মধ্য আয়ের দেশ হওয়ার লক্ষ্যে শক্তিশালী মধ্যবিত্ত গড়ে তোলার স্বপ্নপূরণে সরকারের আয়ের মূল লক্ষ্যই হয়েছে মধ্যবিত্ত।
অর্থমন্ত্রীর ভাষায় ‘প্রায় ১৬ কোটি মানুষের দেশে লাখ তিনেক কোটি টাকার বাজেট মোটেই পর্যাপ্ত নয়’ তাই আরো উচ্চাভিলাষী রাজস্ব আদায়ে নিকট এবং দূরের ভবিষ্যতে ব্যক্তি এবং কর্পোরেট করকে টার্গেট করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত।
আগামী অর্থবছর রাজস্ব আদায়ের যে টার্গেট তা এবারের চেয়ে ৩০.৬২ শতাংশ বেশি, টাকার অংকে ৪৫ হাজার কোটি।
কিন্তু ব্যক্তি পর্যায়ে আয়কর দিতে মানুষ কম আগ্রহী হওয়ায় আপাততঃ সরকার উৎসে কর এবং মূল্য সংযোজন কর (মূসক)-কেই আয়ের মূল উৎস করেছে। বাজেট বক্তৃতায় মন্ত্রী সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, যারা করযোগ্য আয় করেন কিন্তু কর দিচ্ছেন না তাদেরকে করের আওতায় আসতেই হবে।
তার ভাষায়: ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে কম বেশি ১২ লাখ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। কিছুদিন আগে রাজস্ব বোর্ড কয়েকটি এলাকায় জরিপ চালিয়ে অনেক স্বচ্ছল লোকের সন্ধান পেয়েছে। এদের সবার উপর এই বছর আয় বা কর্পোরেট কর ধার্য করা হবে।
যারা এই ‘ইন্টেলিজেন্স’ জরিপের আওতায় আসেননি তাদের তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলার কোনো সুযোগ নেই। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেট পেশ করে অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন: এইরকম জরিপ ভবিষ্যতে আরো চলবে এবং এইভাবে করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধির উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে।
বর্তমান সরকারের মেয়াদের শেষ বছর ২০১৮-১৯ সালে সক্রিয় করদাতার সংখ্যা ৩০ লাখে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনাও আছে। সঙ্গে উৎসে আয়করের ব্যবস্থাও থাকবে। কারণ, অর্থমন্ত্রী নিজেই জানিয়েছেন, এখনও উৎসে আয়কর থেকেই আয়করের সিংহভাগ আদায় হয়।
উৎসে আয়কর নেওয়ার জন্য একটি স্বতন্ত্র কর অঞ্চল গঠনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। বিষয়টি ‘সহজ করতে’ তিনি ক্ষেত্রভেদে হার নির্দিষ্ট করাসহ সেবাখাতে উৎসে কর পরিধি সম্প্রসারণের প্রস্তাবও করেছেন।
আবার আয়ের করমুক্ত সীমা দু’ লাখ ২০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে আড়াই লাখ টাকা করা হলেও মাসে ৫০ হাজার টাকার বেশি আয় করা মানুষ উচ্চ করের আওতায়ই থেকে যাচ্ছেন যেখানে উচ্চবিত্ত মানুষ থাকছেন তুলনামূলক কম করের আওতায়।
বাজেট প্রস্তাব অনুযায়ী, বছরে চার লাখ টাকা পর্যন্ত আয়ের মানুষ ১০ শতাংশ, পাঁচ লাখ টাকা আয়ে ১৫ শতাংশ এবং ছয় লাখ টাকা পর্যন্ত আয়ে ২০ শতাংশ কর দেবেন। কিন্তু ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত আয়ে ২৫ শতাংশ এবং এরচেয়ে বেশি আয়ে কর দিতে হবে ৩০ শতাংশ।
পাশাপাশি কোম্পানি করদাতার বাইরে সিটি কর্পোরেশনে ব্যক্তি পর্যায়ে তিন হাজার, জেলা সদরে দু’ হাজার এবং অন্য এলাকায় এক হাজার টাকার ন্যূনতম করের যে বিধান ছিলো তাকে অঞ্চলভেদে করা হয়েছে সর্বনিম্ন চার হাজার টাকা।
আগামী অর্থবছর আয়কর এবং কর্পোরেট ট্যাক্স থেকে সরকার সর্বোচ্চ ৬৫ হাজার ৯৩২ কোটি টাকা আদায় করবে। এরপরই মূসক থেকে ৪৪ হাজার ১৫৯ কোটি টাকা আদায়ের যে টার্গেট সেটাও সাধারণ মানুষ বিশেষ করে মধ্যবিত্তই দেবে মূসক হিসেবে।
রাজস্ব বোর্ডকে শক্তিশালী আর কর্মকর্তাদের দক্ষতা বাড়িয়ে রাজস্ব আদায়ে মূসকের পরিধি বাড়ানোর প্রভাব মধ্যবিত্ত অনেক ক্ষেত্রেই টের পাবে ধীরে ধীরে। তবে কিছু জায়গায় সেটা বোঝা যাবে প্রথমদিন থেকেই।
এরকম একটি জায়গা সুপার শপ যেখানে ব্যবসায়ী পর্যায়ে মূসক দু’ শতাংশ থেকে চার শতাংশ করায় ঘুরেফিরে এর প্রভাব পড়বে ভোক্তাদের উপর। যে ফার্মের মুরগি আর ডিমের দামও বাড়বে, কেউ যদি সুপার শপ থেকে তা না কিনে পাড়ার মুদি দোকান থেকে কিনতে চান সেখানেও পড়তে পারে বাজেটে প্রস্তাবিত মূসকের প্রভাব। কারণ দোকানিদের জন্য মূসক বেড়ে যাচ্ছে ২০ থেকে ৭৫ শতাংশ।
সুপার শপ বা মুদি দোকানের বদলে অনলাইনে কেনাকাটা করতে চাইলেও বাড়তি টাকা গুণতে হতে পারে। কারণ অনলাইন বিক্রয় বা সরবরাহ প্রতিষ্ঠানের ওপর চার শতাংশ হারে মূসক প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী।
মধ্যবিত্তের শখ বা সঞ্চয় যেটাই হোক, স্বর্ণের দামের সঙ্গে যোগ হয়ে যাবে স্বর্ণকারের ওপর বাড়ানো দু’ শতাংশ মূসক কিংবা সেবার ক্ষেত্রে বাড়া এক শতাংশ মূসক।
আবার ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া সন্তানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাড়ে সাত শতাংশ ভ্যাট ছিলো। এখন বড়টি যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে সেখানে বসছে ১০ শতাংশ।
তবে সরকার যে মধ্যবিত্তকে গাড়ি-বাড়িসহ আসল মধ্যবিত্ত হিসেবে গড়ে তুলতে চায় তার প্রমাণ অর্থমন্ত্রী রেখেছেন ১,৬০০ বর্গফুট পর্যন্ত ফ্ল্যাটের দামে মূসক কমিয়ে আর গাড়ি শিল্প স্থাপনে কর অবকাশ সুবিধা ঘোষণা করে।






