ইয়াজউদ্দিনকে দিয়ে বিএনপি জামাত নেত্রী খালেদা জিয়ার ক্ষমতা কুক্ষিগত করার হীন প্রক্রিয়া কার মাধ্যমে বানচাল হয়েছিলো? ফখরউদ্দিনের জায়গায় ইয়াজউদ্দিন গদীনসীন থাকলে দেশ কোনদিকে যেতো। দেলোয়ার হোসেন সাঈদি, কাদের মোল্লা, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী প্রভৃতি নামের রাজাকারদের কী ভূমিকা ও দাপট থাকতো ইয়াজউদ্দিন নেতৃত্বাধীন সরকারে।
আজকে যারা উচ্চস্বরে ওয়ান ইলেভেন নিয়ে নানা কথা বলছেন সে বিষয়টাও তাদের ভাবা উচিত। অসুখ-বিসুখ মানুষের শরীরের যেমন স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ঠিক তেমনই দ্বন্দ্ব, সংঘাত, বিরোধ, আলোচনা ও সমালোচনাও দেশের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। একজন স্বাভাবিক রোগী চিকিৎসকের কাছে যাবে।
রোগীর সিরিয়াল অনুযায়ী সাক্ষাতের জন্য ওয়েটিং রুমে অপেক্ষা করবে। ডাক পড়লে দেখা করবে। চিকিৎসকের সাথে কথা বলবে, প্রেসক্রিপশন নেবে, ওষুধের দোকানে গিয়ে ওষুধ কিনবে ও এরপর বাড়ি যাবে। এগুলো রোগীর স্বাভাবিক গতি প্রক্রিয়া। কিন্তু কারো যখন মাথা ফেটে যায় অথবা কেটে যায়(মানে কেউ লাঠি দিয়ে অথবা রামদা দিয়ে যদি তার মাথা ফাটিয়ে দেয় কিংবা কেটে দেয়) তখন মাথা ফাটা অথবা মাথা কাটা লোককে নিয়ে চিকিৎসকের চেম্বারে কেউ সিরিয়াল নিতে যাবে না, যাবে হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে।
দেশের রাজনীতিও মাঝেমধ্যে ইমার্জেন্সীর রোগী হয়। ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১’র স্বাধীনতা যুদ্ধ, ১৯৭৫’র ১৫ আগস্ট, ১৯৯০’র গণঅভ্যুত্থান ও ওয়ান ইলিভেন প্রভৃতি দেশ ও রাজনীতির ইমার্জেন্সি রোগী হয়ে উঠার উদাহরণ। ইমার্জেন্সি বিভাগ ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হলে ফলাফল ভয়াবহ হয়।
১৯৬৯’এ আইয়ুব শাহীর পতন হয়েছে, ৭১’এ দেশ স্বাধীন হয়েছে, ৯০’এ এরশাদের পতন হয়েছে আর ওয়ান ইলিভেন এ ইয়াজউদ্দিনের পতন হয়ে ফখরউদ্দিনের উত্থান হয়েছে। আর ১৯৭৫’এ কী হলো জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হলো।
এটা তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের ইমার্জেন্সি গত প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যর্থতা। এতবড় একটা রাজনৈতিক দল, কোথায় ছিলো তাদের নেতাকর্মী, কোথায় ছিলো রক্ষী বাহিনী ও গোয়েন্দা বিভাগ।
এর কী ব্যাখ্যা দেবেন তৎকালীন আওয়ামী লীগ দলীয় নেতারা। কী ব্যাখ্যা দেবেন বঙ্গবন্ধুর খুনীর মন্ত্রীসভায় যোগ দেয়া আওয়ামী নেতাগণ। তারা বলবেন, চাপের মুখে মোশতাক মন্ত্রীসভায় যেতে তারা বাধ্য হয়েছেন। চাপের মুখে বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীর মন্ত্রীসভায় মন্ত্রীত্বের শপথ নিয়েও যদি আওয়ামী লীগ করতে সমস্যা না হয় চাপের মুখে সংবাদপত্রে রিপোর্ট প্রকাশ করলে সাংবাদিকতা করতে কেন সমস্যা হবে।
ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের নামে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা হলে মোশতাক মন্ত্রীসভায় যোগদানকারীদের নামে কী হয়। বলা হচ্ছে ডেইলি স্টার রিপোর্ট করেছে ফালু বলেছে, আখতার সোবহানের ছেলেকে মামলা হতে বাঁচাতে খালেদা টাকা নিয়েছে। শেখ সেলিম, বলেছে শেখ হাসিনা মানুষের কাছ থেকে প্রতিদিন টাকা নিতো।
টকশোতে মাহফুজ আনামকে আক্রমণ করে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলানোই ছিলো যেন তাদের উদ্দেশ্য। গাজী নাসির উদ্দিন যেভাবে কথা বলছিলেন তার বাচনভঙ্গীতেই সেটা স্পষ্ট বুঝা গেছে।
মুন্নী সাহা তাকে মাইনাস টু ফর্মুলার সার্জেন্ট বানাতে চেষ্টা করে। কিন্তু কথা হচ্ছে ডেইলি স্টার তার রিপোর্টে যাদের রেফারেন্স দিয়েছে যেমন ফালু বলেছে, শেখ সেলিম বলেছে প্রভৃতি। ফালু ও সেলিম বলেছে কিনা সেটা পরিস্কার করতে হবে। এ ব্যাপারে ফালু ও সেলিমের বক্তব্য প্রকাশ করা দরকার। দেশবাসীর জানা দরকার ফালু ও সেলিম বলেনি ডেইলি স্টার মিথ্যা রিপোর্ট করেছে। অথবা বলেছে তবে ডিজিএফআইয়ের চাপের মুখে বলেছে।
মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে সংসদে উত্তাপ ছড়িয়ে দেশজুড়ে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা দায়েরের আগে এই বিষয়টা পরিস্কার করার দরকার ছিলো। মাহফুজ আনাম বলেছেন, ডিজিএফআইয়ের দেয়া খবরগুলো যাচাই বাছাই না করে প্রকাশ করা ছিলো তার সাংবাদিক জীবনের মারাত্মক ভুল।
এতে বুঝা যায় তিনি হয়তো চাপের মুখে এই খবরগুলো প্রকাশ করেছেন। জনাব ফালু ও সেলিম কি বলবেন চাপের মুখে পড়ে এসব কথা বলা তাদের রাজনৈতিক জীবনের মারাত্মক ভুল ঘটনা হয়েছে। সত্য উদ্ঘাটন করে তারা কি বলেন তা দেশবাসীর সামনে প্রকাশ করা হোক।
হাওয়া ভবন ও তারেক রহমানের বেপরোয়া কার্যকলাপের স্মৃতি আজও মানুষ ভুলে যায়নি। ফখরউদ্দিন, মঈনউদ্দিন তথা ওয়ান ইলিভেনই তারেক রহমানের প্রবল প্রতাপ ধুলায় মিশিয়ে দিয়ে তাকে দেশান্তরি করেছে।
এটাও সত্য যে মাইনাস টু, বিরাজ নীতি কী করন, গণতন্ত্র হরন প্রভৃতি নানা অভিযোগে অভিযুক্ত ওয়ান ইলিভেন না এলে শেখ হাসিনাকেই মাইনাস ওয়ান হয়ে যেতে হত। আইএস, জঙ্গী ও স্বাধীনতার পরাজিত শত্রুদের আস্থাভাজন তারেক রহমান প্রবল প্রতাপে আত্মপ্রকাশ করত বাংলাদেশের রাজনীতিতে।
আজ যারা মাইনাস টুর সমর্থক হিসেবে মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে উচ্চস্বরে বিষোদগার করছেন আপনাদের এরকম উচ্চস্বর থাকতনা তখন। জনাব সেলিম ও জনাব ফালু মিডিয়ার সামনে কথা বলে জনগণের সামনে একটা অস্পষ্ট বিষয় স্পষ্ট করবেন কি।
কি ভূমিকা ছিলো ডিজিএফআইয়ের, কি আচরণ করতো তারা রাজনীতিক ও সাংবাদিকদের সাথে। দেশবাসীর সামনে তা স্পষ্ট করা জরুরি। তৎকালীন সময়ের সত্যচিত্রগুলো দেশবাসীর সামনে উপস্থাপন করা হোক। মাহফুজ আনামের বিচারের ভার দিয়ে দেয়া হোক দেশবাসীর উপর।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







