন মানুষ পুরো রোজার মাসজুড়ে সেহরি-ইফতারের যোগান পেয়েছেন। করোনার কারণে অসুবিধায় পড়া এক হাজার মধ্যবিত্ত পরিবারকে আমরা ‘ঈদ শুভেচ্ছা’ খাবার পাঠিয়েছি।

এছাড়া ঢাকা শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে ১৬টি হাত ধোয়ার বেসিন বসানো, ২০০৯৫ মাস্ক বিতরণ, ৪৮১টি স্থান জীবাণুমুক্তকরণ, ১৭০টি নিত্য পণ্যের দোকান ও ফার্মেসির সামনে নিরাপদ দূরত্ব চিহ্ন দেওয়া, ৩৭০ জন চিকিৎসককে পিপিই প্রদান ও একটি ভেন্টিলেটর উদ্ভাবনী প্রকল্পের জন্য অর্থায়ন করা হয়েছে মিশন সেভ বাংলাদেশের উদ্যোগে। করোনা সংকট কাটিয়ে উঠতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা এবং ব্যবসায়ীরা যাতে অনুদান ও ঋণ সহায়তা পান সেই লক্ষ্যে দেশের শীর্ষস্থানীয় টেলিকম অপারেটর রবি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইপিডিসিকে সাথে নিয়ে ৪০ কোটি টাকার মুলধন সহায়তা তহবিল গঠন করা হয়েছে। ট্রাই ফাউন্ডেশনকে সাথে নিয়ে ৪০০জন ফুল ব্যাবসায়ী ও ২০ টি টেইলর প্রতিষ্ঠান কে ব্যাবসায়িক রি-স্ট্রাকচার ফান্ডিং করা হচ্ছে।

যাত্রার পর থেকে আজ পর্যন্ত হিসেব করলে, ২ মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। অনেক প্রতিষ্ঠানের নানাবিধ সমর্থন পেয়েছি আমরা এই সময়ে, এখনও পাচ্ছি। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি- এই পৃথিবী, এই দেশ, এই শহর বসবাসের জন্য উপযোগী করা পেছনে যে দায়িত্বগুলো আছে, আমরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সেই দায়িত্ব কোনভাবেই এড়িয়ে যেতে পারি না। মিশন সেভ বাংলাদেশ সেই দায়িত্ববোধ ও যৌথ উদ্যোগের সফলতার অনন্য এক দৃষ্টান্ত বহন করছে। আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধটা আমাদের সবার, এই দেশটাও আমাদের সবার। একা বেঁচে থাকাটাকে বাঁচা বলে না। কৃতজ্ঞতা সবার জন্য। দেশের জন্য এই লড়াইয়ে যারা পাশে দাড়িয়েছেন, দাড়াচ্ছেন।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…