আমার কাছে মানসিক চিকিৎসা নিতে আসে অধিকাংশ নারী ও শিশু। এদের মধ্যে বেশীর ভাগই যৌন হয়রানীর শিকার। যাদের বয়স ৮ থেকে ৫০’র মধ্যে। কথা বলছিলাম, মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ জি এম এস দারের সাথে, তিনি কলকাতা জেএনএম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কর্মরত আছে। সাংবাদিক বন্ধু অমিতাভ মুখ্যোপ্যাধায়ের মেসো (খালু), কয়েক বছর আগে কলকাতায় পরিচয়।
এদেশে চিকিৎসার কাজে প্রায় আসেন তিনি। সুযোগে #মি টু আন্দোলন ও মানসিক রোগ নিয়ে উনার সাথে হয় অনেক কথা।
‘বাজারভিত্তিক প্রতিযোগীতার টানাপোড়নে জীবনের মান কমে যাওয়া, মানসিক রোগের অন্যতম কারণ বলে তিনি মনে করছেন, নারীপুরুষ উভয়ে মানসিক রোগ এই প্রতিযোগিতামূলক জীবনের ফল।
এছাড়াও তিনি জানান, বয়স ভেদে বিভিন্ন পর্যায়ে এ রোগের ধরণ বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। ছোটদের মধ্যে যেমন খেলনা না পাওয়া বা ওর আছে আমার নেই কেন। ওর বাবা-মা এমন আমার বাবা-অমন কেন? স্মার্ট গেজেট পাচ্ছে না কেন? হাত খরচের টাকা পাচ্ছে না চাহিদা মত, আবার কারো বাবা-মা সময় দিচ্ছে না, টাকার পেছনে ছুটছে, কেউ বাবা-মায়ের কাছে আশানুরূপ মূল্যায়িত হচ্ছে না, লেখাপড়ার প্রবল চাপ।
আবার দেখা যায়, মনের মত স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে না পারা, চাকরি না পাওয়া, মনের মত চাকরি না পাওয়া, আশানুরূপ বেতন-ভাতা না পাওয়া, ভ্রান্ত বিশ্বাস, কারো কাছে আশানুরূপ ব্যবহার না পাওয়া, অবজ্ঞা, কৃতঘ্নতা, প্রতিহিংসার শিকার হওয়া, ন্যায় বিচার না পাওয়া, বঞ্চিত হওয়া, একাকীত্ব, স্বজনপ্রীতি, অবহেলা ইত্যাদি কারণে মানসিক রোগ হতে পারে।
তবে নারীরা যৌন হয়রানির কারণে অধিকাংশ মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে, অবসাদগ্রস্থ হয়ে পরেন, শেয়ার করতে না পারাও হয়ে ওঠে মানসিক রোগের কারণ।
তিনি জানান, বাংলাদেশ থেকেও উনার কাছে বছরে গড়ে ১৫ জন রোগী আসে। বয়স ৮ থেকে ৫০’র মধ্যে। নারীর সংখ্যা বেশি। এদের অধিকাংশই যৌন হয়রানির শিকার। কিন্তু ভাবনার ব্যাপার হল দেশি ডাক্তারের কাছে যায় না, জানাজানির ভয়ে, সামাজিকভাবে হেয় বা অসম্মানের ভয়ে। আবার কেউ কেউ বলেন, ডাক্তার এমন করে কথা বলেন মনে হয়, যেন দোষ আমাদেরই। শ্লীলতাহানি আমাদের কারনেই হচ্ছে।
‘নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা (ভিএডব্লিউ)’ শীর্ষক এক জরিপে বলা হয়েছে, ২২ শতাংশ নারী বলেছেন, তাঁরা কর্মক্ষেত্রে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১১ শতাংশ, গাড়ি, সড়ক ও রাস্তায় ১০ শতাংশ নারীকে শারীরিক নির্যাতনের মুখে পড়তে হয়েছে।
জানা যায়, নির্যাতনের তথ্য-উপাত্তের বাইরে আরও বহুগুণ নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। কিন্তু দেশে সামাজিক প্রেক্ষাপট, আইনের দীর্ঘসূত্রিতা ও আইনের ফাঁকফোকরের কারণে নারীর প্রতি যৌন হয়রানির ন্যায় বিচার সফল হওয়া দুরূহ।
ধর্ষণের মত অপরাধে যেখানে বিচার পাওয়া যায়না যেখানে দুস্কর, সেখানে যৌন হয়রানির বিচার কি হবে তা সহজেই অনুমেয়। তাছাড়া এদেশে নিপীড়নের শিকারের চেয়ে নিপীড়কের প্রতি জনসমর্থন বেশি থাকে। ঘরে, বাইরে সর্বত্র মনে করা হয়, মেয়েদের সাথে এমন হওয়াই স্বাভাবিক, নারীকে যৌন হয়রানি যেন পুরুষের জন্মগত অধিকার!
#মি টু নিয়ে আলোচনাকালে ডাঃ জি এমএস দার বলেন, ‘সামাজিকভাবে হেনস্তাই যৌন হয়রানির কথা চেপে যাওয়া মূল কারণ। ছোট থেকেই পরিবার ও আশেপাশে দেখে চেপে যেত, যৌন হয়রানির কথা বলা লজ্জার, এতে ভিক্টিমকে লোকে খারাপ বলবে, রটনা হলে বিয়ে হতে সমস্যা হবে। অধিকাংশ আপনজনরা ভিক্টিমকেই দোষী মনে করে, কেন গেলি বলে মারটা পরে ভিক্টিমের পিঠে। আর কাউকে তো ধরল না তোকে কেন ধরল? তুই ভাল না বলেই তোকে ছুঁয়েছে, বলার লোকের সংখ্যা অনেক। এ ধরনের পীড়াদায়ক প্রশ্নের সম্মুখীন হবার ভয়ে মুখ খোলে না।
সমাজে পরিচিতমুখ, ক্ষমতাধরের দ্বারা হয়রানি হলে তো কথাই নেই, মুখ খুললেই পদে পদে অসম্মানিত হবার ভয়, নিরন্তর লাঞ্ছিত হবার ভয়। নানা দোষে নিপীড়িতকে দায়ী করে নিপীড়কের পক্ষে জনমত গঠনের ঘটনা তো আছে। আর উপহাসের পাত্র হবার ভয়ের কথা তো না বললেই না।
সারা পৃথিবী জুড়ে এ আন্দোলন ঝড় তুললেও আমাদের বাংলাদেশের মেয়েরা পিছিয়ে আছে। যেখানে গবেষণালব্ধ তথ্য-উপাত্ত যা বলছে, তার বিপরীত ঘটনা ঘটছে। দেশের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের চাইল্ড অ্যাডোলেসেন্ট অ্যান্ড ফ্যামিলি সাইকিয়াট্রি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আহমেদ দীর্ঘদিন ধরে যৌন হয়রানির শিকার শিশুদের নিয়ে কাজ করছেন।
তাঁর গবেষণায় উঠে এসেছে, ৭৫ শতাংশ যৌন হয়রানির ঘটনাই ঘটে পরিবারের ঘনিষ্ঠজন, বন্ধু বা আত্মীয়দের মাধ্যমে। আর ছেলেশিশুরাও যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে। প্রতি ছয়জন ছেলেশিশুর মধ্যে একজন যৌন হয়রানির শিকার। মেয়েশিশুদের মধ্যে তা প্রতি চারজনে একজন। আর এই যৌন হয়রানির করছে প্রধানত পুরুষরা।
ডাঃ দার বলেন, দেখুন আমাদের দেশে আর বাংলাদেশের নির্যাতনের প্রেক্ষাপট প্রায় একই। কলকাতার পার্কস্ট্রীটের ধর্ষণের ঘটনার কথা মনে আছে নিশ্চয়? সুজেট জর্ডনের ধর্ষণকে ‘সাজানো ঘটনা’ বলে অভিহিত করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী।পুলিশ মামলা নিতে চাইনি, কিন্তু গণমাধ্যমে ও সামাজিক মাধ্যমে সংবাদটি চাউর হয়ে গেলে মামলা নিতে বাধ্য হয় পুলিশ।
আগেই বলেছি, যৌন হয়রানি, ধর্ষণ, শ্লীলতাহানি কেউ সহজে স্বীকার করে না। অপরাধী কবে নিজের দোষ চট করে মেনে নিয়েছে! প্রমাণ থাকলেও তারা স্বীকার করতে চায় না।
উল্টা ভিক্টিমকে দায়ী করে বলা হয় সাজানো, মতলব আছে, প্রতিহিংসা কারণে, সুবিধা না পাবার কারণে মিথ্যা রটনা রটাচ্ছে।
আমাদের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একজন নারীর জন্য নিজের সাথে ঘটা যৌন হয়রানির কথা সামনে আনতে বুকের শুধু জোর না অনেক প্রতিকূলতাকে পায়ে দলে, অনেক হয়রানি মাথা পেতে নিয়ে নতুন করে আবার নিগৃহীত হবার মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে তবেই মুখ খুলতে হয়। ফলে কারো যৌন হয়রানি কথা শুনেই ফুঁৎকরে উড়িয়ে দেয়াটা বা নিপীড়কের পক্ষে সাফাই গাওয়াটা, অনেকটা জেগেজেগে ঘুমানোর মত।
বুঝেও না বোঝার ভান পক্ষান্তরে আপনার মনের অন্ধকার দিকটা প্রকাশ করে, আপনার নিপীড়ক চেহারাই প্রকাশ পায় কিংবা নিপীড়কের দ্বারা সুবিধাপ্রাপ্ত সহজেই অনুমেয়।
ডাঃ জিএমএস দার জানান, ৮ বছরের একটি বাচ্চা মেয়ে গত ২ বছর ধরে রাতে ঘুমাতে পারে না। ঘুমালেই দুঃস্বপ্ন দেখে। কেউ ওর মুখ চেপে ধরে রেখেছে, চিৎকার বা ছাড়ানোর চেষ্টা করলেই গলা টিপে ধরে, মেয়েটি দম বন্ধ হয়ে আসে, তখন খিঁচুনি ওঠে, ফলে বাকি রাত আর ঘুমাতে পারে না। ঠিক করে খায় না, স্কুলে যায় না, খেলে না। সবার মাঝে থাকতে চায়, দিনের বেলাতেও একা হতে ভয় পায়।
মেয়েটির বাবা-মা অনেক ডাক্তার, কবিরাজ, তাবিজ করেছে কিন্তু কিছু হয়নি। স্কুলের এক শিক্ষকের পরামর্শে তারা বাচ্চাটিকে আমার কাছে আনে। মেয়েটির সঠিক সমস্যা ধরতে দিন দুয়েক লেগেছিল।
মেয়েটির কাকা বেড়াতে এসেছিল, রাতে বাচ্চাটির প্যান্টের মধ্যে একহাত ঢুকিয়ে হারসলি যৌনাঙ্গে স্পর্শ করছিল, অপর হাত দিয়ে বাচ্চাটির মুখ চেপে ধরে রেখেছিল। বাচ্চাটি ছাড়ানোর চেষ্টা করলে ও চিৎকার দিতে গেলে কাকু তার গলা টিপে ধরে ভয় দেখিয়েছিল, চিৎকার দিলে বা কাউকে বললে মেরে দিয়ে যাবে।
যাকে বলবে তাকেও মেরে দেবে। ছয় বছরের একটা বাচ্চা মেয়ে কাউকে বলতে পারছে না কারণ ভয়, কাকু তাকে মেরে ফেলবে, বাবা-মাকে বললে তাদেরও মেরে ফেলবে। দিনে দিনে ওর আতঙ্কে বাড়ে বই কমে না।
মানসিক কাউন্সিলিং-এ বাচ্চাটার প্রাথমিক ভয় কেটে গেছে। কিন্তু ভয়ের যে স্থায়ী ছাপ মনে পরেছে, তা কোনদিন যাবে কিনা সন্দেহ। চাচা, মামা, দাদু, পিসা, মেসো, ভাইয়ের বন্ধু, আপন ও আত্মীয় দুলাভাই, শিক্ষক, অফিসের বস, কলিগ, কাছের দূরের আত্মীয়, পাড়ার কাকা,মামা, খালু, ফুপা, ভাই, দাদু, নানা, দুলাভাই, বিখ্যাত ব্যক্তি, এমনকি বাবাও সন্তানকে অশ্লীলভাবে স্পর্শ করে। শুধু স্পর্শ দিয়ে নয়, মৌখিকভাবেও মেয়েদেরকে যৌন হেনস্তা করা হয়ে থাকে। পুরুষরাও যৌন হয়রানির শিকার হয়, অপর পুরুষ দ্বারা।
আশার কথা মানুষের মনের আড় ভাঙ্গতে শুরু করেছে। টিপটিপ বৃষ্টির মত ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরতে শুরু করেছে। ধীরে হলেও এক এক করে বাংলাদেশের নারীরা বলতে শুরু করেছে নিজেদের নিগৃহীত হবার কথা।
এই কথাগুলি বলার মানে অন্য কাউকে অপদস্থ করা নয়, এই বলার মানে নিজের কষ্টের কথা শেয়ার করা, দীর্ঘদিনের জমা ক্ষতে মলম লাগানো। বুকে চেপে থাকা পাহাড়সম কষ্টের পাথরটা ঠেলে ফেলে দিয়ে বুক ভরে নিঃশ্বাস নেয়া। মি টু নারীর ডিপ্রেশন কমাতে সাহায্য করছে।
এতে দায়ী ব্যক্তি যদি সমাজে সুপরিচিত, ক্ষমতাবান ও দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হন, তিনি অবশ্যই বিব্রত হবেন, কারণ তিনি তো স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি যে এই কথা নিপীড়িত মেয়েটি একযুগ পরে হলেও মুখ খুলবে, কারণ তার বদ্ধমূল ধারণা এ বিষয়ে কেউ কখনো মুখ খোলে না। এতে ভিক্টিম আরো নিগৃহের শিকার হবে।
মজার ব্যপার হল, নিপীড়ক যৌন হয়রানির কালে নিজের সম্মান, পরিবার, পজিশন, পরিচিতি মাথায় রাখেনা, জানাজানি হলে গেল গেল রব তুলছে। যৌন নিপীড়ন মানুষদের মাথায় রাখা উচিত চোরের দশদিন সাধুর একদিন। একজন মেয়ের নিজের সাথে ঘটা যৌন হয়রানির কথা বলতে মনের ভয়াবহ জোড় লাগে।
আর #মি টু ((#Mee Too) নারীকে সেই জায়গাটা দিয়েছে, যে নিজের সাথে ঘটে যাওয়া যৌন হয়রানির মত কদর্য ক্ষতটাকে সরিয়ে তুলতে পারবে। সমাজে প্রতিনিয়ত নিরবে বা সরবে ঘটে চলা এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ‘মিটু’, অন্ধ সেজে প্রলয়কে অস্বীকার করার প্রতি প্রতিবাদ।সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার দাবিতে প্রতিবাদ।
#মি টু কে না বোঝা, ভুল মনে করা বা অবজ্ঞা করার কোন অবকাশ নেই, নিপীড়ক ও তার সমর্থকরা মিটুকে ভুল ব্যাখ্যা করছে, এটা খায় না মাথায় দেয় তা নিয়ে গবেষণা করছে, নিপীড়কদের কাছে সুবিধা গ্রহণকারী নারীরাও মিটুর বিরুদ্ধে কথা বলছে, বলবেও, নিপীড়িত নারীকে হেয় প্রতিপন্ন করতে আদা জল খেয়ে লাগছে। উটপাখির মত বালিতে মুখ গুঁজে রাখলে আর যাই হোক সত্যিটা মিথ্যে হয়ে যাবে না।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সাথে কথা চলাকালে ফোন আসে ছোটবেলার এক বন্ধুর, যে নিজের আপন মামার দ্বারা যৌন হেনস্তার শিকার হয়েছিল।
১২ বছর আগের, বন্ধু মানিমা (ছদ্মনাম), যে সব কিছু আমাকে শেয়ার করত। এক ভোরে আমাকে ফোন দিয়ে জানালো খুব দরকারে আসছে সে। জরুরি অ্যাসাইনমেন্টে না যেয়ে বাসায় থাকলাম, কারণ বন্ধুও অফিস বাদ দিয়ে আসছে। মানিমা আসার পর কি হয়েছে বলতেই, আমার ঘরের দরজা বন্ধ করে খুব কান্না করল, কিছু পরে শান্ত হয়ে বলল, জানিস মামা কালরাতে আমার সাথে সেক্স করতে চেয়েছে। বান্ধবীর একবছর আগে ডিভোর্স হয়েছে।
মামা, মানিমাকে বলেছে, ওকে দেখলে তাঁর কামনা জাগে। তাই আজ রাতে উনি সেক্স করবে বলে তাঁর শহর থেকে ঢাকা এসেছেন, উল্লেখ্য যে বয়স্ক মামাটি বিবাহিত, স্ত্রী জীবিত, দুই সন্তানের জনক, বড় সন্তানের বিয়েও দিয়েছেন এবং উনি বংশের মান্যগণ্য ব্যক্তি। যাকে গুষ্টিতে পীরের মত ভক্তি করে। ভাগ্নির আপন মামার সাথে প্রথমবার সেক্সে যাতে অস্বস্তি না লাগে, তাই হুইস্কি এনেছিলেন। যা খেলে ভাগ্নির সব অস্বস্তি চলে যাবে।
আমি বন্ধুকে বললাম, তোর মাকে ডেকে জানালি না কেন? বন্ধু বলল, তোর মাথা খারাপ, তাঁর ফেরেস্তার মত ভাইকে নিয়ে কিছু বললে মা হয়ত উল্টো আমাকে খারাপ ভাববে। তাহলে জুতালি না কেন? বন্ধু সেদিন জুতা না মারলেও, মাথা ঠাণ্ডা করে মামাকে বলেছিল, তিনি ওর বাবাসম, তাই ও চেঁচামেচি করার আগেই যেন তিনি বাড়ি ছেড়ে চলে যান না হলে মাকে ডাক দিয়ে জানাবে। মামাও ভয়ে বাসা ছেড়ে চলে যান, অনেক বছর আসেননি। এখন আসা যাওয়া হলেও খুব কম। পারতপক্ষে মানিমা ওর মামার সামনে যায় না।
ডাঃ দার বলেন, আমাদের সমাজ মনে করে সোনার আংটি বেঁকাও ভাল। পুরুষ কর্মে সফল হলে তার কদর্য মনোভাব, বিশেষ করে কাম, লালসা যৌন হয়রানি জায়েজ হয়ে যায়। সমাজ হাজার বছর ধরে নারীকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক করে রেখেছে, নারীকে শুধু মাত্র সন্তান উৎপাদন ও সংসার কর্মে নিয়োজিত রাখার পাশাপাশি ভোগের বস্তু হিসেবে দেখাই সমাজে নারীরকে যৌন হয়রানির অপরাধমূলক কাজের বৈধতা দেয়।
পুরুষ ঘরে বাইরে সবখানে নারীর প্রতি হাত বাড়ায়, কারণ মনে করে নারী শুধু ভোগের বস্তু। অধিকাংশ গৃহকর্ত্রীর অনেক সময় ব্যয় হয়, শুধু মাত্র স্বামীকে গৃহের সহকারী মেয়েটির কাছে ভিড়তে না দিতে, অনেক নারী আসে স্বামীর গৃহের সাহায্যকারী মেয়েটির প্রতি আসক্তির কারণে ডিপ্রেশনে পরে। নারীর বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না, যার ফলাফল ডিপ্রেশন।
ডাঃ জিএম এসদার বলেন, #মি টু বলতে গিয়েও ভয় পাচ্ছে আমার এক রোগী। তার ভাষ্য হল, ‘এতোদিন যারা কাছে আছে, বন্ধু, কলিগ ওরা দূরে সরে যাবে, আত্মীয়রা কথা শোনাবে। চাকরি চলে যেতে পারে, এতোদিন একসাথে চলা, বলা, খাওয়া, আড্ডা দেয়া বন্ধুর মধ্যে পক্ষাবলম্বন নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হবে। কেউ আমাকে দায়ী করবে, কেউ হয় তো বন্ধু থেকে শত্রু হয়ে যাবে, আমি কি সেই পীড়া নিতে পারবো, একবার মনে হচ্ছে লিখি আবার মনে হচ্ছে থাক আমার বেদনা ও কষ্ট আমার ভেতরেই থাক’।
দোটানায় সে আরো অস্থির হয়ে যাচ্ছে। তাকে কাউন্সেলিং করছি। তবে আশার কথা, মেয়েরা মনের আগল খুলে নিজের সাথে ঘটে যাওয়া বিভীষিকাময় ঘটনা যত বলবে তত তাদের মন হালকা হবে আর মন চাপমুক্ত তো ডিপ্রেশন হাওয়া।
ব্রেকিং দ্যা সাইলেন্স নিয়ে কাজ করা বন্ধু ফারজানা আহমেদ মি টু নিয়ে বলেন, যারা মিটু নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছে, যারা ভিক্টিমকে হেয় করছে, সেই সব নারী পুরুষদের ঘরের গৃহকাজের সহায়তাকারী মেয়েটি যদি মিটুতে মুখ খোলে তাহলে ঘরে ঘরে যে ঝড় শুরু হবে, তার কাছে কি লাগে- টাইফুন বা সাইক্লোন।
সেই ঝড় কি মি টু বিরোধী বিবিসাহেবরা সামাল দিতে পারবে। শিক্ষিত মেয়েদের মধ্যে গোটা দশেক মেয়ের মিটুতে সবাই কম্পমান, বাকিরা মুখ খুললে তো সুনামি হয়ে যাবে।
ফারজানা জানান, ‘দেশের ২০০৩ সালের আইনে অসত্ উদ্দেশ্যে নারীর যে- কোনো অঙ্গ স্পর্শ করাই যৌন নিপীড়ন৷ এমনকি নারীর পোশাক ধরে টান দেয়া, ধাক্কা দেয়া এগুলোও যৌন নিপীড়ন৷
দেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ অফিস, শিল্প কারখানা এমনকি পথেঘাটে, মার্কেটে যৌন নিপীড়নের ঘটনা হরহামেশাই ঘটছে৷ কিন্তু আইন না জানায় আমরা অনেকই তাকে যৌন নিপীড়ন বলছিনা।
বাংলাদেশে ২০১০ সালে উচ্চ আদালত যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধে একটি নির্দেশনা দেয়৷ আর তাতে বলা হয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ যেসব প্রতিষ্ঠানে নারী রয়েছেন সেসব প্রতিষ্ঠানে একজন নারীর নেতৃত্বে যৌন নিপীড়ন বিরোধী কমিটি থাকতে হবে৷ আর কমিটির মোট সদস্যদের মধ্যে নারীদের প্রাধান্য থাকতে হবে৷
একটা বাক্সে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ রাখার ব্যবস্থা করতে হবে৷ প্রতি তিনমাস পর ওই বাক্স খুলে যদি কোনো অভিযোগ পান তাহলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবে কমিটি৷ আর তদন্তে গোপনীয়তা রাখতে হবে৷ কেউ চাইলে সরাসরিও কমিটির কাছে অভিযোগ করতে পারবেন।
নারী নির্যাতন সম্পর্কে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নতুন রিপোর্ট বলছে, বিশ্বের প্রায় এক তৃতীয়াংশ নারী যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন অহরহ৷ তার ওপর পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধের যেসব পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে, সেটাও যথার্থ নয়।
এছাড়া বিশ্বের মোট নারীর ৭ শতাংশ নাকি জীবনের যে কোনো সময় ধর্ষণের শিকার হয়েছেন৷ যৌন নিপীড়ন বন্ধে সবার আগে পরিবারকে এগিয়ে আসতে হবে। ছোট থেকে শিক্ষা দিতে হবে নারীকে সম্মান ও মর্যাদার। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অফিস আদালতে এই চর্চা থাকতে হবে। পারিবারিক শিক্ষা ও মূল্যবোধ শিশু ও নারীর প্রতি যৌন নিপীড়ন কমাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
শিশুদের, ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে ভাল স্পর্শ ও খারাপ স্পর্শের শিক্ষা দিতে হবে। শেখাতে হবে কেউ খারাপ স্পর্শ করলে কি করতে হবে। আমাদের দেশেও যৌন হয়রানি নিয়ে আইন আছে, সচেতন হোন, আইনের দ্বারস্থ হোন।
মার্কিন নারীবাদী কবি মিউরিয়েল রুকেসারের একটি উদ্ধৃতি ‘যদি একজন নারী তার জীবনের সত্য প্রকাশ করে, তাহলে কী ঘটবে? দুনিয়া দুই ভাগ হয়ে যাবে।’
দুনিয়া দুই ভাগ এখনও না হলেও ভাগ হয়ে যাচ্ছে সম্পর্ক, বিশ্বাস, আস্থা, বন্ধুত্বের, তারপরও চাই মিটু চলুক, মানুষ সচেতন হোক, মুখ খুলুক, নিপীড়নের ক্ষত শুকিয়ে যাক ডিপ্রেশন থেকে বের হয়ে আসুক নারীরা।
আর নিপীড়ক মনস্ক ব্যক্তিরা নিজেদের সামলে নিক, কদর্য অপরাধ, অন্যায় থেকে নিজেকে বিরত রাখুন, নারীকে ভোগ্যবস্তু না ভেবে মানুষ ভাবুন। আসুন মিলে মিশে পথ চলি।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







