অপরাধ নয়, অার্থিক বা রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাবান অপরাধীর প্রতিপত্তির প্রতিই যেন অামাদের সকল ক্ষোভ। এর নেপথ্যে শুধু অপরাধ অার অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবি হলে, বড় খুশি হতাম। অপরাধীর বিচারের দাবি হলে কয়েকদিন অাগে গাজীপুরের শ্রীপুরে ধর্ষিতা কন্যাকে নিয়ে হতদরিদ্র হজরত অালী সরকারকে বিচারহীনতায় অাত্মহনন করতে হত না।
গুলশানের ধর্ষকদের প্রতিপত্তি অার বিত্তের প্রতি অামাদের চিরায়ত শ্রেণী বিদ্বেষের দ্বন্দ্ব, হিংসা, ক্ষোভ থেকেই ঘটনায় জড়িতদের বিচারের দাবিতে অামরা ফেসবুক কিংবা গণমাধ্যমে সোচ্চার।
অবশ্য দিনশেষে অামরা ‘ওই যায় ধর্ষিতা বা ধর্ষকের বোন’ বলে মজা নিতেই বেশি ভালোবাসি। ধর্ষকের পারিবারিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বয়কটের জিগিরের মধ্য দিয়ে নির্যাতিতা ধর্ষিতা বোনটি কী ন্যায়বিচার পাবে? পরোক্ষভাবে স্বর্ণ বা টাকার দামে ধর্ষর্ণের অর্থমূল্য নির্ধারণের মনস্তাত্বিক খেলায় নিপীড়িতাদের ফের নির্যাতন চালাই অামরা।
অার দরিদ্র হজরত অালীর মেয়ে যে অামাদের অালোচনায়ও অাসতে পারেনি, এর অারেক কারণ সম্ভবত হতভাগ্য কন্যাটি তো অার ভার্সিটি অবধি পৌঁছাতে পারতো না। মেয়েটি অামাদের তথাগত সভ্য, স্মার্ট নাগরিক সমাজের অংশ নয়, বোধকরি এটাও তার অপরাধ! একজন বাবাকে কোন পরিস্থিতিতে শিশুকন্যাকে নিয়ে অাত্মহননের পথ বেছে নিতে হয়?
ওরা অামাদের মত কেতাদুরস্ত ভদ্রলোক নয় বলেই তাদের নিয়ে লেখা, ফেসবুক বা টকশোতে সুশীলদের ঝড় ওঠে না। মূলকথা, দিনমজুর বাবা বা তার দশ বছরের পালিত শিশুকন্যা অায়েশা অাক্তার অামাদের শ্রেণীতত্ত্ব সর্বস্ব ঘুমঘোরেও সচেতন সমাজের অংশ নয়।
সঙ্গত কারনেই শ্রীপুরের অায়েশাকে ধর্ষণচেষ্টা অার বাবা মেয়ের অাত্মহত্যার প্রত্যক্ষ প্ররোচনা দাতাদের মাত্র একজন অাটক হয়েছিল। অনেকে বলবেন ঘটনাটি অনেক ইস্যুর ভিড় চাপা পড়ে গেছে। কিন্তু এমন হৃদয় বিদারক ঘটনা কিভাবে চাপা দেই অামরা? এরচেয়ে ভয়াবহ কোন ঘটনা কি গত কিছুদিনে ঘটেছে বাংলাদেশে ?
অামাদের বাস্তবতায় সব ধর্ষণ, হত্যা বা অপরাধ সমভাবে গণমাধ্যম বা সামাজিক মাধ্যমে উঠে অাসে না। এর কারণও অামাদের মনোজাগতিক, সামাজিক বা অবস্থানগত শ্রেণী বিদ্বেষ। কারণ একজন শহুরে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্রীর খবর অামাদের পাঠকরা যতটা জানতে অাগ্রহী, দিনমজুর কন্যার ক্ষেত্রে অামাদের তথাকথিত সচেতন পাঠকেরা ততটাই অনাগ্রহী।
এ কারণে তাদের খবর ভেতরের পাতায় এক কলামেই চিরায়তভাবেই যেন নির্ধারিত। গুলশান-বনানীর মতো অভিজাত এলাকার ধনীর বখাটে সন্তানদের কুকীর্তিময় খবরের নিউজভ্যালু অনেক। এই নিউজ অার ভিউজ ভ্যালুই ঘৃণ্য পশুদের তারকা বানায়। দরিদ্র, বস্তিবাসী ধর্ষিতার খবর তো প্রায় সময়ই পৌঁছাতে পারে না সংবাদমাধ্যম বা ফেসবুক সেলিব্রেটি অবধি।
অামি বলছি না সবাইকে সব ইস্যুতে সমানভাবে সোচ্চার হতে হবে। বলছি না ঘরে কিশোরী গৃহকর্মীটিকে নির্যাতন করে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে কোন মুখে কথা বলেন। সে বৈপরীত্য সুবিধাবাদের। কিন্তু একটি ধর্ষণের ঘটনায় সারা বাংলাদেশ এমনকি অনাবাসী বাংলাদেশীরাও সোচ্চার।
ফেসবুকে অনেকে তো রীতিমত ধর্ষণের গল্পও লিখছেন। অাবার প্রায় একই সময়ে ঘটা হজরত অালী সরকারের কন্যাসহ অাত্মহত্যার ঘটনায় অামরা ঠিক সবাই ততটাই নীরব কেন ?
কিছু প্রচারমাধ্যম রেইনট্রি হোটেলের ধর্ষণ এমনকি ধর্ষিতাদের সাক্ষাতকারকেও পণ্য বানিয়ে বাণিজ্য করছে। গণমাধ্যম শব্দটি এখানে সচেতনভাবে এড়িয়ে যাওয়াই সমীচিন। ধর্ষিতাকে লাইক শেয়ারের পণ্য বানিয়ে প্রচারের মাধ্যমে অামাদের সংবাদমাধ্যমের কদর্য রূপটি এখানে অারো উলঙ্গভাবে উন্মোচিত হয়েছে।
লেখাটি শুরু করেছিলাম দৃশ্যত ক্ষমতাবান অপরাধী, ধর্ষকদের নিয়ে। খুচরো ভিলেনদের অগোচরে নায়ক অামরাই তো বানাই, বানায় সামাজিক মাধ্যম কিংবা প্রচারমাধ্যম। অার কন্যার সম্ভ্রম না বাঁচাতে পেরে প্রাণ বিসর্জন দেয়া মানুষগুলো রয়ে যায় অগোচরে।
অাবার এটাও সত্য, রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্ষমতাবানরা যেখানে সন্দেহভাজন বা অভিযুক্ত, সেখানে নিজেদের নিরাপত্তার ভাবনা ভেবেই অামরা চুপচাপ থাকি। কুমিল্লায় তনু হত্যার ক্ষেত্রেও অামরা তাই ঘটতে দেখেছি।
দুই
এবার বলি বাস্তবতার কানাগলির উল্টোদিকের চালচিত্র। বিলবোর্ড, বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন সবখানে অামরা নারীদেহের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অপ্রাসঙ্গিক, অশৈল্পিক এবং অপ্রয়োজনীয় প্রদর্শনীতে ব্যস্ত। নারী পুরুষের সম্পর্ককে মোরালিটি থেকে ইরেলেভেন্ট করার খেলা সর্বত্র। প্রায় সব সংবাদমাধ্যমের বিশেষত অনলাইনগুলো যৌনতা সর্বস্ব কনটেন্ট দিয়ে লাইক, শেয়ার আর র্যাঙ্কিং বাড়াতে মরিয়া। বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় এমনটাই কী কাম্য ছিল?
আমাদের সামাজিক সম্পর্কের বুনন অার বেড়ে চলার অনুধাবনের বড় জায়গা এখন অামাদের সামাজিক মিডিয়াগুলো। ইনবক্স, স্কিনশটে একাকার প্রতারণার জাল, চরিত্র হনন। প্রশ্নপত্র থেকে ধর্ষণ, শারীরিক সম্পর্কের ভিডিও সবই ফাসঁ হয় এখানে। রেইনট্রি হোটেলের ধর্ষক নরপশুরা সামাজিক মিডিয়াতেই সেসব ছড়িয়ে দেবার হুমকি দিচ্ছিল। অামাদের অনেক ফেসবুক অার ইউটিউব তারকাদের অাবেগ-বিবেক খেলার মাঠও এখানেই। অবশ্য বিশ্বে বহু মাত্রায় চলছে সামাজিক মাধ্যমের অপব্যবহার। অামরাও তার বাইরে নেই।
তিন
বাস্তবতাকে স্বীকার করেই বলি, বাংলাদেশের অামরা যারা এখনকার প্রজন্ম তারা অাসলে সেভাবে কোন জনসম্পৃক্ত গণ-অান্দোলন দেখিনি। বাংলাদেশ বহুকাল দেখেনি দলবাজির বাইরের জনতার স্বতস্ফূর্ত সংগ্রাম। অামাদের পরবর্তী স্মার্ট, অাত্মকেন্দ্রীক ভীতু অার রাতারাতি সেলিব্রেটি হতে চাওয়া প্রজন্মকে ফেসবুক, রাজপথ অধিকারের দাবির সংগ্রাম থেকে ঘরের বেডরুমে নিয়ে গেছে।
এখনকার বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সরকারি নির্দেশনা মানা অান্দোলন ফটোসেশন, নিউজভ্যালুসহ সুবিধার অনেক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট হিসেব জড়িত। পুলিশ বেষ্টনীর ভিতরেই অাবদ্ধ প্রজন্মের অনেকের বিপ্লবের সীমানা। তাই হজরত অালীর বিধবা স্ত্রী সন্তানের খোজঁ, হত্যার প্ররোচণা অার ধর্ষণ চেষ্টার অাসামিদের বিচারের জন্য পদক্ষেপ না নিয়ে ফেসবুক নয়তো অনলাইনে দু’লাইন লিখেই দায়িত্ব শেষ করি অামরা।
তারপরও ফেসবুকে কোন ইস্যুতে ঝড় উঠলে অামাদের নির্বাচিত সরকারেরও একটুখানি টনক নড়ে। প্রশাসন কিছুটা সক্রিয় হয়। ৯০ পরবর্তী সময়ে অাস্তে অাস্তে বিস্মৃতপ্রায় হয়ে যাওয়া জনতার বিক্ষোভের ভয় যে সরকারগুলো পায় না, সেটিও নয় কিন্তু। এ কারণে অামরা গ্রেফতার দেখি, রিমান্ড দেখি, নিম্ন অাদালতের যুগান্তকারী রায়ও দেখি। শুধু শেষে বিচারহীনতার পদক্ষেপগুলো সমান মনোযোগে বা অাবেগে দেখবার ফুসরৎ অামরা পাই না।
বিশ্বায়নের বাস্তবতায় সংবাদ যেখানে পণ্য, মিডিয়া সেখানে দেশে দেশে সংবাদ বা পণ্যটির অর্থমূল্য খোঁজে। বিলেতেও বহু সংবাদমাধ্যম প্রায় ঘোষণা দিয়ে নির্বাচনের অাগে পছন্দের দলের পক্ষ নেয়। মিডিয়া যখন ভুল করে, ফেসবুকের মতো সামাজিক মাধ্যমগুলোয় জনগণ সে ভুল ধরিয়ে দেন। সামাজিক মিডিয়ায় জনগণের চাপের মুখে তখন মূলধারার মিডিয়া নিজেদের ভুল স্বীকার করে, সংশোধনও করে। বিশ্বজুড়েই এমন লাখো নজির।
কিন্তু অামাদের কিছুসংখ্যক মিডিয়াকর্মীরা ক্যামেরা সমেত ধর্ষিতার বাড়ির দরোজায় অবস্থান নেন। তখন বিকল্প মিডিয়া ফেসবুকেও অামরা ধর্ষিতার ধারাবিবরনীর গল্প ছড়াই। টাইমলাইনে ছড়াই ধর্ষিতার সবিস্তারে অাদায়কৃত ভিডিও। অথচ আমরা একবারও ভাবি না এর ফলে কোথায় যাবে মেয়েটি? সে তো অামারই বোন, অামারই সন্তান। অামার পুত্রটি যেন ধর্ষক না হয়, সেই সূচনার মানবিক পাঠের জায়গাটিতেও অামরা নিরব।
এমন বাস্তবতাতেও অামরা বিনিয়োগ করি মেকি সামাজিকতায়, সন্তানে নয়। যে সমাজে ধর্ষিতার ধারাবর্ণনা ফেসবুকে ছড়িয়ে অামাদের ঘুমন্ত বিবেককে জাগাবার চেষ্টার পথ বেয়েও লাইক অার শেয়ার বাড়াতে হয়।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)








