মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মানবাধিকার প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করার পাশাপাশি ভিন্নমতও পোষণ করেছেন আইন ও মানবাধিকারকমীরা। সেই সাথে বিচার বর্হিভূত হত্যাকাণ্ড, গুমসহ সকল ঘটনাই সংবিধান বহির্ভূত বলে জানিয়েছেন তারা। নারীরা কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেও বলে জানিয়েছেন তারা।
আইন ও শালিস কেন্দ্র (আসক) নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, মার্কিন মানবাধিকার প্রতিবেদনে বিচার বহির্ভূত হত্যা ও গুমকে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান মানবাধিকার সমস্যা বলে উল্লেখ করেছে, এর সাথে আমি একমত। আমরা সবসময় এ বিষয়ে স্পষ্ট থাকতে চাই।
দেশে বর্তমানে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুম বেড়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা সংখ্যা নিয়ে উদ্বিগ্ন নই। দেশে অন্তত একটি এমন ঘটনা ঘটলে আমরা উদ্বিগ্ন। যতোদিন পর্যন্ত এমন হত্যা-গুম চলবে ততদিন পর্যন্ত আমরা উদ্বেগ প্রকাশ করেই যাব।
বিচার বহির্ভূত হত্যা ও গুম নিয়ে সাবেক আইন মন্ত্রী ব্যরিষ্টার শফিক আহমেদ বলেন, পুলিশের হাতে অপরাধীর মৃত্যু বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নয়। কারন পুলিশের ব্যাখ্যায় এটা আত্নরক্ষা, পুলিশ নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য গুলি চালায়, আর এতে অপরাধীর মৃত্যু হয়। এসব ক্ষেত্রে কখনো দেখা যায়না নিহতের পরিবার মামলা করেছে। কারন তারা অপরাধী তাই মামলা করছে না।
তিনি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এ প্রতিবেদনের সমালোচনা করে সাবেক ওই মন্ত্রী বলেন, তারা শুধু সংখ্যা জেনে বলছে যে এটা একটা হত্যাকাণ্ড, কিন্ত তারা যে অপরাধী এবং তাদের পরিবার কেনো মামলা করে নাই এই বিষয়টি উল্লেখ করে না। তারা তাদের পরিবারের সাথে কথা না বলেই এমন প্রতিবেদন তৈরি করে থাকে।
তবে সাবেক আইনমন্ত্রী বিষয়টি যেভাবে দেখছেন তার সাথে পরিস্কার দ্বিমত পোষণ করে সুলতানা কামাল বলেন, আমরা বিচারের আগে বলতে পারি না কে অপরাধী আর কে নির্দোষ, এটা আদালতের কাজ। সংবিধানের ৩১-৩৫ ধারা মোতাবেক, কোনো ব্যক্তি যত অপরাধই করুক না কেনো, বিচার না করে কখনোই তাকে হত্যা করা যাবেনা।
পুলিশের এনকাউন্টারে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে সুলতানা কামাল আরোও বলেন, পুলিশ কখনোও বিচার করতে পারে না, পুলিশ বিচারে সাহায্য করতে পারে।
দেশের বিচার প্রক্রিয়ার সমালোচনা করে সাবেক আইনমন্ত্রী জানান, দেশের বিচার প্রক্রিয়া অনেক দীর্ঘ হয়ে যাচ্ছে। এখানে পুলিশের দায়িত্ব সাক্ষীকে আদালতে হাজির করা, কিন্ত পুলিশ বেশিরভাগ সময় সাক্ষী হাজির করতে পারছে না। কারন ততদিনে তদন্তকারী পুলিশ বদলি হয়ে একস্থান থেকে অন্যস্থানে চলে যাচ্ছে।
তবে ছোট ছোট মামলাগুলো নিজেরাই সমাধান করলে বিচার ব্যবস্থার এ দীর্ঘসূত্রিতার অবসান হবে বলে তিনি মনে করেন।
মার্কিন প্রতিবেদনে বেসরকারি এনজিওগুলোর বিশেষ সমস্যার কথা বলা থাকলেও এ বিষয়ে একমত নন সুলতানা কামাল। তবে নারীরা যে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন এ বিষয়ে একমত হয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে নারীদের যে পরিস্থিতি আছে সে অবস্থা বদলাতে হবে। আমরা আশা করছি এ পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটবে।
বৃহস্পতিবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রকাশিত ২০১৪ সালের মানবাধিকার প্রতিবেদনে, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুম বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান মানবাধিকার সমস্যা কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়াও প্রতিবেদনটিতে সংবাদপত্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ, অনলাইনে মত প্রকাশের সীমাবদ্ধতাসহ দুর্বল শ্রম অধিকার এবং নিম্নমানের কর্ম পরিবেশকেও বাংলাদেশের মানবাধিকার সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
সেখানে বলা হয়, ২০১৪ সালে জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরে গুম হয়েছে প্রায় ৮০ জন। ২০১৩ সালে এই সংখ্যাটা ছিলো ৫৩ জন। সেই সাথে নিরাপত্তাকর্মীদের নির্যাতনসহ ক্ষমতার অন্যান্য অপব্যবহার, বিস্তৃত দুর্নীতি, দূর্বল বিচার ব্যবস্থা, দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার কথাও উঠে এসেছে তাদের প্রতিবেদনে।
সর্বশেষে বলা হয়, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা এনজিওগুলোও বাংলাদেশে কাজের ক্ষেত্রে বিশেষ সমস্যার মুখোমুখি হন। নারীরাও চরম বৈষম্যের শিকার।







