মানবাধিকার প্রত্যয়টি স্থান, কাল, পাত্রভেদে ভিন্নতর হয়ে থাকে। স্বাভাবিকভাবে মানবধিকারের সংজ্ঞায়ন করলে যেটি প্রতীয়মান হয় তা হচ্ছে; স্বাভাবিক, সুষ্ঠু, সুন্দর পরিবেশে বসবাস করার জন্য যে ধরণের সেবা কিংবা সুযোগ পাওয়া দরকার তাই মানবাধিকার। আরো সংক্ষেপ করলে বলা যায়, জন্মগত কারণে একজন মানুষ যেসব অধিকার পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে থাকে তাই মানবাধিকার।
বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় কিংবা বিশ্বায়ণের যুগে যেমনিভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে ঠিক তেমনিভাবে মানুষের অধিকার সংরক্ষণের জন্য বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠিত নামধারী সংস্থা ও ব্যক্তিবর্গ মানুষের জীবনমানের স্বাভাবিকতা রক্ষার্থে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। কতটা সফল কিংবা ব্যর্থ তার হিসাব কষার পূর্বেই বোঝা যায়, সারা বিশ্বে মানবাধিকারের সংকট রয়েছে, তা না হলে মানবাধিকার রক্ষার জন্য আন্দোলন করা হবে কেন? অর্থাৎ মানুষ হিসেবে বাঁচার জন্য যে স্বাধীনতার প্রয়োজন রয়েছে তা সবাইকে যে কোন কারণেই হোক দেওয়া সম্ভবপর হয়ে উঠছে না।
কিন্তু মানবিক পৃথিবী গড়ে তোলার জন্য প্রত্যেক মানুষের মানবাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। তাছাড়া বসবাসযোগ্য পৃথিবী কোনভাবেই প্রতিষ্ঠিত হবে না। উন্নত বিশ্বের মানুষের জন্য মানবাধিকারের উপাদানগুলো একভাবে কাজ করে আবার দরিদ্র দেশগুলোর জন্য মানবাধিকারের উপাদানগুলো ভিন্নতর হয়ে থাকে। দেশের আর্থিক পরিস্থিতি, মানুষের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য বিবেচনায় মানবাধিকার ও রাষ্ট্র কর্তৃক জনগণের কাছে প্রদেয় সেবার পার্থক্য হয়ে থাকে। তদুপরি একটি কথাই যুক্তিযুক্ত, মানবাধিকারের সুফল প্রত্যেকটি মানুষের পাওয়া প্রয়োজন।
মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যে রোহিঙ্গাদের বসবাস। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই রাখাইন রাজ্যে তাদের বসবাস। পত্রিকায় খবর আসতো, নাফ নদী পেরিয়ে রোহিঙ্গা যুবকরা এদেশে মাদকদ্রব্য পাচার করতো। সেসময় থেকে রোহিঙ্গাদের প্রতি বাংলাদেশের সচেতন মানুষ মাত্রই নেতিবাচক ধারণার সৃষ্টি হয়ে থাকে। পাঠকমাত্রই অনুধাবন করতে পারবেন, দেশের ক্ষতি কখনো কেউই চাইতে পারে না। যদিও রোহিঙ্গাদের মাদক পাচারের সঙ্গে আমাদের দেশীয় দোসররাও জড়িত। দু’পক্ষের যোগসাজসেই এদেশে মাদক আসতো এবং যার ভয়াবহ পরিণতি আমরা লক্ষ্য করেছি। যার কারণেই রোহিঙ্গা নামটি সামনে আসলেই ভয়ঙ্কর একটি জাতি হিসেবে বিবেচিত হয় (যদিও তাদের মুষ্টিমেয় যুবক এ ধরণের গর্হিত কাজের সঙ্গে জড়িত)।
বর্তমানে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী মিয়ানমারের সামরিক জান্তার দ্বারা ভিটেমাটি চ্যুত হচ্ছে এবং জান্তার সৈনিকরা নারীদের পালাক্রমে ধর্ষণ করে দেশত্যাগে বাধ্য করছে। শুধু কি নারীরাই? শিশুরাও মিয়ানমারের আর্মির হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। জীবনের মায়ায় রোহিঙ্গারা রাতের আঁধারে নাফ নদী পেরিয়ে সহায় সম্বলহীণ হয়ে বাংলাদেশে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ সরকারও মানবিক বিবেচনায় রোহিঙ্গাদের বিনা বাধায় বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দিচ্ছে। এখনো রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে বিভিন্ন জায়গা দিয়ে জীবনের মায়ায় সম্বলহীণ অবস্থায় আসছে। অবস্থান এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে, রোহিঙ্গাদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় ধনীরাও ত্রাণের জন্য অন্যের ভরসায় দিন গুণছে।
পেছনের ফ্ল্যাশবাকে যদি দেখি, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় লাখ লাখ লোক (প্রায় ১ কোটি লোক) ভারতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছিল। ভারত সরকার তখন আমাদের আশ্রয় ও খাদ্য সহায়তা দিয়ে মানবিকতার পরিচয় দিয়েছিল। তখন কি কোন কারণে ভারত সরকার ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিল? অবশ্যই না; ভারত সরকার আমাদের আশ্রয়ের পাশাপাশি বহির্বিশ্বে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে জনমত গড়ার লক্ষ্যে কাজ করেছিল। পরিস্থিতি বিবেচনায় এবং যুদ্ধের প্রেক্ষিত বাস্তবতায় তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ভূমিকাকে বাঙালি জাতি চিরস্মরনীয় করে রাখবে এবং আগামী ১০০ বছর পরে যখন বাংলাদেশের ইতিহাস রচিত হবে সেখানে অবশ্যই অত্যন্ত মর্যাদার সহিত ইন্দিরা গান্ধীর নাম উল্লেখ থাকবে। সেসময় তৎকালীন ভারতীয় ভিন্ন মতাদর্শের রাজনৈতিক দলগুলো বাংলাদেশের শরণার্থীদের আশ্রয়ের বিরোধিতা করেছিল।
কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী তার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন এবং বিপথগ্রস্ত বাংলাদেশিদের সাহায্য করে বিশ্বের ময়দানে অনন্য নজির স্থাপন করেছিলেন। বাংলাদেশিরা কি ৯ মাসের বেশি শরণার্থী হিসেবে ছিলেন? ছিলেন না; কারণ দেশের স্বাধীনতা আসার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে ফিরে এসেছিলেন মুক্তিকামী জনগণ। রোহিঙ্গারাও হয়তো বেশি দিন থাকবে না, যৌক্তিক সমাধান অবশ্যই আসবে। কারণ বাংলাদেশ যুদ্ধে নয়, শান্তিতে বিশ্বাসী।

বর্তমান রোহিঙ্গা সংকটও এমন অবস্থায় দাঁড়িয়েছে। উপায়ন্তর না পেয়ে এক কথায় জীবন বাঁচাতে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে এসেছে। সুতরাং মানবিক দিক বিবেচনায় এ দেশের সরকার তাদেরকে খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা ও অন্যান্য সেবা দিয়ে মানবিক দৃষ্টি স্থাপন করেছে। অনন্য নজির হওয়ায় সারা বিশ্বের নামী-দামী সংবাদপত্রে বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে নানামুখী খেতাবে ভূষিত করেছেন, যা বাংলাদেশের জন্য গর্বের বিষয়। রোহিঙ্গাদের সমস্যা ও সংকট নিয়ে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে রোহিঙ্গা সমস্যাকে প্রাধান্য দিয়ে যৌক্তিক বক্তব্য দিয়েছেন।
বক্তব্যটি ব্যাপক প্রশংসা পায়। দেশি বিদেশি কূটনীতিকেরা বক্তব্যের যথার্থতা প্রমাণ করার জন্য রাখাইন রাজ্যে পরিদর্শণ করেন এবং শেখ হাসিনার বক্তব্যের সপক্ষে মতামত তুলে ধরেন। মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকার জাতিসংঘের প্রতিনিধিদলকে রাখাইন রাজ্যে পরিদর্শনের অনুমতি দেয়নি। বিষয়টা এমন: রসুই ঘরে কে রে? আমি কলা খাই না! এতেই প্রতীয়মান হয় যে, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের উপর সামরিক জান্তা ব্যাপক অত্যাচার চালাচ্ছে এবং এখনো প্রায়ই নাফ নদী পেরিয়ে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশসীমায় চলে আসছে। আজ থেকে ১০০ বছর পরে যখন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ইতিহাস লেখা হবে সেখানে শেখ হাসিনার সাহসী ও বিচক্ষণ ভূমিকার কথা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে নিঃসন্দেহে।
বাংলাদেশ সরকার মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের বিষয়ে সমগ্র বিশ্বে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে বহির্বিশ্বের নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছে। ইতোমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থেকে রোহিঙ্গাদের জন্য সাহায্য সহযোগিতা আসা শুরু হয়েছে। যার মাধ্যমে প্রতীয়মান হয়, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কূটনৈতিক দিক দিয়ে সফল হয়েছেন এবং রোহিঙ্গাদের সমস্যা নিয়ে জনমত তৈরি করতে পেরেছেন। বাংলাদেশের কিছু রাজনৈতিক দল এ রকম বিপদসঙ্কুল পরিস্থিতিতে সরকারকে সহযোগিতা না করে ভিন্নমুখী তথা দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়ে চলেছেন।
এ রকম কঙ্কটময় সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে কাঁধে কাঁধ রেখে কাজ চালিয়ে যাওয়া উচিত সেখানে সমালোচনার বাক্স খুলে বসেছে কয়েকটি দল। সেখানে শেখ হাসিনার সরকার চাচ্ছেন, মিয়ানমারের সরকারের উপর বৈশ্বিক চাপ সৃষ্টি করে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিতে বাধ্য করবেন। এবং কূটনৈতিক চালে বাংলাদেশ সরকার তার সফলতা দেখিয়েছে। ইত্যবসরে সু চি’র দফতরের মন্ত্রী বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে রোহিঙ্গাদের বিষয়ে বৈঠকে বসেছেন এবং রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে আশ্বস্থ করেছেন। আমি ক্ষুণাক্ষরেও এ লেখায় সু চি’র নাম আনতে চাইনি, কারণ শান্তিতে নোবেল বিজয়ী সু চি লাখ লাখ রোহিঙ্গার শান্তি বিনষ্টে জান্তা সরকারের মুখপাত্রের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন।
শান্তিপূর্ণ সমাধান না আসা পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের কখনোই জোরপূর্বক বিতাড়িত করবে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন: ‘আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান নিষ্পত্তি করা হবে। মিয়ানমারের উপর আন্তর্জাতিক চাপ রয়েছে।’ তাছাড়া, বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশে এসে রোহিঙ্গাদের সার্বিক পরিস্থিতি সরেজমিনে পরিদর্শণ করে গেছেন। জাতিসংঘ সহ অন্যান্য সংস্থার প্রতিনিধিরা রোহিঙ্গাদের বিষয়ে ঐক্যমতে পৌঁছেছেন। বাংলাদেশ সরকারও কারো সাহায্যের অপেক্ষায় না থেকে দীর্ঘমেয়াদী সংকট নিরসনের জন্য নোয়াখালির ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের থাকার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন।
এ সংকটময় পৃথিবীতে এ মুহূর্তে শরণার্থী ইস্যু ভয়াবহ পরিস্থিতি ধারণ করেছে। সে কঙ্কটময় সময়ে বাংলাদেশ যে মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বিশ্বে তা বিরল। কেননা, বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা পরিদর্শণে এসে সহমর্মিতা পোষণ করেছেন কিন্তু কেউ রোহিঙ্গাদের দায়িত্ব নেননি। এখানেই বাংলাদেশে অনন্যতার নজির স্থাপন করেছে, ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত প্রদর্শন করেছে।
তবে রোহিঙ্গা ব্যবস্থাপনা বিষয়ে আমার কিছু পরামর্শ রয়েছে। প্রায় ১০ লাখের মতো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছে। সংখ্যায় সেটি আরও বেশি হতে পারে। বিচক্ষণতার সাথে রোহিঙ্গাদের সার্বিক পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে। কোনক্রমেই যেন অভ্যন্তরীন নিরাপত্তা হুমকির মুখে না পড়ে। কারণ, এ সুযোগে চরমপন্থী ও জঙ্গীগোষ্ঠী হামলার ছক আঁকতে পারে। কাজেই, রোহিঙ্গাদের নিয়ে যেন কোন রাজনৈতিক দল রাজনীতি করার সুযোগ না পায় সে বিষয়েও খেয়াল রাখতে হবে। রোহিঙ্গাদের সুরক্ষার বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলোকে বাস্তবে রূপদানের জন্য সকলকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর পাশাপাশি সাধারণ জনগণ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের আরও কৌশলী ও মানবিক ভূমিকা পালন করতে হবে। তাহলেই মানবিক পৃথিবী প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাংলাদেশ বাকি বিশ্বে অনুকরণীয় হয়ে থাকবে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)








