‘সেই শিল্পই খাঁটি শিল্প, যার দর্পণে জীবন প্রতিফলিত। তার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে যা কিছু সংঘাত, সংগ্রাম আর প্রেরণা, জয়, পরাজয় আর জীবনের ভালবাসা, খুঁজে পাওয়া যাবে একটি মানুষের সব ক’টি দিক। সেই হচ্ছে খাঁটি শিল্প, যা জীবন সম্পর্কে মানুষকে মিথ্যা ধারণা দেয় না।’- নাজিম হিকমত
‘জীবনের জন্য শিল্প’ কথাটি শিল্পকে বিশ্লেষণের জন্য বিভিন্ন আলোচনায় উঠে আসে। সাহিত্য, চলচ্চিত্র, কবিতা, নাটক, চিত্রকর্মে যখন মানুষের জীবনের প্রতিফলন ঘটে তখনই তা খাঁটি শিল্প হয়ে ওঠে বলে অনেকেই মনে করেন। এই শিল্পে উঠে আসে মানুষের সংগ্রামের কথা, বেদনার কথা, ভালবাসার কথা। আর মানুষের জীবনশিল্পের কথা কবিতায় তুলে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন যে কবি, তিনি নাজিম হিকমত। নিজের অপ্রতিরোধ্য লেখনীর মাধ্যমে সারা জীবনই মানুষের জীবনের কথা বলেছেন রোমান্টিক বিপ্লবী কবি নাজিম হিকমত। বলেছেন মানুষের অধিকার আদায়ের কথা। বিপ্লব করেছেন সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদী শক্তির বিরুদ্ধে।
বিংশ শতাব্দীর কবিদের মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী কবি নাজিম হিকমত। নাজিম হিকমত শুধু তুরস্কের সবচেয়ে জনপ্রিয় কবিই নন, তিনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবিদের একজন। মাতৃভাষা তুর্কিতে ছাড়া অন্য কোন ভাষাতে তিনি লেখেননি। তা সত্ত্বেও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ভাষায় অনূদিত হয়েছে তার কবিতা। মাত্র ১৪ বছর বয়সে সাহিত্যে হাতেখড়ি হয়েছে তার। তারপর সারাটা জীবন তিনি সমানে লিখেছেন। শুধু কবিতাই নয়, লিখেছেন বহু নাটক, ভ্রমণ বৃত্তান্ত ও চিত্রনাট্য। করেছেন সাংবাদিকতাও।
নাজিম হিকমতের জন্ম সম্ভ্রান্ত পরিবারে হলেও তিনি তার জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন সাধারণ মানুষের মুক্তিসংগ্রামে। একটি কবিতায় তিনি লিখেছেন-
মানুষকে জড়িয়ে আমার বাঁচা,
মানুষেরই জন্যে আমার ভালোবাসা
আমি ভালোবাসি গতির তরঙ্গে ভাসতে
ভালোবাসি ভাবতে
আমি সংগ্রামকে ভালোবাসি………….
রোমান্টিক বিপ্লবী কবি নাজিম হিকমত ১৯০২ সালের ১৫ জানুয়ারি অটোমান সাম্রাজ্যের (বর্তমান গ্রীস) সালোনিকাতে জন্মগ্রহন করেন। তার বাবা সেখানকার উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন, মা ছিলেন শিল্পী। আর দাদু ছিলেন তুরস্কের একজন সম্ভ্রান্ত রাজপুরুষ। শিল্পী মা ও দাদুর উৎসাহে চৌদ্দ বছর বয়স থেকেই কবিতা লেখেন তিনি। ১৭ বছর বয়সে তার কবিতা প্রথম প্রকাশিত হয়। ১৯১৮ সালে তুর্কিস নেভাল একাডেমি থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন তিনি। ১৯২১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগ দেবার জন্য নাজিম ইস্তাম্বুল ছেড়ে গোপনে চলে যান আনাতোলিয়ায়।
১৯২২ সালে তিনি রাশিয়ার কমিউনিস্ট ইউনিভার্সিটি অব দ্য টইলার্স অব দ্য ইস্ট এ অর্থনীতি এবং সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশুনা করেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে সারা বিশ্ব থেকে আসা লেখক ও শিল্পীদের সাথে সাক্ষাৎ হয় হিকমতের। এসময় মায়াকভস্কির সাথে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে তার। সাধারণ মানুষের মুক্তির জন্য কেমন করে নিজেকে ঢেলে দিতে হয় সেই শিক্ষা হিকমত তার কাছ থেকেই পেয়েছেন।
আত্মজীবনী কবিতায় হিকমত লিখেছেন-
‘১৯০২ সালে আমার জন্ম
এরপর একবারের জন্যেও আমি আমার জন্মভূমিতে ফিরে যাইনি।
আমার ফিরে যেতে ভালো লাগে না
তিন বছর বয়সে আলেপ্পোতে আমি পাশার দৌহিত্রের ভূমিকায়
উনিশে মস্কো কমিউনিস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে
ঊনপঞ্চাশে তেহেকা পার্টির অতিথি হয়ে ফিরে আসি মস্কোতে
চৌদ্দ যখন বয়স আমি তখন থেকেই কবি।’
১৯২৪ সালে তুরস্ক স্বাধীন হওয়ার পর আবারো তিনি তুরস্কে চলে যান । সেই বছরেই বামপন্থী একটি ম্যাগাজিনে কাজ করার দায়ে গ্রেফতার হন তিনি। পরে তিনি রাশিয়ায় পালিয়ে যান এবং নিয়মিত লেখালেখি শুরু করেন। ১৯২৮ সালে তিনি পুনরায় তুরস্কে ফিরে আসার অনুমতি পান। এর পর পরবর্তী দশ বছরে তিনি পাঁচ বার জেলে গেছেন। এসময় তার নয়টি কবিতার বই প্রকাশিত হয়। নিপীড়িত মানুষের দু:খ দুর্দশা এবং সাম্রাজ্যবাদের শোষণমূলক কর্মকান্ড তার কবিতায় উঠে আসে। ১৯৩৮ সালে তিনি আবারো গ্রেফতার হন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আসে যে তার কবিতা সামরিক বাহিনীকে সমাজতান্ত্রিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ করছে। ছাত্রদেরকে বিপ্লবের প্ররোচনা দিচ্ছে। বিচারে তাকে আটাশ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। জেলে থাকার এই সময়টিতে নাজিম লিখেছেন অজস্র কবিতা ও গান।
১৯৪৯ সালে নাজিম হিকমতের মুক্তির জন্য একটি আন্তর্জাতিক কমিটির মাধ্যমে চিলির বিখ্যাত কবি পাবলো নেরুদা, দার্শনিক জ্যা পল সার্ত্র, সঙ্গীতশিল্পী পল রবিনসনের মতো দিকপালেরা তার মুক্তির উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ১৯৫০ সালে তিনি আঠারো দিনের জন্য অনশনে যান। সেই বছরই হিকমত পাবলো নেরুদার সাথে যৌথভাবে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন এবং তুরস্কের গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসলে দীর্ঘ ১৩ বছর পর তিনি মুক্তি অর্জন করেন। এর মধ্যে তাকে দুবার হত্যার চেষ্টা করা হয়। এজন্য আবারো রাশিয়ায় পালিয়ে আসেন তিনি। এসময় তুরস্কের সরকার তার নাগরিকত্ব বাতিল করে।
আত্মজীবনী কবিতায় তিনি আরো লিখেছেন-
কোন কোন চারাগাছ সম্পর্কে সবকিছু জানে, মাছ সম্পর্কে কেউ কেউ
আমি জানি বিচ্ছেদ
কিছু কিছু মানুষ হৃদয়ে রাখে তারাদের নাম
আমি আবৃত্তি করে যাই নিরবতা।
আমি কারাগারে ঘুমিয়েছি, ঘুমিয়েছি বিশাল হোটেলে
আমি চিনেছি ক্ষুধাকে, চিনেছি অনশন-ধর্মঘটকে।
তিরিশে আমাকে ফাঁসিতে ঝোলাতে চাইল
পঞ্চাশে দিল নোবেল।’
সারাজীবন সংগ্রাম করে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে কথা বলে গেছেন হিকমত। সারা জীবনে বিভিন্ন অভিযোগে হিকমতের যে পরিমাণ সাজা হয়েছে তা হিসেব করলে দাড়ায় ৫৬ বছর, যা তার নিজের বয়সের চেয়েও অনেক বেশি। ১৯৬৩ সালের ৩ জুন সকালে মস্কোতে হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যু হয় মহান এই কবির। অনাতোলিয়া গ্রামের যে কোন একটি প্লেন গাছের তলায় চিরনিদ্রায় শায়িত হওয়ার ইচ্ছে ছিল নাজিমের। কিন্তু সেই ইচ্ছে পূরণ হয়নি। কত ইচ্ছেই তো মানুষের পূরণ হয় না। পরে তার দাফন হয় মস্কোর নভদেভিসি কবরস্থানে। অপূর্ব সেই সমাধিস্থল আজো সারা বিশ্বের অসংখ্য নাজিমভক্ত ও কবিতাপ্রেমী মানুষের কাছে একটি আকর্ষণীয় ও দর্শনীয় স্থান। তুরস্ক সরকার নাজিমের নাগরিকত্ব বাতিল করলেও তার মৃত্যুর এক বছরের মধ্যে তুরস্কে তার কবিতার ভলিয়্যুমসহ পুনর্মদ্রণ শুরু হয়ে যায়। এর সাথে পৃথিবীর অনেক ভাষায় অনূদিত হয় তার লেখা।
নাজিম হিকমত সম্পর্কে পাবলো নেরুদা লিখেছেন-
‘সদ্য মুক্তি পাওয়া বন্দীদের একজন নাজিম হিকমত
তার কবিতার মতো
লাল রং সোনার সুতোয় বোনা
জামা উপহার দিয়েছে আমায়।’
সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার জন্য জীবনে অসংখ্যবার কারাগারে যেতে হয়েছে হিকমতকে। তবু তিনি হার মানেননি। লিখে গেছেন নিজের মতো করে। জেলখানার চিঠিতে বলেছেন-
‘জল্লাদের লোমশ হাত যদি কখনও আমার গলায় ফাঁসির দড়ি পরায়,
নাজিমের নীল চোখে
ওরা বৃথায় খুঁজবে ভয়।’
কবিতার ভাষা সম্পর্কে হিকমত লিখেছেন-
‘কবিতার, গদ্যের আর কথা বলবার ভাষার ভিন্নতা নতুন কবি স্বীকার করেন না। এমন এক ভাষায় তিনি লেখেন যা বানানো নয়, কৃত্রিম নয়, সহজ, প্রাণবন্ত, বিচিত্র, গভীর, একান্ত জটিল-অর্থাৎ অনারম্বর সেই ভাষা। সে ভাষায় উপস্থিত থাকে জীবনের সমস্ত উপাদান। কবি যখন লেখেন আর যখন কথা বলেন কিংবা অস্ত্র হাতে নেন-তিনি একই ব্যক্তি। কবিরা তো আকাশ থেকে পড়েননি যে তারা মেঘের রাজ্যে পাখা মেলার স্বপ্ন দেখবেন। কবিরা হলেন সমাজের একজন, জীবনের সঙ্গে যুক্ত, জীবনের সংগঠক।’
তিনি কবিতাকে যথাযথ কবিতা হয়ে ওঠার কথা বলতেন। কবিতার মাধ্যমে তিনি শুধু মানুষের হৃদয়ের কথাই বলেননি, মানুষের হৃদয়কে একটা সুনির্দিষ্ট লক্ষের দিকে চালিত করেছেন। কবিতা লেখা প্রসঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে হিকমত বলেছিলেন-
‘লেনিন যখন বেঁচে ছিলেন, সেই সময়ের মস্কোয় মায়াকোভস্কি ও ইয়েসেনিনের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল। সেসময় বড় বড় জমায়েতে কবিতা পড়া হতো। আমার তখন মনে হয়েছিল আমার দেশেও তো কবিরা যুগ যুগ ধরে জনগণের সামনে কবিতা পাঠ করেছেন। জেলে যাওয়ার আগে আমি কবিতা লিখতাম বহু শ্রোতার সামনে দাঁড়িয়ে কবিতা পড়ব বলে। পরে যখন জেলে থাকতে হলো অনেক দিন ধরে, তখন থেকে আমার স্বরও নেমে যেতে থাকল। আমার শ্রোতা বলতে কেউ ছিল না, বা থাকলেও এক-দুজন মাত্র। একজনকে শোনাতে পারলেও আমার মনে হত এর মধ্যে দিয়েই আমি পৃথিবীর সব মানুষের কাছেই যেতে পারছি।’
সারাটা জীবনই নিপীড়িত মানুষের মুক্তির কথা বলেছেন হিকমত। তার কবিতা লেখার কলমকে চালিত করেছেন সারা দুনিয়ার মানুষের উদ্দেশ্যে।
জেলে যাবার পর কবিতায় হিকমত লিখেছেন-
‘আমি জেলে যাবার পর
সূর্যকে গুনে গুনে দশবার প্রদক্ষিণ করেছে পৃথিবী
আর আমি বারম্বার সেই একই কথাই বলছি
জেলখানায় কাটানো দশটা বছরে
যা লিখেছি সব তাদেরই জন্যে
যারা মাটির পিঁপড়ের মতো
সমুদ্রের মাছের মতো
আকাশের পাখির মতো অগণন
যারা ভীরু, যারা বীর
যারা নিরক্ষর, যারা শিক্ষিত
যারা শিশুর মতো সরল
যারা ধ্বংস করে, যারা সৃষ্টি করে,
কেবল তাদেরই জীবনকথা মুখর আমার গানে।’
নাজিম হিকমত তার কবিতায় শুধু তুরস্কের মানুষের মুক্তির কথাই বলেননি। বলেছেন সারা বিশ্বের মানুষের মুক্তির কথা। লিখেছেন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে। গেয়েছেন মানবতার জয়গান। তুরস্ক থেকে যখন তার নাগরিকত্ব বাতিল করা হয় তখন হিকমত তার কবিতায় লিখেছেন-
‘বলো, হিকমত-পুত্র, কোন শহরে তুমি মরতে চাও?’ উত্তরে বলেছেন- ‘আমি মারা যেতে চাই ইস্তাম্বুলে, মস্কোয় এবং প্যারিসেও।……আমার মৃত্যুগুলোকে আমি পৃথিবীর উপর বীজের মতো ছড়িয়ে দিয়েছি, এর কিছু পড়েছে ওদেসায়, কিছু ইস্তাম্বুলে, আর কিছু প্রাগে। সবচেয়ে যে দেশকে আমি ভালবাসি সেটি হচ্ছে পৃথিবী। যখন আমার সময় আসবে, আমাকে পৃথিবী থেকে মুড়ে দিও।’
কবি সুভাস মুখোপাধ্যায় লিখেছেন-‘ নাজিমের কবিতায় যে সর্বজনীনতা, তার শিকড় রয়েছে বিশেষভাবে তার স্বদেশের মাটিতেই। নাজিমের জীবন আর তার কাব্য অভিন্ন। তার কবিতাই তার জীবনের ইতিবৃত্ত। সমসাময়িক তুরস্কের ধারাবিবরণ তার কবিতায়। তাই নাজিমের সব কবিতা কালানুক্রমে সাজালে তুরস্কের ইতিহাস বাক্সময় হয়ে উঠবে।’
১৯০২ সালের আজকের এই দিনে তৎকালীন গ্রীসের সলোনিকাতে জন্ম নেয়া কবি নাজিম হিকমত এক শতাব্দী পরও সারা বিশ্বের বিপ্লবী ও সংগ্রামী মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে আছেন। আজো সারা বিশ্বে মানুষ নির্যাতিত হচ্ছে, নিপীড়িত হচ্ছে, অধিকার বঞ্চিত হচ্ছে, শোষিত হচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদীরা এখনও মাথা উঁচু করে শোষণ করছে পৃথিবী। তবুও মানুষ স্বপ্ন দেখে। তবুও মানুষ বেঁচে থাকে। বেঁচে থাকার স্বপ্নই বাঁচিয়ে রাখে মানুষকে।
জেলখানার চিঠি কবিতায় হিকমত লিখেছেন-
‘যে সমুদ্র সব থেকে সুন্দর
তা আজো আমরা দেখিনি
সবচেয়ে সুন্দর শিশু
আজো বেড়ে ওঠেনি।
আমাদের সবচেয়ে সুন্দর দিনগুলো
আজো আমরা পাইনি।
মধুরতম যে কথাটি বলতে চাই
তা আজো বলা হয়নি।’
হিকমত যে পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেছেন একবিংশ শতাব্দীতে এসে সেই পৃথিবীকেই আমরা দেখতে চাই। আমরা বেঁচে থাকতে চাই সব থেকে সুন্দর সমুদ্র দেখতে, সবচেয়ে সুন্দর শিশুর বেড়ে ওঠা দেখার জন্য। আমরা বেঁচে থাকতে চাই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দিনগুলো পাওয়ার জন্য।







