আকাশে কালো মেঘ দেখে বুঝে নেওয়া যায় বজ্রপাত হবার সম্ভাবনা। তারপরও হতাহতের ঘটনা অনেকাংশেই এড়ানো সম্ভব হয়না। বজ্রপাত কোথায় হবে সে তথ্য কেউ না দিতে পারলেও আমরা ধরে নেই অপেক্ষাকৃত খোলা জায়গাতেই বজ্রপাত বেশি হয়।
কিন্তু ভূমিকম্পের বেলায় আগেভাগে পূর্বাভাস দেওয়ার কোন প্রযুক্তি আজও আবিস্কৃত হয়নি। তবে ভূমিকম্প ঘটে গেলে তার থেকে জানমাল যতটা সম্ভব রক্ষা করা যায় সে সম্পর্কে প্রচুর গবেষণা হয়েছে।
যদি ধরি ঢাকা শহরে রিখটার স্কেলে ৮/৯ মাত্রার ভূমিকম্প হয় সেক্ষেত্রে এই শহরের কী হতে পারে?
১. টেলিযোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাবে।
২. রাস্তা ঘাট ধসে তার উপর লাইট পোস্ট পড়ে গাড়ি চলাচল বন্ধ হবে।
৩. রাস্তার নিচে বিছানো গ্যাস ও পানির লাইন ফেটে উপরে উঠে এসে তাতে বিদ্যুতের কেবল পড়ে আগুন ধরে যাবে।
৪. বিল্ডিং এর গ্লাস চুর্ণ বিচুর্ণ হয়ে উড়ে এসে নীচে পড়বে। বিলবোর্ড ধসে পড়বে।
৫. রাস্তায় থাকা সমস্ত যানবাহন জ্যামে আটকা পড়বে। ফ্লাইওভারগুলো টিকে থাকবে কিনা প্রশ্ন থেকে যায়।
৬. বিদ্যুৎ ও ফোন সংযোগ থাকবে না। মোবাইল ফোনের টাওয়ার ধসে পড়ে অথবা নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে মোবাইল সংযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।
৭. আগুন নেভানোর জন্য পানি পাওয়া যাবে না। ফায়ার সার্ভিস রাস্তা না থাকার কারণে পৌঁছাতে পারবে না।
একই সাথে পুরো শহর আক্রান্ত হওয়ায় কারো সাহায্যে কেউ এগিয়ে আসতে পারবে না। তাই ভূমিকম্প এবং তার পরবর্তী ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেতে নিজেকেই সচেতন হতে হবে। পরিবারসহ পাড়া মহল্লায় কমিটি করে নিজেদের ভিতর তথ্য আদান প্রদানের মাধ্যমে করণীয় সমন্ধে ঠিক করে নিতে হবে আগে থেকেই। মনে রাখতে হবে ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয় আগুনে।
ভূমিকম্প অনুভূত হলে শহরে বসবাসকারি প্রতিটি পরিবারের একান্ত জরুরি করণীয়।
১. গ্যাসের চুলা বন্ধ করতে হবে এবং বিল্ডিং এর মেইন গ্যাস লাইন বন্ধ করে দিতে হবে।
২. অবস্থা বুঝে বিদ্যুতের মেইন সুইচ বন্ধ করতে হবে। লিফট থাকলে তার সুইচও বন্ধ করতে হবে।
৩. বাসার সদর দরজাসহ সবগুলো দরজা খুলে রাখতে হবে কারণ যখন কম্পন হয় বিল্ডিং নড়ে কাঠামো বাকা হয়ে দরজা আটকে যেতে পারে।
৪. ঘর থেকে বেরুনোর সময় অবশ্যই মাথার বালিশ নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে হবে। কোন অবস্থাতেই লিফট ব্যবহার করা যাবে না। যদি ঘর নিরাপদ মনে হয়, তবে রাস্তায় না নেমে ঘরেই নিরাপদে থাকতে হবে, ছাদে নয়।
৫. আশেপাশে কোন খালি জায়গা মাঠ, কমিউনিটি সেন্টার, স্কুল, মসজিদ থাকলে সেখানে, আশ্রয় নিতে হবে।
৬. নিজের এবং পরিবারের নিরাপত্তার জন্য টর্চ লাইট, রেডিও, শুকনো খাবার প্রয়োজনীয় জিনিস প্রস্তুত রাখতে হবে।
৭. কম্পন শুরু হলে আতংকিত না হয়ে বালিশ মাথায় দিয়ে ওয়ালের সাথে বিল্ডিংয়ের বিমের নিচে দাঁড়াতে হবে। ধুলা শ্বাসনালিতে যতটা না যায় খেয়াল রাখতে হবে।
৮. ঘরে একজনের নেতৃত্ব গ্রহণ করতে হবে। তার নির্দেশ অনুযায়ী চলতে হবে, তিনিই পরিবারের সকলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন।
ভূমিকম্পের সময় আরো একটি বিপর্যয় আসে, তা হলো সুনামি। সুনামি জাপানি শব্দ বাংলা অর্থ (টেনে নেওয়া ঢেউ)। যদি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল সমুদ্রের তলদেশে হয় তখনই এই ঢেউ ফুলে ফেপে উপকুলীয় এলাকায় প্রবেশ করে সবকিছু টেনে নিয়ে যায়। অবশ্য গবেষকরা আগেই জানিয়েছেন, ঢাকা শহরে সুনামি আসার তেমন সম্ভাবনা নেই। কম্পন শুরু হলে এর স্থায়িত্ব থাকে এক থেকে তিন মিনিট। অনেক সময় ছোট ছোট কম্পন হয়ে ভীত দুর্বল করে দেয়, পরে মাঝারি বা বড় একটি কম্পন হলে সব ধসে পড়ে।
ধসে পরা দুই ধরনের হয়:
১. খাড়াভাবে বসে পড়ে জায়গায় দেবে যাওয়া
২. এদিক সেদিক হেলে পড়া।
রাষ্ট্রের করণীয়
প্রত্যেক এলাকার স্কুল, কর্পোরেট অফিস, এপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষে দীর্ঘমেয়াদি ক্যাম্পেইন চালু রেখে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। যেহেতু আমাদের দেশের সরকারি স্কুল বা প্রতিষ্ঠানগুলো কাঠামোগতভাবে দুর্বল, সে ক্ষেত্রে প্রত্যেক মসজিদে বয়ানসহ ঐ এলাকার যোগাযোগের মাধ্যমে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে মসজিদকেই গড়ে তুলতে হবে। প্রস্তুত রাখতে হবে সোলার বা ব্যাটারি চালিত লাইট, রেডিও, বালিশ, পানি, শুকনা খাবার। একমাত্র সাবধানতাই পারে ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে জান মালের রক্ষা করতে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







