‘প্রথমত তিনি ছিলেন আমার শিক্ষক, কর্মক্ষেত্রে গুরু এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কে পিতৃতুল্য, বন্ধুও বটে। হাতে-কলমে কাজ শেখানো মানুষটি নামের মতোই মিশুক ছিলেন ব্যবহারেও’। প্রয়াত সংবাদ কর্মী ও চিত্রগ্রাহক মিশুক মুনীরের চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর স্নেহ-সাহচর্যের কথাগুলো এভাবেই বলছিলেন এটিএন নিউজের বার্তা প্রধান মুন্নী সাহা।
চ্যানেল আই অনলাইনকে গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক, স্মৃতি, শিক্ষা এবং শেষ বিদায়ের দিনটির কথা বলতে গিয়ে কাঁপছিলো এই দাপুটে মানুষটির কণ্ঠ। কৃতজ্ঞ ও শ্রদ্ধাবনত চিত্তে তিনি বললেন, ‘আজ মুন্নী সাহার সাংবাদিক হয়ে ওঠা গল্পের রূপকার মিশুক স্যার’।
স্মৃতিকথনের আড়ালে মুন্নী সাহার কণ্ঠেই অনুপ্রেরণাদাতা, সহমর্মী নেতা, জনসম্পৃক্ত সাংবাদিকতা এবং ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা হিসেবে উপস্থাপিত হলেন প্রয়াত মিশুক মুনীর।
তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীরের অটুট বন্ধনের বিষয়টি মুন্নী দেখেছিলেন তাদের ‘আদমসুরত’ প্রামাণ্যচিত্রের প্রিমিয়ার দেখার সময়েই। তখন টুকটাক লেখালেখি করা মুন্নী জানতেন না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে মাস্টার্স করতে এসে শিক্ষক হিসেবে পাবেন মিশুক ‘স্যারকে’।
‘তাকে নিয়ে অনেক “মিথ” প্রচলিত থাকলেও তিনটি কোর্সে তিনি যা পড়িয়েছিলেন তা আজও পাথেয় হয়ে আছে,’ শিক্ষক হিসেবে মিশুক ‘স্যারকে’ এভাবেই মূল্যায়ন করেন ছাত্রী মুন্নী সাহা। কর্মজীবনের শুরুতে মিশুক মুনীরই অনুপ্রেরণা দিয়েছিলেন একুশে টেলিভিশনে আবেদন করতে।
সেই থেকেই মূলত পথ চলা শুরু জানিয়ে মুন্নী বলেন,‘ডিপার্টমেন্টে স্যারের সাথে আমার মতের মিল বা টিউনিং ছিলো চমৎকার। বোঝাপড়া ভালো হওয়ায় তিনি বুঝতে পেরেছিলেন আমি টিভিতে ভালো করতে পারবো। এরপর মুন্নী সাহাকে মানুষ চিনলো।’
ইটিভি’র পর এটিএন-এ কাজ করার সময় দীর্ঘদিন মুন্নী সাহা মিশুক মুনীরের কাজ দেখেছেন অনেক কাছ থেকে। তাঁর কাছে থেকেই জন মানুষের সাথে সহজে মিশে সাংবাদিকতা শিখতে পেরেছেন বলে জানান মুন্নী সাহা। গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক এমন মাত্রা পেয়েছিলো যে মুন্নী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক মিশুক মুনীরের ক্লাসে কলম-খাতা নিয়ে ব্যস্ত না হলেও কর্মক্ষেত্রে তাঁর কথা টুকে রাখতে নোট-বুক পেন্সিল নিয়ে তৈরি থাকতেন।
মুন্নী বলেন,‘এটিএন নিউজে মিশুক স্যারের কাছে মাত্র নয় মাসে নব্বই মাসের কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পেরেছিলাম। স্যার অনেক কিছু নিজে করে শেখাতেন’।
কর্মতৎপর মানুষটিকে নিয়ে এরকম একটি স্মৃতি তুলে ধরেন মুন্নী: এটিএন নিউজে একদিন স্যার হঠাৎ উধাও। জরুরি কি এক কাজে তাকে খুঁজছি। তাঁর ডেস্কে মোবাইসহ সব আছে, অফিস থেকেও কেউ বের হতে দেখেনি। অথচ তিনি গায়েব। হন্তদন্ত হয়ে খুঁজছি সেসময় এক টেকনিশিয়ান আমাকে স্টুডিওতে প্রেজেন্টারের ডেস্ক দেখিয়ে বললো ‘আপনার স্যারকে পাওয়া গেছে’। আমি তখনো তাকে দেখতে না পেয়ে বলেছিলাম কোথায়? টেকনিশিয়ানের উত্তর ছিলো টেবিলের তলায়, লাইট ঠিক করছেন! এই ছিলেন মিশুক স্যার’।
শুধু শিক্ষাঙ্গন আর কর্মক্ষেত্রেই নন, ব্যক্তিগত সম্পর্কের বেলাতেও ‘মিশুক’ মানুষটির ব্যবহার তাঁর নামের মান রেখেছে। দেশে-বিদেশে কাজ শিখতে গিয়ে মুন্নী সাহা ‘মিশুক স্যারকে’ দেখেছেন অভিভাবকের মতো যত্নবান হতে।
তাঁর স্নেহধন্য মুন্নী বলেন, মিশরে-আলজেরিয়ায় কাজ করার সময় মরুভূমিতে তাঁর পকেটে চকোলেট বার, চিজ রাখতেন। অথচ তাঁর ডায়াবেটিস ছিলো। আসলে চকোলেট ও খাবার রাখতেন আমার জন্য। মাঝে মাঝে কাজ থামিয়ে নিজ হাতে প্যাকেট ছিড়ে খেতে দিতেন আমাকে। তাঁর ছেলে সুহৃদের পরেই হয়তো আমাকে নিজের মেয়ের মতো আগলে রেখেছেন সব সময়’।
এরকম নানা স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে প্রিয় ‘মিশুক স্যারের’ বিদায় দিন ১৩ আগস্টে এসে থমকে যান মুন্নী। চার বছর আগে যখন প্রথম শুনেছিলেন মানিকগঞ্জের সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার কথা তখন বিশ্বাসই করেননি। কারণ ‘স্যার’ তো তাকে না বলে কোথাও যেতেন না।
সেদিনের কথা বলতে গিয়ে রুদ্ধপ্রায় কণ্ঠে মুন্নী সাহা বলেন,‘ঘটনার আগের রাতেও অসুস্থ ছেলে সুহৃদকে দেখে ফেরার পথে ফোনে কথা বলেছিলেন। বলেননি মানিকগঞ্জ যাচ্ছেন। আমার আর ভাবীর (মঞ্জুলী মুনীর) বকুনির ভয়েই হয়তো’।
দুঃসংবাদটি শোনার পরের মুহূর্তগুলো এখনো ঠিক মনে করতে পারেন না মুন্নী। শুধু শহীদ মিনারে গুরু মিশুক মুনীরের কফিনটি আকড়ে ধরে বলেছিলেন,‘শোক সামলানো তো শিখিয়ে গেলেন না, স্যার’।






