বাংলাভাষা নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ক্রমেই বাড়ছে। কেমন একটা দীনতার আবরণ ঢেকে ফেলছে আমাদের মাতৃভাষার মুখচ্ছবি। ক্রমেই গরিব-পিছিয়ে-পড়া মানুষের জীবনের সঙ্গে লটকে থাকছে ‘আ মরি বাংলা ভাষা’-র জীর্ণ কঙ্কালটি। যেসব মানুষ শিক্ষিত ও ধনী হচ্ছে, নগরকেন্দ্রিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত হচ্ছে, যন্ত্র-প্রযুক্তিতে দক্ষ হচ্ছে, তাদের যাপিত জীবনচর্যায় ক্রমশ প্রান্তিক হয়ে যাচ্ছে আমাদের মাতৃভাষা। গত দুই দশকে আমাদের দেশে ভাষাকেন্দ্রিক বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে। ইংরেজি জানা মানুষজন তর তর করে এগিয়ে যাচ্ছে আর্থিক সাফল্যের দিকে। ভালো মাইনের চাকরি, প্রবাসী হওয়ার সুযোগ ইত্যাদি নির্ধারণ করে দিচ্ছে ইংরেজিতে দক্ষতা। আর যারা শুধু বাংলা চর্চার মধ্যে নিজেদের নিয়োজিত রেখেছে তারা পিছিয়ে পড়ছে কর্মজগতে।
আর এতে করে বাংলাদেশে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ইংরেজির চূড়ান্ত প্রতিষ্ঠাই যেন দিন দিন পাকাপোক্ত হচ্ছে। ইংরেজি-মাধ্যম শিক্ষা আগেও বেশ জোরদার ছিল। বিশেষত উচ্চশ্রেণির মধ্যে। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে সন্তানকে ইংরেজি মাধ্যমে পড়ানোর চলটা মধ্যবিত্ত শ্রেণিও বেশ রপ্ত করে নিয়েছে। চিকিৎসাবিদ্যা, প্রকৌশলবিদ্যা, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশির ভাগ বিভাগ, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদির মাধ্যম অনেক দিন ধরেই কার্যত ইংরেজি। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ২০০৬ সালে বিশ বছর মেয়াদি ‘উচ্চশিক্ষার কৌশলপত্র’ প্রচার করেছে। তাতে ইংরেজির অবিকল্প প্রতিষ্ঠা এতটাই জোরদার যে তারা প্রশ্নটি উত্থাপন করার প্রয়োজনই বোধ করেনি। বাকি ছিল মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের মূলধারার শিক্ষা। ‘ইংলিশ ভার্সন’ নামের এক বস্তু সেখানে প্রবল প্রতাপে আসীন হওয়ায় ইংরেজির রাজত্ব চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
অভিভাবকের দিক থেকে সন্তানকে ইংরেজি মাধ্যমে পড়ানোর কারণটা খুব সরল আর জোরালো। যুক্তিযুক্তও বটে। একদিকে এর সঙ্গে আভিজাত্যের ব্যাপার জড়িত। অন্যদিকে সন্তানকে বাজারের উপযোগী করে গড়ে তোলার চেষ্টা।
আমরা আজ জোর দিয়ে বলতে পারি না, ভালোভাবে, শুদ্ধ করে বাংলা লিখতে-পড়তে শেখো। বাংলাতে স্থিত হও। তারপরও মাতৃভাষা বাংলা নিয়ে আমাদের যতটুকু যা আবেগ কাজ করে-তা এই ফেব্রুয়ারি মাসে।ফেব্রুয়ারি গেলে আমাদের আবেগ কমে যায়। বাংলার গুরুত্বও কমে। যদিও ভাষা একটা অন্য জিনিস, কিন্তু আমাদের দেশে এটা হয়ে উঠেছে আয়-রোজগার-দক্ষতার একটি উপকরণ!
ইংরেজি জানতেই হবে, নাহলে সভ্য সমাজে জীবন আর জীবিকার লড়াইয়ে হার মানতে হবে! ঔপনিবেশিক মানসিকতা ও কর্পোরেট সমাজের চাপিয়ে দেওয়া এই মতই অল্প অল্প করে গ্রাস করছে আমাদের, আমাদের যুব সমাজকে। এখন কর্পোরেট অফিসে চাকরি করতে হলে ইংরেজি বলা শিখতেই হবে। তা না হলে শতগুণেও মূল্যহীন হবে যুবকের কষ্টার্জিত জ্ঞান! ফলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে বাড়ছে ‘বাংরেজি’ (বাংলা যোগ ইংরেজি) ভাষায় কথা বলার প্রভাব। এই পরিস্থিতিতে আমরা কেমন করে বলি, আমার সন্তানকে আমি বাংলা মাধ্যম স্কুলে পড়াব?
আমাদের চারিদিকের পরিবেশ-পরিস্থিতি কিন্তু বাংলা নয়, বরং ইংরেজি চর্চাকেই প্রতিনিয়ত উৎসাহ যোগাচ্ছে। আন্তর্জাতিক জীবন থেকে পারিবারিক জীবন পর্যন্ত অর্থাৎ জীবনের সর্বত্র ইংরেজি ভাষার দাপট। যে ছাত্র ইরেজিতে ভালো সে শিক্ষাজীবন শেষে ভালো ভালো চাকরিতে সুযোগ পাচ্ছে। যে ব্যবসায়ী ভালো ইংরেজি জানেন, তিনি ব্যবসায় উন্নতি করছেন।
শিক্ষাজীবনের অভ্যন্তরীণ লক্ষ্য যাই হোক না কেন, বাহ্যিক লক্ষ্য এখন ভালো চাকরি পাওয়া। আর দেশের চাকরির বাজার, চাকরিদাতাদের চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক বিশ্বের দাবি অনুযায়ী যে ইংরেজিতে দক্ষ তার চাহিদা সর্বত্র। সার্টিফিকেটকে চাকরি প্রাপ্তির জন্য আবেদন করার স্বীকৃতি বলা যেতে পারে; কিন্তু চাকরির বাজারে প্রবেশের চাবি অবশ্যই ইংরেজিতে সুদক্ষ হওয়া। শ্রমিক হিসেবে বিদেশে যেতে চাইলেও ইংরেজি জানা চাই। একজন ইংরেজি ভাষা না-জানা শ্রমিক যে টাকা মাইনে পান তার চেয়ে বহুগুণ বেশি মাইনে পান একজন ইংরেজি ভাষা জানা শ্রমিক। দুজন শ্রমিকেরই কাজ করার যোগ্যতা সমান হওয়ার পরও এটাই বাস্তবতা। ইংরেজি ভাষা জানা ছাড়া আজকের দুনিয়ায় মানুষকে পিছিয়ে পড়তে হয়। রাষ্ট্রব্যবস্থা, সমাজ, পারিপার্শ্বিকতা আমাদের এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছে। এর পেছনে আমাদের ঔপনিবেশিক মানসিকতা একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ‘কলোনিয়াল হ্যাংওভার’ থেকে বেরোতে পারিনি বলেই হয়তো, ইংরেজি ভাষার প্রতি আমাদের মোহটা একটু বেশি। আদপে এই বিশ্বে সবচেয়ে বেশি লোক যে ভাষায় কথা বলে, সেটা চিনা ভাষা। ২০.৭%। তারপরে আসে ইংরেজি, ৬.২%। অর্থাৎ ৭৩.১% শতাংশ লোক ইংরেজি ছাড়া অন্য ভাষায় কথা বলেন। এই ছোট্ট পরিসংখ্যানটাই বুঝিয়ে দেয়, ইংরেজি ছাড়া অন্য বিদেশি ভাষা শেখার গুরুত্বটা। কিন্তু আমরা অন্যসব ভাষাকে পায়ে মাড়িয়ে ইংরেজির কোলেই কেবল আশ্রয় খুঁজেছি।
এর অন্যতম কারণ সম্ভবত কর্মসংস্থান। আমাদের দেশে সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বহুজাতিক সংস্থাগুলো ইংরেজিকেই সবেচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। বিদেশি ভাষা শেখার তিনটি দিক আছে- ব্যক্তিগত আগ্রহ, সহজবোধ্যতা আর কর্মসংস্থানের চাহিদা। আমরা শেষের টিকেই বড় করে দেখি। এ ক্ষেত্রে অন্য কোনো বিদেশি ভাষা নয়, ইংরেজিই আমাদের প্রথম ও প্রধান পছন্দ। তাই ইংরেজি হয়ে উঠেছে আমাদের আয়-উন্নতির একমাত্র ভাষা। নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের কাছে সামাজিক উত্তরণের কার্যত একমাত্র পথ হলো কাড়ি কাড়ি টাকা উপার্জন করা। ঘুষ-দুর্নীতির চোরাপথের বাইরে টাকা উপার্জনের প্রধান ক্ষেত্র হলো-কর্পোরেট দুনিয়ায় চাকরি করা। আর এই জগতে কাজ করতে হলে ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অপরিহার্য।
আমাদের দেশে ‘সামজিক চাহিদা’ বর্তমানে ইংরেজিমুখী। রাষ্ট্রীয় নীতিও এই সামাজিক চাহিদার অনুগামী। দেশে অদক্ষ শ্রমিকের সংখ্যা বিপুল, উৎপাদন শিল্পও প্রায় নেই বললেই চলে। জনসংখ্যায় তরুণের অনুপাত বিরাট।
সুতরাং এ পরিস্থিতিতে উপার্জননির্ভর একটি শিক্ষাব্যবস্থায় আমরা অভ্যস্ত হতে চলেছি। সেখানে ইংরেজিটাই হয়ে উঠছে প্রধান অবলম্বন। আর বাংলাভাষা ক্রমে ‘বাপে তাড়ানো মায়ে খেদানো’ এক ভাষায় পরিণত হয়েছে। যে ভাষা জেনে চুপচাপ বসে থাকলে আয়-উন্নতির কোনো সম্ভাবনা নেই, বড় হওয়া যেমন-তেমন, বড়লোক হওয়ার তেমন কোনো সুযোগ নেই!
বাংলা আসলে একটা দীর্ঘশ্বাসের নাম। বাংলা যারা চর্চা করে, তারা সমাজে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী। বাংলা পরিণত হয়েছে গরিব মানুষের ভাষায়। বাংলা নিয়ে পড়ে থাকলে গরিব থাকতে হবে। সবার পেছনে দাঁড়াতে হবে।
প্রায় একশো বছর আগে পদার্থবিদ মেঘনাদ সাহা বলেছিলেন, ইংরেজি হলো ‘বিদেশি ভাষা’। তিনি এই ভাষা বোঝা এবং তা নির্ভুলভাবে লিখতে পারার মধ্যে একটা পার্থক্য করেছিলেন। তিনি স্বীকার করেছিলেন যে, ইংরেজিকে দখলে আনতে হলে ‘সময়, চর্চা এবং দীর্ঘ অনুশীলন’ দরকার। কিন্তু তার মতে ইংরেজির একটা ‘পর্যাপ্ত’ জ্ঞান অর্জন করা হলো ‘জাতীয় প্রয়োজন’ এবং ‘দৈনন্দিন গুরুত্ব’-এর ব্যাপার এবং সেই কারণে তিনি সুপারিশ করেছিলেন, ‘ইংরেজি নির্ভুলভাবে লেখা নয়, এই ভাষা বুঝতে পারা এবং ইংরেজি বই স্বচ্ছন্দভাবে পড়তে পারার দক্ষতা অর্জন’ প্রত্যেক ছাত্রছাত্রীর পক্ষে জরুরি, এটা করতে পারলেই ভাষা সমস্যার সমাধান হবে।
আমরা সেই পথ ধরিনি। আমরা ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলার জন্য অশ্রুপাত করি। আর বাকি এগার মাস ইংরেজির আরাধনা করি। তাতে বাংলাভাষা হয়তো বেঁচে-বর্তে থাকবে, কিন্তু যারা বাংলা নিয়ে বসে থাকবে, তাদের না খেয়ে মারা-পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না!
আজকালকার শহুরে মত্তবিত্ত-উচ্চবিত্ত ঘরের সন্তানেরা ভালো করে বাংলা বলতে পারে না। ভুল ও বিকৃত বাংলার সঙ্গে কিছু প্রচলিত ইংরেজি মিশিয়ে এক অদ্ভুত জগাখিচুড়ি ভাষা তারা চালু করেছে। যার যথার্থ প্রতিফলন দেখা যায় এফএম রেডিওগুলোতে। না, এজন্য ছাত্রছাত্রীরা দায়ী নয়। তারা একটা ব্যবস্থার বলি। অভিভাকদের অপূর্ণ স্বপ্নের তল্পিবাহক তারা।কোনো কোনো অভিভাবক তাদের নিজেদের জীবনের অপূর্ণ স্বপ্নের পরিপূর্তি আকাঙ্ক্ষা করেন তাদের সন্তানের মধ্যে। তারা স্যাটাস্যাট ফটাফট ইংরেজি বলবে, ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার, বড় বড় প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার হয়ে ভূস্বর্গ আমেরিকা কিংবা ইউরোপের কোনো দেশে গিয়ে গ্রিন কার্ড নিয়ে আস্তানা গাড়বে- এমন স্বপ্নের বলি হচ্ছে একালের ছেলেমেয়েরা।
বাংলা দরিদ্রের ভাষায় পরিণত হওয়ায় বিদেশিদের কাছেও এই ভাষার তেমন কোনো কদর নেই। রাজনীতিতে, শিক্ষায়, সাহিত্যে, সংস্কৃতিতে, বাণিজ্যে বাংলা পিছিয়ে আছে বলে বাংলা ভাষার কোনও মূল্য নেই বাইরের দুনিয়ায়। একসময় মানুষ ইংরেজি ফরাসি শিখেছে ওই ভাষা ঔপনিবেশিক প্রভুদের ভাষা ছিল বলে। পর্তুগিজ, স্প্যানিশ, ওলন্দাজ ভাষা বাণিজ্যের কারণে শিখতো। দুর্বলের এবং দরিদ্রের ভাষা কেউ শিখতে চায় না। বাংলা শিখে চাকরি পাওয়া যায় না বলে বাঙালিরা বাংলা শেখে না, সেখানে বিদেশিরা কেন শিখবে বাংলা?
এই বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে, ভাষাশহীদদের প্রতি ক্ষমা চেয়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসেই দাবি তুলছি: আমাদের মাতৃভাষা ইংরেজি চাই!
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








