ছোট বেলায় শিক্ষকেরা বলতেন ‘ভুল’ লিখিতে ‘ভুল’ করিওনা। অর্থাৎ ভুল শব্দটি ‘দীর্ঘ-উকার’ দিয়ে যেন না লিখি। তা ভুল বানানটি জীবনে কখনো ভুল হয়নি শিক্ষকের ঐ বুদ্ধিদীপ্ত সতর্কবাণী দেওয়ার ফলেই।
বন্ধুবর মাহফুজ আনাম। ডাক নাম টিটো। জানিনা ‘বন্ধু’ বলাতে না আবার রেগেমেগে যান। বঙ্গদেশে জন্মসূত্রেই অভিজাত পংক্তিভুক্ত। ‘ভাই বলে ডাকো যদি গলা দেবো টিপে’ মার্কা প্রতিক্রিয়া তার হলেও হতে পারে। মাঝে একবার মাহফুজ আনামের সঙ্গে কথার ছলে তাকে ‘টাইকুন’ এবং নিজেকে যথার্থ ‘উঁকুন’ বলেই অভিধা দিয়েছিলাম।
১৯৬৫ সনে আমরা একসাথে মাধ্যমিক উত্তীর্ণ হয়েছিলাম। ওরা গ্রেগোরিয়ান, ইংরেজিতে হেভিওয়েট। আমরা লাইটওয়েট। নটরডেম কলেজ থেকে টিটো এলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমরা বাদবাকী ননগ্রেগোরিয়ান অনেকেই ঢাকা কলেজের পথ ধরে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে টিটো ‘তারকা ব্যক্তিত্ব’ হয়ে গেলো তার বিতার্কিকতা গুণে। বিশেষত: টেলিভিশনে, আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় প্রতিযোগিতায় বিতর্কশিল্পে টিটো ছিল অপরূপ। বিতার্কিকদের আজীবন তর্কযুদ্ধের একটা ভঙ্গিমা থেকেই যায় কথা বলার সময়। যেমন এম এম আকাশ। অকাল প্রয়াত খান মোহাম্মদ ফারাবীও তেমনটাই ছিলো।
আমাদের উচ্চশিক্ষাঙ্গন পৃথক হলেও ষাটের দশকে ছাত্র ইউনিয়ন ভুবনে এক বাতাবরণে থাকায় সাধারণ বন্ধুতায় ছেদ পড়েনি কখনো। মুগ্ধ ছিলাম ওর যুক্তি-তর্ক উপস্থাপনার শিল্পকলায়। এসে গেলো ঊনসত্তর। গণঅভ্যুত্থান। একাত্তর। মুক্তিযুদ্ধ। কে কোথায় ছিটকে গেলাম। ঢাকা থেকে চাঁদপুর। তারপর আগরতলা। ছাত্র ইউনিয়ন সূত্রে বিশেষ গেরিলাবাহিনীতে সামরিক প্রশিক্ষণ নেবার সুযোগ পেলাম।
ধানমন্ডিতে একই সড়কে প্রতিবেশী ছিল মাহফুজ আনাম টিটো এবং শহীদ নিজামুদ্দিন আজাদ। বিশেষ গেরিলা বাহিনী জীবনে নিজামুদ্দিন আজাদের সঙ্গে একাত্তরের জুলাই থেকে নভেম্বর একসাথে থাকার সুযোগ হয়েছিলো। শুনেছিলাম টিটো করাচী না লন্ডন কোথায় চলে গেছে। একদিন নিজামুদ্দিন আজাদ হঠাৎ একটি চিঠি দেখালো আমাকে। মাহফুজ আনাম টিটোর লেখা। আজাদ যে সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধায় পরিণত হয়ে জীবন উৎসর্গের ব্রতে এগিয়ে গেছে, টিটো তাতে তার অন্তরের শুভকামনা ব্যক্ত করেছে।
টিটো কোথায়, এ প্রশ্নের জবাবে আজাদ বললো, কোলকাতায়, মুক্তিযুদ্ধের কাজেই আছে। কিছুকাল পর গেরিলা যুদ্ধের জন্য দেশে প্রবেশ করতে গিয়ে আজাদ শত্রু পক্ষের হাতে ধরা পড়লো, শত্রুর দল তাকে ফেনী নিয়ে গেলো, তার আর খোঁজ মেলেনি আজো। তার অন্তিম ব্যাগের ভিতর মাহফুজ আনাম টিটোর সেই চিঠিটিও ছিলো। সেটিও চিরতরে হারিয়ে গেছে।
মুক্তিযুদ্ধ শেষে স্বাধীন দেশে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ কামরুদ্দিন আহমেদ পরিণত হলেন শহীদ জনকে, তাঁর ছোট ছেলে নিজামুদ্দিন আজাদ বেতিয়ারা যুদ্ধে প্রাণ দিয়েছে। প্রতিবেশী টিটোর পিতা স্বনামধন্য আবুল মনসুর আহমেদ তাত্ত্বিক অবস্থানে অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদ প্রশ্নে স্বতন্ত্র অবস্থান নিলেন। মুসলমান অধ্যূষিত বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু অনুসৃত নীতি বৈশিষ্ট্যের পথরেখায় আব্দুল মনসুর আহমেদের সায় ছিলোনা।
বস্তুতঃ আবুল মনসুর আহমেদ-বর্গ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্ব পছন্দ করেননি কখনো। গৃহের রাজনৈতিক আলো-হাওয়া টিটোকেও মুজিব পরিবারকে ‘আমল’ না দেবার ধাঁচেই বড় করেছে। শেখ হাসিনার সাথে মাহফুজ আনামের ব্যবধানের মৌলিক পটভূমি কার্যতঃ এখানেই।স্বাধীনতার পর মাহফুজ আনাম টিটো জাতিসংঘের শিক্ষা-বিজ্ঞান-সংস্কৃতি অঙ্গনে বড় দায়িত্ব নিয়ে চলে গেলেন পৃথিবী সেবার ব্রত নিয়ে। অমন তারকা-বৈশিষ্ট্যের আমাদের টিটো এভাবে বাংলাদেশ-ছাড়া হয়ে যাওয়ায় একসময় বেশ হতাশাও বোধ করেছি।
আমরা অনেকেই তখন সাম্যময় পৃথিবী রচনার অংশ হিসাবে বাংলাদেশ প্রান্তরে বিপ্লবের জমিন উপযুক্ত করে তোলার ব্রতে নানাভাবে আত্মনিয়োজিত ছিলাম। যুগোশ্লাভিয়ার মহান নেতা জোশেফ ব্রজ টিটোর উত্থানের সময় নিশ্চয়ই পিতা আবুল মনসুর আহমেদ তার পুত্রের নাম টিটো রাখার ভিতরে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ভ‚খন্ডের একজন ত্রাতা-নেতার স্বপ্নবীজও পুঁতে রেখেছিলেন। সেই টিটো স্বাধীনতার পর উড়াল দিলো বিশ্বপ্রাঙ্গণে।
তারপর বেশ কিছুকাল পর হঠাৎ জাতিসংঘের দায়িত্ব ছেড়ে দেশে ফিরে এলো টিটো একটি সম্ভ্রান্ত ইংরেজি পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোক্তা হিসাবে। খ্যাতনামা সাংবাদিক এস এম আলী ছিলেন ঐ পত্রিকাটির দুর্দান্ত সম্পাদক। বহুকাল পর টিটো দেশে প্রবেশ করলেন সুউচ্চ সুড়ঙ্গ দিয়ে। এস এম আলীর হঠাৎ তিরোধানে ‘মাহফুজ আনাম’ আবির্ভূত হলেন একজন উচ্চমার্গের উপরতলার সম্পাদক ব্যক্তিত্ব হিসাবে। পত্রিকা প্রকাশনার মান উঁচু। সাংবাদিকতার নীতিমালা রক্ষা, দর্শন ধারী এবং বিষয়বস্তুতে পত্রিকাটি দেশ-বিদেশের উঁচুতলার কাছে, ইংরেজি জানা মধ্যবিত্তের অনেকের কাছে বেশ সমাদৃত হলো।
যদিও একটি বিশিষ্ট ব্যবসায়ী গ্রুপের প্রযোজনাতেই পত্রিকাটির অভ্যুদয়। এ ব্যবসায়ী গ্রুপের স্বার্থবিরোধী কোন লেখা আজো ঐ পত্রিকায় মুদ্রিত হতে পারেনি।এদিকে মাহফুজ আনামের ছাত্রাবস্থার রাজনৈতিক উর্ধতন মতিউর রহমান ‘চে গুয়েভারার’ বিদ্রোহী সত্ত্বার পতাকা উড্ডীন করে তারই পরম যত্ন-মমতা-অভিনিবেশ ও পরিশ্রমে সৃষ্ট ‘ভোরের কাগজ’ পত্রিকাটির মেরুদন্ডে জোরেশোরে আঘাত হানলেন। মাহফুজ আনামের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে মতিউর রহমান প্রকাশ করলেন চিত্তাকর্ষক ‘প্রথম আলো’।
অতঃপর দু’জনেই ক্রমশঃ পরিণত হতে থাকলেন মিডিয়া টাইকুনে। দু’জনেই মুক্ত চিন্তা, মুক্ত অভিমত, সমাজের সর্বত্র (হাসিনা-খালেদার দলীয় সকল স্তরসহ) গণতন্ত্রায়ণের জন্য একথা-ওকথা-সে কথায় দেশ ভরপুর করে দিলেন। প্রতিটি কথাই সুন্দরবনের খাঁটি মধুর মতো।
অবশ্য দু’জনেরই নিকটমহলের কাছে শুনেছি, দু’টি পত্রিকাই বলতে গেলে একনায়কত্বমূলক আবহে, দাপুটে বাতাবরণেই এগিয়ে চলেছে।এইটুকুতে আর এমন কি ক্ষতি! বাংলাদেশে পুঁজির সকল ব্যবসাগৃহই বলতে গেলে সামন্ত ঘরাণার। ডান-বাম ঘরানার সকল রাজনৈতিক দলই কমবেশি কার্যতঃ সামন্ত রসায়নে সিক্ত। এই দু’জন অতি সফল মিডিয়া টাইকুন কিছুকালের ভিতর এক নম্বর বিশ্ব মাতব্বরের নজরে পড়ে গেলো।
বাংলাদেশে বঙ্গোপসাগরে একটা গভীরসমুদ্রবন্দর হবার কথা। বিশ্ব মাতব্বর দেশটির নিরাপত্তার প্রশ্নটি বড়ই ‘স্পর্শকাতরতার’; গভীর সমুদ্রবন্দরের নামে একটি বড়সড় সামরিক ঘাঁটি তাদের চাই-ই চাই। অতএব তাদের চাই বাংলাদেশের রাজনীতিতে, সমাজের নানা মহলে দোর্দন্ড প্রতাপ। অতঃপর তাদের দাবার ছকের ঘুঁটি হিসাবে স্থান হলো দুই মিডিয়া টাইকুনেরও। অনেক কায়দা কৌশল করে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এলেন ১৯৯৬ সনে। বিশ্ব মাতব্বরদের সঙ্গে এক পর্যায়ে শেখ হাসিনার বনিবনা হলোনা।
অতএব ২০০১-এ কোনোভাবেই যেন শেখ হাসিনা ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন করতে না পারে, সেজন্য সমাজের নানা অংশের সাথে এই মিডিয়া টাইকুনরাও যুক্ত হলো। সে সময়ে রাষ্ট্রপতি-তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান আর নির্বাচন কমিশন প্রধান একজোট হয়ে গেলো। প্রধান বিশ্ব মাতব্বরের সাথে ইউরোপ আর বিরাট প্রতিবেশী এক হয়ে গেলো, শেখ হাসিনার ক্ষমতায় ফিরে আসার সব পথ অবরুদ্ধ করে দেয়া হলো।
এলো খালেদা এবং যুদ্ধাপরাধীরা একযোগে ক্ষমতায়। দেশে চললো পরিকল্পিত ভয়ংকর নৃশংস সাম্প্রদায়িক নির্যাতন ও ধ্বংসলীলা। তখন হায়রে চিরকাল অসাম্প্রদায়িকতার বিশাল পতাকা উত্তোলনকারী ব্যক্তিত্বের সম্পাদনায় প্রকাশিত প্রধান আলোকিত পত্রিকাটির বিবেক একেবারে পৃথিবীর বৃহত্তম তালা দিয়ে বন্ধ রাখা হলো। ইংরেজি তারকা পত্রিকাটি কিছুটা আহা উহু করলো বটে। এই পর্যায় পর্যন্ত মিডিয়া টাইকুনরা বিশ্ব মাতব্বরের অনুচর হয়েই রইলো।তখন অনেক বড় রোডম্যাপ হয়ে গেলো। হাসিনাকে পচানো গেছে। খালেদাকে অবাধে চলতে দাও। খালেদাও পচবেই। অতঃপর দু’জনকেই মাইনাস করে দাও। তাহলে প্লাস হবে কে? এই সুশীল প্লাসে যোগ হলো একদল মহাচিন্তাবিদ, গবেষক, অর্থনীতিবিদ এবং বিশ্ব মাতব্বরদের আসল খুঁটি সেনাদূর্গ নেতৃত্ব।
খালেদা আর হাসিনা ধূম যুদ্ধ লাগিয়ে দাও। প্রবল হাসিনাবিরোধী ড. কামালকেও হাসিনার সঙ্গে এক মঞ্চে তুলে দিয়ে দু’পক্ষের বিরোধ তুঙ্গে তুলে দেবার আয়োজন হলো। ডুগডুগি বাজাবার মিডিয়াও তুমুল সক্রিয় হলো। ‘লগি বৈঠার’ সেই হত্যাযজ্ঞে যে সেনাদূর্গের ওস্তাদদের অনুচরবাহিনী যোগ দিয়েছিলো পরে তা জানাজানিও হলো। নানা নাটকের শেষে দুই নেত্রী মাইনাসের জরুরি অবস্থা জারি হলো। তখন বিশ্ব শান্তিমহানকে সামনে রেখে জরুরি অবস্থার নামে দশ বছরের ‘সুশীল-জাহিলিয়াত’ শাসন কায়েমের পাঁয়তারা চললো।
কিন্তু বিশ্বশান্তিজনাবের কাছে ফাঁকতালে প্রধান উপদেষ্টা হবার প্রস্তাব ‘নিতান্ত ছোট’ মনে হলো। সেই শান্তিদূত আলোকিত সম্পাদকের মাধ্যমে জানালেন ওখানে ফখরুদ্দিনকে দাও। আমি দল গড়ে বৃহত্তম দল প্রধান হিসাবেই নির্বাচিত হয়ে দেশ চালাবো। সেই দলটির সম্ভাব্য সাধারণ সম্পাদক হিসাবে মাহফুজ আনামের নাম ছড়িয়ে পড়লো হেথা সেথা। কিন্তু ‘হঠাৎ ডিজিটাল’ নাগরিক পার্টিটি গোড়া থেকেই জমে উঠলো না, শান্তিমহানের অনুজ গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞতো ডিজিটাল-ঘরাণায় দলের কাজ চালাতে গিয়ে গলদঘর্ম-নাজুক চর্ম হয়ে একশেষ হলো। অতঃপর শান্তিমহান জনাব দেশনায়ক হবার পাঁয়তারায় ক্ষ্যামা দিতে বাধ্য হলো।
এই ‘দেশনায়ককে’ দেশের একমাত্র বিকল্প হিসাবে ভাবমূর্তি গড়ে তোলার বিশ্ব মাতব্বরদের কায়কারবারে মাহফুজ আনাম এক পৃষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুর বিশাল ছবি দিয়ে স্বাধীনতার মহানায়ক এবং অপর পাশের পৃষ্ঠায় শান্তি নায়কের একই আকারের ছবি দিয়ে দেশের স্বাধীনতার পরের মুক্তিদাতা হিসাবে বিশেষ আয়োজনে তুলে ধরা হয়েছিলো।জরুরি অবস্থায় শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়াকে কারাবন্দী করার জন্য বিষাক্ত প্রচারনা-পরিবেশ গড়ে তোলার কৌশলে সেনাদূর্গ নেতৃত্ব যে মিডিয়া অভিযান চালালো, তাতে যুক্ত হলো আমাদের পরম পরিচিত দুই মিডিয়া টাইকুন।
একজনতো অন্ধকার থেকে আলোর পথ দেখাতে ‘দুই নেত্রীকে সরে দাঁড়াতে হবে’ বলে নির্দেশিত মন্তব্য-বয়ান পত্রিকায় বড় হেডিং দিয়ে নামে লিখে ফেললো। আর ইংরেজি সম্ভ্রান্ত জনাব সকল নীতি-রুচি কুচিকুচি করে সেনাদূর্গ প্রেরিত প্রতিবেদন সোৎসাহে, সাগ্রহে ছাপাতে থাকলো। বন্দী হলো দুই নেত্রী। দুই নেত্রীর দলের ডাকসাঁইটে অনেকে সেনা দূর্গের সাথে হাত মেলালো। সেসময় শেখ হাসিনা আর তার বিশ্বস্ত দলসাথীদের সাথে তৃণমূলের একদল মেরুদন্ড সম্পন্ন কর্মী দৃঢ় ভূমিকা নিয়ে দল থেকে শেখ হাসিনাকে সরিয়ে দেবার অপচেষ্টা ভন্ডুল করে দিলো।
আওয়ামী কর্মীবাহিনীর সাহসী ভূমিকায় উজ্জীবিত হয়ে বিএনপি কর্মীরাও মিলে মিশে জরুরি শাসনওয়ালাদের ঘুম দিলো গুম করে। তখন মঈনুদ্দি, ইয়াজ উদ্দি, ফখরুদ্দি পরিচালিত সরকার ক্রমশঃ ‘চেরাগ আলী’ পরিস্থিতিতে উপনীত হলো। আর ‘সুশীল-সবজান্তা’দের পানে এক এগারোর বৈদেশি মহাজনেরা তাকিয়ে বললো, আপনারা কী কহিলেন, ঘটিলো কী! ততোদিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই নেত্রীর বাহিনী একত্র হয়ে তুলকালাম ঘটিয়ে দিয়েছিলো! এক-এগারোর আগে বাজার যাচাই করতে মার্কিন সরকারের দক্ষিণ এশিয়া টেবিলের একজন কুতুব যখন দূতাবাস পার্টিতে মাহফুজ আনামকে শুধিয়েছিল, দুই নেত্রীকে সরিয়ে দিলে অসুবিধা হবে না তো? মাহফুজ আনাম বলেছিলো, আবসোলিউটলি নট! পাশে ছিলেন সাবের হোসেন চৌধুরী। তিনি নিশ্চুপ ছিলেন। এসব গল্পগান-কল্পকথা নয়।
মাহফুজ আনাম সত্যনিষ্ঠ হলে নিশ্চয়ই এটা অস্বীকার করবেনা। হায়রে, কোথায় তখন স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব-মান মর্যাদা? ক্ষমতায় আরোহনের উন্মাদনায় মরীচিকার পিছনে মাহফুজ আনামেরা তখন বিভোর ধাবমান!দুই নেত্রী গ্রেফতারের পরে আমাদের মহা গণতন্ত্র সেবক ড. কামাল হোসেন সিডর দুর্গত এলাকা থেকে রাজধানীতে ফিরে বলেছিলেন, কই, সিডর এলাকায়তো কেউ দুই নেত্রীর মুক্তি দাবি করতে দেখিনি! হায়রে, সিডর বিপর্যস্ত মানুষকে নিয়ে একি অমানবিক লজ্জ্বাকর রাজনৈতিক রুগনতার কেরিকেচার!
এদিকে এক পর্যায়ে উদ্দিন-সরকারের ‘ছেড়ে দে মা’ পরিস্থিতি! দুই নেত্রীর একজনকে বেছে নিতে হলে পিঠ বাঁচাবার মোদ্দা প্রশ্নে তারা শেখ হাসিনাকেই ‘মন্দের ভালো’ হিসাবে বেছে নিলো। জনগণের বিপুল ভোটে হাসিনার বিজয়ের পথে কাঁটা না বিছানোর কৌশল তারা নিলো বিদ্যমান বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক মুরুব্বীদের পরামর্শে। বিশেষতঃ বৃহৎ প্রতিবেশী অনেক ধাক্কা ও শিক্ষা ভক্ষণ করে হাসিনা নেতৃত্ব উৎখাতের প্রকল্প থেকে অবশেষে তখনকার মতো সরে দাঁড়ালো।
এদিকে ক্ষমতাসীন হাসিনার সাথে শ্যাম চাচাদের টক্কর লেগে গেলো বিশেষতঃ বঙ্গোপসাগরে গভীর সমুদ্রবন্দর নিয়ে। বাংলাদেশ প্রশ্নে ওয়াশিংটন-দিল্লীর ফারাক ক্রমশঃ বাড়তেই থাকলো। এবার ওয়াশিংটন-ইসলামাবাদ একযোগে বাংলাদেশ প্রশ্নে এক হয়ে বিএনপি-জামায়াত শক্তিকে পাশে নিয়ে হাসিনা সরকারকে আঘাতে আঘাতে চূর্ণ বিচূর্ণ করার নব প্রকল্প বাস্তবায়নে মেতে উঠলো।
‘হাসিনা সরকারকে আঘাত হানো’এই স্লোগানে বাংলাদেশে কে কে কারা কারা নানা ছদ্মাবরণে এক হলো এবার পাঠক তা বুঝে নিন। পদ্মা সেতু হয়ে গেলে হাসিনা সরকারের ভাবমূর্তি বেড়ে যাবে, অতএব ওটার দুর্নীতি নিয়ে বিশাল হাঁক ডাক শুরু করে দাও। সশস্ত্র আঘাতের জন্য বিএনপি-জামাতের মধ্যে থেকে স্ট্রাইক ফোর্স তৈরি করো। শান্তিমহান সম্পর্কে প্রশংসা-কনসার্ট বাজিয়ে হাসিনা সরকারকে পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করো।
২০১৪-এর নির্বাচনে হাসিনাকে কোনমতেই ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা যাবে না। এই হলো অধ্যাপক মজিনার পাঠদান।ঐ মজিনা পাঠশালায় প্রাক্তন মস্কোপন্থী কোন কোন সম্পাদক, অর্থনীতিবিশ্লেষকরা লেখা পড়া করতেন, সেটা কি কারো জানার বাকী আছে? পাশাপাশি কওমী মাদ্রাসা আর জামাতের বৈরী সম্পর্ককে জোড়া লাগাতে মজিনা জগতের কোন কোন দক্ষ পুঙ্গবকে আনা হয়েছিলো সে খবরও গোপন ছিলোনা। অতএব সৃষ্ট হলো হেফাজত।
২০১৩ সনের ৫ মে ঘটানো হলো কওমী-জামায়াত রাজপথ-অভ্যুত্থান। সেসময়ে ক্ষমতায় আসীন হবার জন্য মজিনা-আদর পেয়েছিলেন কারা কারা, সেখবরওতো লুকোনো ছিলনা। হাসিনা সরকার বুদ্ধিদীপ্ত শক্ত হাতে তা সামাল দিয়েছিলো রাষ্ট্রশক্তি দিয়ে। অতঃপর বিএনপি-জামায়াতের সহিংস হিংস্র আঘাত এলো, যেন ২০১৪ সনের নির্বাচন না হতে পারে। সুশীলদের বুজরুকী জমায়েত হলো যেন নির্বাচন না হতে পারে। হাসিনা সরকার যেন ‘অসাংবিধানিক’ হয়ে পড়ে। এসকল কাজেই মাহফুজ আনামদের বেপরোয়া উদ্যোগ প্রকাশ্যেই ঘটেছে। কিছুতেই কিছু হলোনা। বৃহৎ প্রতিবেশী এবার আর শ্যাম চাচার পক্ষে নেই। যেভাবেই হোক ‘দশম জাতীয় সংসদ’ গড়ে বিএনপি-জামায়াত-মজিনা-সুশীল কুশীলদের মিলিত চক্রান্ত ভন্ডুল করে দাও।
এর কয়েকমাস পরে ডেইলি স্টার ভবনের ভাড়া করা কক্ষে একটি সেমিনারের জন্য গিয়েছিলাম আয়োজকদের একজন হিসাবে। ড. খলিকুজ্জামান ছিলেন ঐ সেমিনারের সভাপতি। মধ্যাহ্ন আহারের সময় ড. খলিকুজ্জামান সকাশে এলেন মাহফুজ আনাম। বলে উঠলেন: আমরা সবাই মিলে হাসিনাকে সরাতে চাইলাম, তিনি বরং সবাইকে একযোগে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে দিলেন। মাহফুজ আনাম যে সাংবাদিকতার চৌকাঠ পেরিয়ে ক্ষমতা-ষড়যন্ত্রে অগ্রসেনানীর ভূমিকা পালন করে চলছিলেন, তার জন্য আর কিসের প্রমাণ প্রয়োজন!
অতএব বিশিষ্ট বিতার্কিক মাহফুজ আনাম সেদিন টকশোতে তরুণ সাংবাদিকদের নিম্ন স্বরের প্রশ্ন-অভিযোগে কেমন অস্থির হয়ে উঠলেন সামন্ত ঢেঁকুরে। বলে উঠলেন ডিজি এফ আই প্রেরিত সংবাদ ছাপিয়ে তিনি ‘ভুল’ করেছিলেন। প্রতিপক্ষকে এমন সুযোগ করে দিবেন উত্তেজনাবশে, তা তিনি ভুলেও ভাবতে পারেননি। আসলে যা যা করেছেন, ঠান্ডা মাথায় হিসাব করেই করেছিলেন এক এগারোর আগে পরে, মাহফুজ আনাম কোন প্রকার ‘ভুল’ করে যে ওসব করেছেন তা নয়। ‘ভুল’ হয়েছে তার হিসাবে। এবং ‘ভুল’ হয়েছে অধ্যাপক মজিনা মিস্টারের হিসাবেই।
অতএব ভুল হয়েছে মজিনার চ্যালা ফ্যালাদেরও।‘ইয়ে আজাদী ঝুটা হায়’ বলে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি দেশভাগের পর উপমহাদেশ জুড়েই সশস্ত্র হঠকারিতায় মত্ত হয়ে নিজেদের সংগঠন সহ সমাজের কতো যে ধ্বংস করে হঠাৎ বলেছিল, থুক্কু, ভুল করিয়াছি।এই দেশে ‘কমরেড মোহাম্মদ তোয়াহা’ একদিন গোপন অবস্থা থেকে সামরিক জেনারেল জিয়ার সঙ্গে দেখা করে এসে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিলেন, গলাকাটা রাজনীতি করে ‘ভুল’ করেছি।
হাজার হাজার ক্যাডারের জীবন বারটা বাজিয়ে তিনি হঠাৎ ভুলের ঘোষণা দিয়ে বাগিয়ে নিলেন জেনারেলের নানাবিধ ‘রসদ’।ক্ষমতা-তৃষ্ণার্ত মাহফুজ গং কোন প্রকার অনিচ্ছাকৃত ‘ভুল’ করেনি। সুযোগ পেলে ভবিষ্যতেও ক্ষমতার জন্য অতীতে যা করেছে, ভবিষ্যতেও তা-ই করবে। তাতে যতো ধ্বংসই হোকনা কেন।শুধু ‘ভুল’ বলিয়া ফেলিয়া মাহফুজ আনাম ‘ভুল’ করিয়াছে। প্রতিপক্ষতো আর হিমালয়ের প্রশান্ত ক্ষমাশীল সাধু নহে। তাহারাও বাগে পাইয়া এইবার যতটুকু সম্ভব মাহফুজ আনামদের গোত্তা খাওয়াইবে। সেক্ষেত্রেও বর্তমান ক্ষমতাসীনেরা হিসাবে কতটুকু ভুল শুদ্ধ করবে জানিনা।
তবে ‘মতামতের স্বাধীনতা’র প্রশ্ন তুলে যেসব বন্ধুরা মাহফুজ আনামের প্রতি ‘নরম-মানবিক-উদার’ অবস্থান নিয়েছেন, সেটি এক্ষেত্রে কতটুকু খাটে, বিবেচনায় নিবেন আশা করি।এতোকিছুর পরও বলছি, মাহফুজ আনাম টিটো, সারা দেশে ঘুরে ঘুরে জামিন নেবার এই কষ্ট ও বিরক্তিকর যে পরিস্থিতি, তা থেকে তোমার রেহাই মিলুক, কায়মনোবাক্যে তাই প্রার্থনা করছি।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







