গল্পটা শুনিয়েছিলেন এক সময়ের দেশ সেরা ডিফেন্ডার মোনেম মুন্না। চির প্রতিদ্বন্দ্বী মোহামেডানের সঙ্গে হেরে গেছে আবাহনী। ম্যাচ শেষে রাতে আবাহনী ক্লাবেই ঘুমাচ্ছিলেন তিনি। মাঝ রাতের পর কোনো এক সময় ঘুম ভেঙ্গে যায় তার। হারের বেদনা তার মধ্যেও ছিলো। কিন্তু পেশাদার ফুটবলার মুন্না; মেনেই নিয়েছিলেন একরকম। ক্লাবের বারান্দা ধরে হাঁটার সময় তিনি কারো কান্নার শব্দ শুনতে পান।
কান খাড়া করেই কান্নার উৎস খুঁজতে গিয়ে আবিস্কার করেন, কেউ একজন ক্লাবের দেয়ালে হেলান দিয়ে কাঁদছেন। এক পা-দু পা করে সেদিকে এগিয়ে যান তিনি। কাছে গিয়ে দেখেন এক তরুণ অঝোরে কেঁদে চলেছেন। তিনি তাকে কারণ জিজ্ঞাসা করতেই অভিমানে কান্নার শব্দ বেড়ে যায় তরুণের। তরুণটি চিৎকার করে মুন্নার কাছে জবাবদিহি চাওয়ার ভঙ্গিতে বলতে শুরু করেন, ‘এইটা কোন কাজ করলেন মুন্না ভাই? এইভাবে কেউ হারে? আপনাদের কারণে বাসায় যেতে পারছি না। কেমনে মুখ দেখাবো?’
মোনেম মুন্না গভীর রাতেও ক্লাবের দরজা খুলে সেই তরুণকে ভেতরে নিয়ে এসেছিলেন। খাইয়েছেন। তাকে অনেক বুঝিয়েছেন, খেলায় জয়-পরাজয় আছে। এভাবে আবেগী হলে কি চলে?
তারপর ওই তরুণের বাড়ি ফেরার ব্যবস্থা করেও দিয়েছেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলেই বলছিলেন মুন্না, ‘এই হলো সমর্থক, আমাদের চেয়ে তাদের কষ্ট বেশি। খেলতে গেলেই এইসব মুখ চোখের সামনে ভেসে উঠে। মনে হয় খারাপ খেললে ওদের মন ভেঙ্গে যাবে।’
ভারতের বিপক্ষে টি-২০ বিশ্বকাপ খেলার সময় বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা সমর্থকদের চেহারা কে কিভাবে দেখেছেন, ভেবেছেন- তা জানা যায়নি। তবে ম্যাচ শেষে প্রত্যেকেই যে সমর্থকদের কথা ভাবছেন- সেটিই সত্যি। বাঘের দলের বাঘা দুই খেলোয়াড় মুশফিকুর রহিম কিংবা মাহমুদ উল্লাহ রিয়াদ বোধ হয় একটু বেশিই ভাবছেন।
অধিনায়ক মাশরাফিকেও জবাব দিতে হচ্ছে সমর্থকদের প্রশ্ন মাথায় রেখেই। কয়েক যুগ আগেও যারা ক্রিকেটকে অহেতুক এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত দৌড়াদৌড়ির খেলা হিসেবে বিবেচনা করতেন এখন ক্রিকেটের জন্যে তাদেরও ঘুম বিসর্জন হচ্ছে। এরই নাম ক্রিকেট!
বুধবার রাতের ম্যাচের পর থেকেই আফসোসের ঝড় বয়ে যাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। তা গড়িয়েছে আলোচনার টেবিলেও। অফিস, আদালত, স্কুল-কলেজ, চায়ের দোকান- বাদ নেই কোনো জায়গা, বাদ নন কেউ। শিশুটি যেমন স্বপ্ন ভঙ্গে আফসোস করছে, আফসোস ঝরছে বড়দের মুখ থেকেও।
কষ্টের মাত্রাও নানামুখি। ফেসবুকেই একজন জানালেন, রাত ১টায় ছোটভাই তাকে ফোন করে কাঁদছিলো। বড়ভাই নিজের কান্না লুকিয়ে তাকে বোঝালেন, কান্নার কিছু নেই; খেলায় জয়-পরাজয় আছেই। জবাবে ছোটভাই বললো, হারের কষ্টতো আছেই। কিন্তু, আমার কান্না আসছে এ কারণে যে এ কষ্টে মাশরাফি ভাইও নিশ্চয়ই কাঁদছেন। তার কান্না কীভাবে সহ্য করি!
আসলেই তাই। একটা নিশ্চিত জয় চোখের সামনে থেকে চলে গেছে। একটা নিশ্চিত উল্লাসের উপলক্ষ হাতছাড়া হয়ে গেছে। বছরে এমন কতোটি ভালো মুহূর্ত পাওয়া যায়? হয়তো তাই, আজ রিজার্ভ-হ্যাকারদের কথা কেউ বলছেন না। ইউপি নির্বাচনের হিসাব নিকাশও সামনে আসছে না। কেবল একটাই হাহাকার- ইস! হলো না। তিনটি বলে একটি রান না পাওয়ার আক্ষেপ।
ভারতের বিপক্ষে শেষ ওভারে জয়ের জন্যে প্রয়োজন ছিলো ১১ রান। মুশফিকুর রহিমইতো দু’ দুটি চার মেরে সম্ভাবনাকে হাতের মুঠোয় নিয়ে এলেন। আবার ফুল টসের ফাঁদে তিনিই সে সম্ভাবনাকে দুরে ঠেলে দিলেন। এরপরও তিন বলে দুই রান, খুব কি বেশি? একটি রান হলেও ম্যাচ ‘টাই’ হতো। জয় পরাজয় নির্ধারণে সুপার ওভারে আরও একটু সময় পাওয়া যেতো। কিন্তু, কোনটিই হলো না।
সুনীল গাভাস্কারের ভাষায় ‘গ্ল্যামার শট’ খেলতে গিয়ে মুশফিক আউট হলেন। তার পথ ধরলেন মাহমুদউল্লাহও।
মুশফিক আগে আউট হয়েছেন বলে অনেকেই তার কীর্তিকে ভুল হিসেবে ক্ষমা করে দিয়েছেন। কিন্তু, একটা দুর্ঘটনা দেখার পরও একই পথে মাহমুদউল্লাহ কিভাবে গেলেন? সমালোচনা করতে গিয়ে এখানেও রাশ টেনে ধরতে হচ্ছে। কারণ পুরো ম্যাচে মাহমুদউল্লাহকে সামনে রেখেইতো সবাই স্বপ্ন দেখেছিলেন।
তাহলে শুভাগত, মুস্তাফিজ? শেষ বলে চোখ বুজে দৌড়ালেও একটি রান! এর অনুশীলনতো ১৯ বছর আগে কিলাত ক্লাব মাঠে করেছে বাংলাদেশ। শান্তর এক বলে এক রানে বাংলাদেশ আইসিসি শিরোপা জিতেছিলো। এরপরইতো পাল্টে গেলো বাংলাদেশের ক্রিকেট। এতো বছর পর এমন একটি সুযোগ! পেয়েও কাজে লাগানো গেলো না।
তিনটি বলে একটি রানতো করাই গেলো না, বরং খোয়া গেলো তিন তিনটি উইকেট। এ যেনো সইতে না পারা, বলতে না পারার কষ্ট!
সোশ্যাল মিডিয়ায় কেউ কেউ ক্রিকেটের উন্নতি, ক্রিকেটারদের পেশাদারিত্ব ইত্যাদি নিয়েও প্রশ্ন তুলে ফেলেছেন। যতো মনোকষ্টই থাক, এরপরও এমন প্রশ্ন বাড়াবাড়ি। প্রিয় ক্রিকেটাররা ভুল করেছেন, টেনশন বা উত্তেজনার ভার নিতে পারেননি, কিন্তু তাদের কমিটমেন্ট নিয়ে একবিন্দু সন্দেহ বা সংশয় নেই।
মানতেই হবে, অনেক উন্নতি হয়েছে টাইগারদের। তা না হলে ভারতের মাটিতে ভারত নাস্তানাবুদ হয় কীভাবে? শেষ ওভারে হারানোর কষ্টে সবাই বুঁদ বলেই হয়তো প্রাপ্তির হিসাবটা হচ্ছে না। যেভাবেই দেখেন না কেনো, চিন্নাস্বামীতে হার ছাড়া ম্যাচ থেকে প্রাপ্তিও কম নয়।
একটা ওভারের প্রতিটি বলে যখন ভারতীয়দের পরিকল্পনায়-পরিকল্পনায় সময় ব্যয় করতে হয়- সেটি কি উন্নতি নয়? দেড়শ কোটি মানুষ যখন রুদ্ধশ্বাসে কাটায়- সেটি উন্নতিইতো। ধারাভাষ্যকার আর খ্যাতিমান ক্রিকেটাররা যখন প্রশংসায পঞ্চমুখ হন- এটিও উন্নতি অবশ্যই। একথাও সত্যি, জয় যখন মুখ্য হয়ে যায়, তখন এসব প্রাপ্তির আনন্দও মাঠে মারা যায়।
সমর্থকদের আত্মবিশ্বাসকে এমন জায়গায় নিয়ে গেছে টাইগাররা, সেখান থেকে পিছু হটার কোনই সুযোগ নেই।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকেও পরিকল্পনা করতে হবে এ বিষয়টি মাথায় রেখেই। মোনেম মুন্নার মতোই সমর্থকদের মুখকে অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে খেলার মাঠে নামার সময়।
এরপরও টি-২০ বিশ্বকাপে ভালো লড়াই করেছেন ক্রিকেটাররা। তাদের প্রতি অফুরন্ত ভালোবাসা। শাবাশ টাইগার্স!
(এ
বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর
সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)






