হিজরি নবম মাস রমজান। রহমত, বরকত ও মাগফিরাতের উপঢৌকন নিয়ে এ মাসের আগমন। এটা সহযোগিতা, সহমর্মিতা, ধৈর্য ও কল্যাণের মাস। পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহতে এ মাসের আলাদা গুরুত্ব ও ফজিলতের কথা বিবৃত হয়েছে। আল্লাহ এ মাসের সম্মানের ব্যাপারে ইরশাদ করেছেন, ‘রমজান মাস, যাতে কোরআন নাজিল করা হয়েছে, যা মানুষের জন্য হেদায়াত এবং সুপথ প্রাপ্তির সুস্পষ্ট পথনির্দেশ আর হক-বাতিলের মধ্যে পার্থক্যকারী।’ (সূরা বাকারা: ১৮৫)
বিভিন্ন তফসিরে রয়েছে, ইবরাহীম আ.–এর সহীফা রমজানের প্রথম রাতে, মূসা (আ.)–এর তাওরাত এ মাসের ষষ্ঠ রাতে, ঈসা (আ.)–এর ইনজিল এ মাসের ত্রয়োদশ রাতে এবং যাবুর এর অষ্টাদশ রাতে নাজিল হয়েছি। (কুরতুবী: ২/২৯৮)
অর্থাৎ সমস্ত আসমানি কিতাব নাজিল হওয়ার জন্য বিখ্যাত মাস রমজান। তাছাড়াও অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, নিশ্চয়ই আমি একে (কোরআনকে) লাইলাতুল কদরে (যা রমজানে) নাজিল করেছি। (সূরা কদর: ১)
মুসলমানদের জন্য সর্বোত্তম মাস হলো রমজান। হাদিস শরীফে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, মুসলমানদের জন্যে রমজানের চেয়ে উত্তম কোনো মাস আসেনি আর মুনাফিকদের জন্য রমজানের চেয়ে অধিক ক্ষতিকর মাসও আসেনি। কারণ মুমিনগণ রমজানে গোটা বছরের ইবাদতের শক্তি ও পাথেয় সংগ্রহ করে। আর মুনাফিকরা তাতে মানুষের অলসতা ও দোষ অন্বেষণ করে। এ মাস মুমিনদের জন্য গনীমত। (ইবনে খুযাইমা: ১৮৮৪) এ কারণে মুসলমানরা এ মাসের আগমনে অত্যধিক খুশি হন, আনন্দে উদ্বেলিত হন। ১১টি মাস এ মাসের আগমনের প্রত্যাশায় থাকেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা রমজানের খাতিরে শাবানের চাঁদের হিসেব রেখো।’ (তিরমিজী: ৬৮৭)
রমজান মাসের বরকতে আল্লাহ জান্নাতকে সুসজ্জিত করতে থাকেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই জান্নাতকে রমজানের জন্য সাজানো হতে থাকে।’ (মিশকাত: ১৯৬৭) রাসূল (সা.) আরও বলেছেন, অবশ্যই আল্লাহ রমজানের প্রতি ইফতারের সময় অসংখ্য বান্দাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন। আর প্রতি রাতেই তা হয়ে থাকে। (ইবনে মাজা: ১৬৪৩) রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যখম রমজান মাস আগমন করে, তখন জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়।’ (বুখারী: ১৮৯৮) অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, যখন রমজানের প্রথম রাতের আগমন ঘটে, তখন বদ জীন ও শয়তানদের শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়, তার একটি দরজাও খোলা হয়না এবং জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, তার একটি দরজাও বন্ধ করা হয় না। আর একজন ঘোষক ঘোষণা দিতে থাকে, হে কল্যাণের পথযাত্রী! অগ্রসর হও। হে অকল্যাণের পথিক! ক্ষান্ত হও। আল্লাহ এ মাসের প্রতি রাতে অসংখ্য জাহান্নামীকে মুক্তি দেন। (আহমদ: ১৯৭৯৪)
যে এই মহান মাস পেয়েও গুনাহমুক্ত হতে পারল না, হাদিস শরীফে সে ব্যক্তিকে হতভাগা বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সাহাবী হযরত কাব বিন উজরা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘একবার রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদেরকে বললেন, তোমরা মিম্বারের কাছে হাজির হও। আমরা সকলে সেখানে উপস্থিত হলাম। যখন তিনি মিম্বারের প্রথম সিঁড়িতে পা রাখলেন, বললেন আমীন। যখন দ্বিতীয় সিঁড়িতে পা রাখলেন, বললেন আমীন। আবার যখন তৃতীয় সিঁড়িতে পা রাখলেন, বললেন আমীন। সাহাবী বলেন, যখন রাসূল (সা.) মিম্বার থেকে নামলেন, আমরা জিজ্ঞেস করলাম, হে রাসূল (সা.)আমরা আজ এমন কিছু শুনলাম, যা আগে কখনো শুনিনি। উত্তরে তিনি বললেন, জিবরাইল (আ.) আমার কাছে আগমন করেছিলেন। যখন আমি প্রথম সিঁড়িতে পা রাখলাম, তখন তিনি বললেন, ধ্বংস হোউক ওই ব্যক্তির যে রমজান মাস পেল, তবু তার গুনাহ মাফ হলো না। আমি বললাম, আমীন। যখন দ্বিতীয় সিঁড়িতে পা রাখলাম, তখন তিনি বললেন, ধ্বংস ওই ব্যক্তির জন্য যার সামনে আপনার নাম উচ্চারণ করা হলো, অথচ সে আপনার প্রতি দরূদ পাঠ করলো না। আমি বললাম, আমীন। যখন আমি তৃতীয় সিঁড়িতে পা রাখলাম, তখন তিনি বললেন, ধ্বংস ওই ব্যক্তির যে বৃদ্ধ পিতা-মাতা উভয়কে বা একজনকে পেল, অথচ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারল না। আমি বললাম, আমীন। (মুসতাদরাকে হাকেম: ৭৩৩৮)
রমজানের সব কয়টি ইবাদত গুনাহ মাফ করে জান্নাতে প্রবেশ করার জন্য। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, যে ঈমানের সাথে ও সাওয়াবের আশায় রমজানে রোজা পালন করবে, তার বিগত জীবনের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে। (বুখারী: ৩৭)
রমজান মাস হলো আমল বহু গুণে বৃদ্ধি হওয়ার মাস। এ মাসের কদরের এক রাতের ইবাদতের মুল্য হাজার মাসের ইবাদতের চেয়ে উত্তম। আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন, লাইলাতুল কদর হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। (সূরা কদর: ৩) শুধু এ রাতই নয়, বরং এ মাসের প্রতিটি ইবাদতই বহু গুণে বৃদ্ধি করে দেওয়া হয়। যেমন, নবী করিম (সা.) এ প্রসঙ্গে ঘোষণা করেছেন, হে লোক সকল! নিশ্চয়ই তোমাদের কাছে এক মহান মাস (রামাদ্বান) সমাগত। এ মাসে এমন একটি রাত রয়েছে, যা হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। আল্লাহ এ মাসের রোজাকে ফরজ করেছেন, আর কিয়ামুল লাইল তথা তারাবীহ নামাজকে করেছেন সুন্নাত। যে ব্যক্তি রামাদ্বানে একটি নফল আমল করল, সে যেন অন্য মাসের একটি ফরজ আমল করল। আর যে এ মাসে একটি ফরজ আমল করল, সে যেন অন্য মাসে ৭০টি ফরজ আমল করল। (ইবনে খুজাইমা: ১৮৮৭)
আমলের পাশাপাশি এ মাস দান-সাদকারও মাস। রাসূল (সা.) নিজেও এ মাসে অবারিত দান-সাদকাতে লিপ্ত থাকতেন। হাদীস শরীফে রয়েছে, ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ দাতা। তাঁর দানশীলতা বেড়ে যেত রমজান মাসে, যখন জিবরাইল (আ.) আগমন করতেন। আর তিনি রমজানের প্রতি রাতেই আসতেন এবং তারা পরস্পর কোরআন শুনাতেন। রমজানে রাসূল (সা.) প্রবল বেগে বয়ে চলা বাতাসের চেয়েও বেশি দানশীল ছিলেন। (বুখারী: ৬)
রমজানের প্রতিটি ক্ষণই তাই একজন মুমিন জীবনের জন্য পরম পাওয়ার, যা আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দাহকে দেওয়া উপহার। এ জন্য রাসূল (সা.) রজব মাস থেকেই দোয়া করতেন, ‘হে আল্লাহ আমাদেরকে রজব ও শাবানে বরকত দিন আর রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দিন। রমজান হউক আমাদের জন্য সৌভাগ্যের নিয়ামক, গুনাহ মাফের হাতিয়ার, জান্নাত লাভের ওসিলা, জাহান্নাম থেকে মুক্তির দিশারী।
লেখক : মাওলানা মোহাম্মদ বদরুজ্জামান রিয়াদ







