মানুষ নানা কারণে কাঁদে। আনন্দ-বেদনা-দুঃখ যন্ত্রণায় বেশি কাঁদে। হতাশা ব্যর্থতা, বঞ্চনা, অসহায়ত্বও মানুষকে কাঁদায়। অনেকে আবার অন্যের দুঃখ-কষ্ট-বেদনা দেখে কাঁদে। আবার কেউ কেউ কান্না দেখেও কাঁদে।
মানুষের জীবনে কান্না এক অনিবার্য অনুষঙ্গ। এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না যে কাঁদে না। কেউ হয়তো একটু বেশি কাঁদে, কেউ কম। কান্না হচ্ছে আবেগের বহিঃপ্রকাশ। অনেকে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। অনেকে পারেন না।
অভিনয় শিল্পীরা অভিনয়ের স্বার্থে কাঁদেন। অর্থাৎ কান্নার অভিনয় করেন। আবার ভারতের রাজস্থানে ‘রুদালি’ নামে একটা সম্প্রদায়ের কথা শোনা যায় যারা নাকি ‘ভাড়ায়’ কান্না করেন! কারও মৃত্যুর পর মাতম করার জন্য, কাঁদার জন্য এই ‘রুদালি’ নারীদের ভাড়া পাওয়া যায়।
কান্না নিয়ে এত কথা বলার কারণ বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি মঞ্চে বক্তৃতা করার সময় দলের নেতা-কর্মীদের ওপর পুলিশি নির্যাতনের কথা বর্ণনা করতে গিয়ে কেঁদে ফেলেছেন। গত শনিবার দুপুরে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নে বিএনপি আয়োজিত সদস্য সংগ্রহ অভিযানের আলোচনা সভায় বক্তব্য দেওয়ার একপর্যায়ে কেঁদে ফেলেন মির্জা ফখরুল।
এর আগে গত বছরের ২৩ আগস্ট ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে ‘৩০টি অনলাইন নিউজ পোর্টাল’ বন্ধের প্রতিবাদ জানাতে অ্যাসোসিয়েশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের (অ্যাব) আলোচনা সভায় দলের নেতা-কর্মীদের দুর্দশা বর্ণনা করার সময়ও কেঁদেছিলেন তিনি।
বিএনপির মতো একটি বড় দলের একজন বড় নেতা প্রকাশ্যে কেঁদেছেন। সঙ্গত কারণেই এই কান্না সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হয়েছে। আমাদের দেশে নেতানেত্রীরা রাজনৈতিক কারণে বড় বেশি কান্নাকাটি করেন না। কিন্তু মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কেঁদেছেন। তার এই কান্না দেখে অনেকেই অনেক কথা বলছেন। তবে তার এই কান্না খুবই ‘স্বাস্থ্যসম্মত!’
কান্নাবিশারদদের মতে, সব মানুষই যদি নিয়ম করে কাঁদতে পারত, তাহলে দেশে হার্ট-অ্যাটাকের ঘটনা অনেক কমে যেতো। মানুষ অনেক ক্ষেত্রে ‘বুকের জ্বালা বুকেই গোপন’ করে বলে আত্মা কষ্ট পায়। হৃদযন্ত্রের উপর অনেক বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়। সেই বিবেচনায় মাঝে মাঝে কান্না করে মির্জা ফখরুল খুবই কাজের কাজ করেছেন। শরীর ও মনকে চাপমুক্ত করেছেন! এটা অন্যদের জন্য অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে।
আমাদের দেশে কান্না বা চোখের জল নিয়ে লেখক-গায়ক-কবিরা অনেক কথা বলেছেন। শরৎচন্দ্র ‘চৈত্রের খড় রৌদ্র’কে ‘গ্রীষ্মের অশ্রুশূন্য রোদন’ বলে বর্ণনা করেছেন। এক কবি বলেছেন, ‘দেখেছি দিঘীনালার জল/স্বচ্ছ জলাশয়ের জল।/বৃষ্টির জল, অথৈ সাগরের জল।/পাহাড়ি ঝর্ণার জল, নদীর জল।/কিন্তু স্মৃতিতে উজ্জ্বল, তোমার চোখের জল!’
কিশোর কুমার এক বিখ্যাত গানে বলেছেন, ‘চোখের জলের হয়না কোন রঙ/তবু কত রঙের ছবি আছে আঁকা/দেখতে গিয়ে হারিয়ে গেলাম গহীন আঁধার পথে/আঁকা বাঁকা।’
প্রেম-বিরহ-ভালোবাসাবাসির সঙ্গে চোখের জল বেশ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে। আমাদের বিরহ এবং প্রেমের গান ও কবিতাগুলো যেন সব কান্না-অশ্রু ও চোখের জলের ঘনঘটা। মান্না দে যেমন গেয়েছেন, ‘ক’ফোটা চোখের জল ফেলেছো যে তুমি ভালোবাসবে/পথের কাঁটায় পায়ে রক্ত না ঝরালে কি করে এখানে তুমি আসবে. ..।’
তবে কান্না নিয়ে ভাবনার কিছু নেই। কান্নাবিশারদরা বলছেন, কিছুতেই চোখের জল আটকে রাখা যাচ্ছে না? কান্নার ঢেউ আজ কিছুতেই বাঁধ মানছে না? বুকের ভেতর জমাট বরফ আজ দুচোখ গলে বেরিয়ে আসছে? চিন্তার কিছু নেই। মাঝে মধ্যে এমন কান্নায় চোখ ভাসতেই পারে। কেননা কান্না মন ও শরীর দুইয়ের জন্যই ভালো। কান্নায় লজ্জার কিছু নেই, কান্না এলে কাঁদতে হবে। শরীর ও মনের জন্য কান্না খুবই উপকারী।
কান্নায় সবচেয়ে বেশি উপকার হয় চোখের। কান্না বা চোখের জল অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়া ও অ্যান্টি-ভাইরাস হিসেবে কাজ করে থাকে। রাস্তা-ঘাটে, বাসে-ট্রামের ধুলো-বালি থেকে সারা দিনে চোখের ভেতর কত ময়লাই না জমা হয়। এগুলো থেকে নানা জীবাণু আমাদের চোখের বাসা বাঁধতে পারে। কিন্তু চোখের পানি এসব ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসের জীবাণু ধ্বংসে খুবই কার্যকর। চোখের পানিতে আইসোজাইম বলে একটা উপাদান থাকে, যা মাত্র ৫-১০ মিনিটেই চোখের প্রায় ৯০-৯৫ ভাগ ব্যাকটেরিয়া মেরে ফেলতে পারে।
কান্না মনও ভালো করে। মন খুলে কাঁদতে পারলে যে মন হালকা হয় সে অভিজ্ঞতা মনে হয় আমাদের সবারই আছে। কিন্তু কান্নায় মন ভালো হওয়ার জৈবিক কারণও আছে। বলা হয়ে থাকে কান্নায় শরীরে ম্যাঙ্গানিজের মাত্রা কমে। এই ম্যাঙ্গানিজ বেশি মাত্রায় জমতে থাকলে উদ্বেগ, অস্বস্তি, রাগ-ক্ষোভ বেড়ে যাওয়াসহ নানা আবেগি ঝামেলা তৈরি করতে থাকে। কিন্তু কেঁদে ফেলতে পারলে এর মাত্রা কমে গিয়ে শরীর ও মন হালকা হয়।
কান্নায় মানসিক চাপও কমে। ব্যায়াম বা শরীর চর্চায় যেমন শরীর জড়তামুক্ত হয়, মন ফুরফুরে হয় ঠিক তেমনি কান্নাতেও আমাদের মনের চাপ কমে। অতিরিক্ত মানসিক চাপ থেকে আমাদের শরীরে ‘লিওসিন এনকেফেলিন ও প্রোলাকটিন’ এর মতো কিছু রাসায়নিক জমা হয়। কাঁদতে পারলে এই সব অতিরিক্ত চাপ কমে যায়। নইলে অতিরিক্ত চাপ থেকে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগের সমস্যা এবং পেপটিক আলসারের মতো রোগ হতে পারে।
কান্না আসলে একটা থেরাপির মতো। এটা উদ্বেগ কাটায়, বিষণ্নতা দূর করে। আর চরম আবেগে কেঁদে ফেলতে পারাটা বহু কারণেই মন ও দেহের জন্য উপকারী। চোখের পানিতে চোখ পরিষ্কারের মতো কান্নার আবেগে আমাদের মনও পরিষ্কার হয়।
আমাদের জীবনটা আসলে কান্নাঘেরা। আমাদের জীবন শুরু হয় কান্না দিয়ে। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জীবনের নানা পর্বে নানা কারণে কান্না আসে। কখনো আমরা কাঁদি বিষাদে, কখনো বা তা আনন্দ অশ্রু হয়ে ঝরে। মানুষ নানা বয়সে কাঁদে। নতুন জন্মানো শিশুর কান্নার সময় চোখ দিয়ে পানি পড়ে না। পানি পড়ে আরেকটু বড় হলে। কান্না আসলে শিশুদের যোগাযোগের মাধ্যম । ক্ষুধা লাগলে, ঘুম পেলে বা ব্যথা পেলে তারা কাঁদে। শিশু আরেকটু বড় হলে কাঁদে মনোযোগ আকর্ষণের জন্য। দক্ষ অভিনেতার মতো এ কান্নাকে বলে মায়াকান্না বা কুম্ভীরাশ্রু (crocodile tears)।
মেয়েদের বেশি কাঁদার আরেকটা কারণ তাদের অশ্রুনালী নাকি ছেলেদের তুলনায় কম দীর্ঘ। এজন্য দ্রুত চোখে পানি আসে। প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কান্নার ধরন বদলাতে থাকে। কারণ টেস্টোস্টেরণ এবং প্রোজেস্টেরণের মাত্রায় পরিবর্তন আসে।
বিভিন্ন সংস্কৃতিতে কান্না বিভিন্ন হয়। যেমন পশ্চিমা সমাজে কান্নাকে ইতিবাচকভাবে নেওয়া হলেও এশিয়ান সমাজে কান্নাকে, বিশেষ করে ছেলেদের ক্ষেত্রে দুর্বলতা ধরা হয়। পার্থক্য আছে শেষকৃত্যে কান্নার ধরনেও। যেমন ফিজিতে আপনি মরদেহ দাফন করার আগে পর্যন্ত কাঁদতে পারবেন না। ইরানে আবার জোরে জোরে কাঁদলে সমস্যা নাই। ধর্মভেদেও কান্না আলাদা হয়। যেমন ইসলামে কান্নাকে গুরুত্ব দেয়া হয়। আবার বুদ্ধধর্মে কান্না অনুমোদিত নয়।
মানুষ একমাত্র প্রাণী যে আবেগে কাঁদতে পারে। কান্না শুধু মানুষের অনন্য বৈশিষ্ট্যেই নয়, এর আছে মানসিকভাবে মানুষকে সুস্থ রাখার বিশাল শক্তি। মন খুলে কাঁদা আমাদের সুস্থ এবং চাপমুক্ত থাকতে সাহায্য করে। কান্না কোনো দুর্বলতা নয়, এটা একটা শক্তি।
তাই, কান্না পেলে মন খুলে কাঁদুন। সুস্থ থাকুন। এই বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বায়োকেমিস্ট ডা. উইলিয়াম ফ্রাইয়ের কথা স্মরণ করা যেতে পারে। তিনি বলেছেন, ‘দুঃখ, বেদনা, মানসিক আঘাত দেহে টক্সিন বা বিষাক্ত অণু সৃষ্টি করে আর কান্না এই বিষাক্ত অণুগুলোকে শরীর থেকে বের করে দেয়। এ কারণেই দুঃখ ভারাক্রান্ত ব্যক্তি ভালভাবে কাঁদতে পারলে নিজেকে অনেক হালকা মনে করে। তাই কাঁদার সময়ও মন খুলে কাঁদুন। দরকার হলে হাউমাউ করে বা ফুঁপিয়ে কাঁদুন। অন্যের সামনে কাঁদতে অস্বস্তি হলে বাথরুমে গিয়ে পানির কলটি ছেড়ে দিয়ে বা মিউজিক ছেড়ে দিয়ে কাঁদুন, কিন্তু কাঁদুন। মনের কষ্ট কখনো মনে পুষে রাখবেন না। কান্নার মাধ্যমে আপনি আপনার মনের যতো জমানো কষ্ট, ক্ষোভ, রাগ, হতাশা, ব্যাথা-বেদনা আছে তা বের করে দিন।’
আসুন, আমরা বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে একাত্ম হয়ে কাঁদি। বেশি বেশি কাঁদি। এই দুঃখ-দুর্দশাঘেরা পৃথিবীতে নিয়মিত কান্না করে ভালো থাকি, সুস্থ থাকি!
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)







