১৪ ফেব্রুয়ারি ‘বিশ্ব ভালোবাসা দিবস’ বা ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’, একই তারিখ আবার ‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’ও। এদিন নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া আছে আমাদের। একদিকে তারুণ্যের উচ্ছলতায় রঙিন দিন, অপর দিকে আছে করুণ ও প্রাণ হারানোর ইতিহাস। প্রথম তারিখটি ব্যক্তিগতভাবে নানা আয়োজনে উদযাপন হলেও পরের দিনটি এখনও থেকে গেছে গণমাধ্যম আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এ হারিয়ে যাওয়া মূলত প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর ব্যর্থতা ও স্বৈরাচার পরবর্তী শাসকদের খামখেয়ালিপনায়।
বিশ্ব ভালোবাসা দিবস আর স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবসের এই উদযাপন আর পালনের ইতিহাস আমাদের দীর্ঘ নয়। বয়স যথাক্রমে ২৫ আর ৩৫! ভালোবাসা দিবস বাংলাদেশে আমদানি হয়েছে সাংবাদিক শফিক রেহমানের সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘যায়যায়দিন’-এর হাত ধরে আর স্বৈরাচার প্রতিরোধের আহবান এসেছে রক্তের আঁকরে। তবে এই কম বয়েসি আয়োজন তারুণ্য গ্রহণ করেছে প্রবল উচ্ছ্বাসে, আর উচ্ছ্বাস-উদযাপনে আড়াল হয়েছে রক্তের রঙ-আত্মদান।
এদিকে এ দুই দিবসের মধ্যেও আছে আবার হাহাকার, বেদনা আর আত্মদানের ইতিহাস। ভালোবাসা দিবস ভালোবাসার স্বীকৃতি প্রাপ্তিতে হয়েছে মহীয়ান; স্বৈরাচার প্রতিরোধের সে দিবসটি ঠিক সেভাবে সফল হয়নি। জয়নাল-দীপালিদের প্রাণ বিসর্জনেও স্বৈরাচার চিরতরে নিশ্চিহ্ন হয়নি; জেঁকে বসেছে রন্ধ্রে রন্ধ্রে, এমুখ-ওমুখ হয়ে। আপাতদৃষ্ট স্বৈর চরিত্র নিরীহ প্রাণ-রূপ ধারণ করেও ভাব-অঙ্গনে গেঁড়ে বসেছে স্থায়ী আসন, সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে।
পেছন ফিরে তাকালে দেখা যায়, লে. জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এক সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা দখলের পর সামরিক সরকারের শিক্ষামন্ত্রী মজিদ খান নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন খর্ব ও রেজাল্ট খারাপ হলেও যারা ৫০ শতাংশ শিক্ষার ব্যয়ভার দিতে সমর্থ তাদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয় শিক্ষানীতিতে। শিক্ষামন্ত্রীর ওই নীতি প্রবল বিরোধিতার মুখে পড়ে। বরাবরের মত সেটা প্রত্যাখ্যান করে বামপন্থি ছাত্রসংগঠনগুলো। সরকারের ওই নীতির কবলে পড়ে দরিদ্র পরিবার থেকে ওঠে আসা শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হতে পারে বলে ছাত্ররা অভিযোগ করে। ১৯৮২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর শিক্ষা দিবসে এই শিক্ষানীতি বাতিলের দাবিতে ছাত্র সংগঠনগুলো ঐকমত্যে পৌঁছে।
ছাত্ররা ওই সময় তিনদফা দাবিতে কর্মসূচি শুরু করে। এই দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে- “গণবিরোধী শিক্ষানীতি প্রত্যাহার; সকল ছাত্র বন্দিদের মুক্তি ও দমননীতি বন্ধ; গণতন্ত্র ও মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা”। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি তারিখে ছাত্র জমায়েত ও সচিবালয় অভিমুখে বিক্ষোভ মিছিল আর অবস্থান কর্মসূচির ঘোষণা করে। পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী হাজারও শিক্ষার্থীদের মিছিল হাই কোর্টের গেটের সামনে ব্যারিকেডের মুখে পড়লে সেখানেই ছাত্রনেতারা বক্তৃতা শুরু করেন। ওই সময় সামরিক সরকারের পুলিশ বাহিনী বিনা উসকানিতে রায়ট কার ঢুকিয়ে দিয়ে রঙিন গরম পানি ছিটাতে থাকে, বেধড়ক লাঠিচার্জ, ইট-পাটকেল ও বেপরোয়া গুলি ছুড়তে শুরু করে। গুলিবিদ্ধ হন জয়নাল-দীপালি সহ অনেকেই। এরপর গুলিবিদ্ধ জয়নালকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে খুন করা হয়। দীপালির লাশ গুম করে ফেলে পুলিশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ হতাহতদের এ্যাম্বুলেন্স পাঠিয়ে নিয়ে যেতে চাইলে ঘটনাস্থলে ঢুকতে দেয়নি পুলিশ। ওই দিনই নিহত হয়েছিলেন জয়নাল, জাফর, কাঞ্চন, দীপালিসহ আরও অনেকে। সরকারি হিসাবেই গ্রেপ্তার করা হয় ১,৩৩১ জনকে, প্রকৃত সে সংখ্যা ছিল আরও বেশি।
শিক্ষার্থীদের ওই আন্দোলন রক্তে ভাসলেও ব্যর্থ হয়নি, একটা সময়ে ধারাবাহিক রাজনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরাচার এরশাদ ক্ষমতা ছাড়লেও স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস হারিয়ে গেছে অনেকটাই। গণমানুষের কাছে এই আন্দোলন পৌঁছায়নি খুব একটা, অথচ এটা ছিল ভাষা আন্দোলনের পর সবচেয়ে বড় ছাত্র আন্দোলন। স্বৈরাচার প্রতিরোধের সে দিনটি হারিয়ে গেছে ছাত্র সংগঠন ও রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতায়। স্বৈরাচার এরশাদ ক্ষমতা ছাড়লেও রাজনীতিতে তার গুরুত্বকে ধরে রেখেছেন পুরোপুরি।
১৪ ফেব্রুয়ারি যেদিনটি বেদনাবিধূর রক্ত-গঙার, সেদিনই আবার ভালোবাসা দিবস হিসেবে বিশ্বের অনেক দেশের মত আমাদের দেশেও পালিত হচ্ছে। ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশের মানুষের কাছে, বলতে গেলে ‘দিনের পর দিন’ কলামে ‘মিলা ও মইনের’ টেলি-কথোপকথনের মাধ্যমেই আবির্ভাব। ভালোবাসায় বুভুক্ষু মানুষজন দিনটাকে তাই গ্রহণ করেছে ক্রমে, এখন সে প্রভাবও বিশাল। দিন দিন এ ভালোবাসা দিবস পালনের সংস্কৃতিটা বাংলাদেশের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের মাঝে সঞ্চারিত হচ্ছে।
অনেকেই অভিযোগ করে থাকেন শফিক রেহমানের ভালোবাসা দিবসের আমদানি বাংলাদেশের মানুষকে স্বৈরাচার প্রতিরোধের স্মৃতি ভুলিয়ে দেওয়ার জন্যে, কিন্তু আমার মনে হয় এধরনের অভিযোগ যৌক্তিক নয়। সাংবাদিক শফিক রেহমান তার লেখার অথবা ব্যবসায়িক প্রয়োজনে দেশে-দেশে প্রচলিত দিনটিকে আমাদের দেশে নিয়ে এসেছেন; তারুণ্যও গ্রহণ করেছে সেটা নির্দ্বিধায়। আজকের বাংলাদেশের ভালোবাসা দিবসের যে উচ্ছ্বাস-আনন্দ আর উদযাপনের চিত্র দেখা যায়, আজ থেকে ২৫ বছর আগে সেটা সম্ভব ছিল না। এখন সকল ক্ষেত্রে বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অগ্রগামিতার এই সময়ে ভালোবাসা দিবসটা তাই বর্ণিল।
ভালোবাসা দিবসের উচ্ছ্বাসের এই খবরের বিপরিতে আমাদের এ সমাজেও আছে অন্য এক চিত্র। বাংলাদেশের এক শ্রেণির লোক ধর্মের নামে এধরনের দিবস সহ আরও কিছু আয়োজনে বাধা দিতে মরিয়া, তারা সমানে এসবের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়ে আসছে। ধর্মীয় গোঁড়ামি আর পিছিয়ে থাকা মানসিকতা চাপিয়ে দিতে চায় তাদের অনেকেই। ভালোবাসা দিবসের নানামুখী আয়োজন তাদের পেছন থেকে টানার সেই প্রবণতার গালে বিশাল এক চপোটাঘাত।
অদ্যকার অনেকেই ১৪ ফেব্রুয়ারি তারিখ এলেই ভালোবাসা দিবস আর স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবসের আলোচনা টানতে গিয়ে মুখোমুখি অবস্থানে চলে যান, কিন্তু এটা অনুচিত। এ দুই ঘটনার ইতিহাস ভিন্ন, প্রেক্ষাপটও আলাদা। তাই এগুলোকে মুখোমুখি অবস্থায় নিয়ে আসার মধ্যে বাহাদুরি নেই। যে যার মত দিনটি উদযাপন করুক, সে স্বাধীনতাও আছে তার। আমাদের যেমন উচিত দেশে সংঘটিত লোমহর্ষক সেই ঘটনার বহুল প্রচার ও স্বৈরাচার এরশাদ সহ যেকোন স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে জনগণকে সচেতন করে তোলা, একইভাবে যে ভালোবাসা দিবস গোঁড়া সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন মানুষদের বিরোধিতার মুখে পড়েছে সেটাকে সুস্থভাবে পরিচালনা করা।
স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস পালন না করে কেবল ভালোবাসা দিবস পালনে ব্যস্ত থাকলে অনেকেই সংশ্লিষ্টজনদের প্রগতিশীল-গণতান্ত্রিক ভাবতে রাজি হন না। আবার ভালোবাসা দিবস পালন না করলে অনেকেই অন্যকে আধুনিক মানতে রাজি হন না- এধরনের প্রবণতা আমাদের অনেকের মধ্যে রয়েছে। এ থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। যে যার মত দিবস পালন করুক; অন্যদের প্রতি আমাদের সেই শ্রদ্ধাবোধ থাকা জরুরি।
সামরিক শাসন থেকে বাংলাদেশ গণতন্ত্রে ফিরেছে। স্বৈরশাসক এরশাদ ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন, তবু তিনি আছেন রাজনীতিতে। এখন আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো আয়োজন করে নূর হোসেন দিবস, স্বৈরাচার পতন দিবস পালন করে না। অনেকটাই চুপিসারে চলে যায় দিনগুলো। তার ওপর প্রায় অনালোচিত স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস পালন হওয়াটাই চিন্তার বাড়াবাড়ি। ঘটা করে দিবসটি পালন না হলেও এই সময়ে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দিবসটি নিয়ে আলোচনা হয় কিছুটা। তবে সেই আলোচনা ভালোবাসা দিবসের আলোচনার চাইতে নিতান্ত দুর্বল।
এমন অবস্থায় ‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’ আর ‘ভালোবাসা দিবস’- এদুইকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া উচিত হবে না। দুই আয়োজন চলুক নিজস্ব গতিতে, যে যার ইচ্ছায় পালন করুক নিজস্বতায়।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








