কুমিল্লার কলেজ ছাত্রী সোহাগী জাহান তনু হত্যাকাণ্ডের একমাস হতে চলেছে। গণ্ডায় গণ্ডায় বক্তব্য বিবৃতি দেয়া হয়েছে সরকারের তরফ থেকে, অথচ কোনো অপরাধী গ্রেফতার হয়নি। বিচারের কোনো লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাজিমুদ্দিন সামাদ খুন হলেন এর মধ্যে, তারও কোনো বিচার নেই।
দেশজুড়ে একের পর এক হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট ঘটে চলেছে, কোনো ঘটনারই কোনো বিচার নেই। একেকটা ঘটনা ঘটে, কোনো বিচার হয় না, অপরাধীরা আশ্বস্ত হয় যে অপরাধের বিচার হবে না। নির্ভয়ে অপরাধীরা আরেকটি অপরাধ ঘটায়। আগের ঘটনাটি চাপা পড়ে যায়, এভাবে একের পর এক ঘটনায় রক্তাক্ত হয়, লুণ্ঠিত, ধর্ষিত হয় বাংলাদেশ।
কোনো একটি ঘটনা ঘটলেই সরকারের তরফ থেকে বিচার না করে ঘটনাটি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করা হয়। রিজার্ভ লুট হলে মন্ত্রী বলেন, টাকা বেড়েছে তাই লুট হয়েছে, এটা উন্নয়নের লক্ষণ! প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা বলেন, আইসিটিতে দেশ এগুচ্ছে, তাই হ্যাক করে টাকা লুট। এটাও উন্নয়নের লক্ষণ!
তনুকে ধর্ষণ করে হত্যা করা হলো, অপরাধীদের ধরার বদলে সরকারদলীয় প্রচারযন্ত্র ব্যস্ত ধর্ষণ হয়েছে কি হয়নি সেটা প্রমাণে। যেনো খুন করাটা কোনো অপরাধ নয়।
নাজিমুদ্দিন সামাদ, যে কিনা আওয়ামী লীগেরই সমর্থক, খুন হবার পরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ধর্ম নিয়ে লেখালেখি করলে তার হত্যার দায় সরকার নেবে না। অথচ রাষ্ট্রের যেকোনো নাগরিকের নিরাপত্তা বিধান সরকারের দায়িত্ব। যেখানে পুলিশ পর্যন্ত বিবৃতি দিয়েছে, সামাদের লেখালেখিতে কেবল অন্যায়ের প্রতিবাদ করা হয়েছে, ধর্ম নিয়ে সে লিখতো না, সেখানে দেশের প্রধানমন্ত্রী নাগরিকের খুনকে বৈধতা দিতে উঠেপড়ে লাগলেন!
মসজিদে ঢুকে ইমাম খুন, মুয়াজ্জিন খুন, মন্দিরের পুরোহিত, গির্জার যাজক, বিদেশি নাগরিক, লেখক-প্রকাশক খুন, কোনো হত্যাকাণ্ডেরই বিচার দূরের কথা, সরকার প্রতিটি খুনকেই নানাভাবে বৈধতা দেয়ার খেলায় মত্ত। সরকারি মদদে এভাবে অপরাধের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হচ্ছে আমাদের প্রাণের বাংলাদেশ।
একেকটি ঘটনা ঘটিয়ে একেকটি অন্যায়কে ধামাচাপা দেয়ার যে সংস্কৃতি, তার সর্বশেষ উদাহরণ সাংবাদিক শফিক রেহমানকে গ্রেফতার করা। কারণ হিসেবে একবার বলা হচ্ছে রাষ্ট্রদ্রোহিতা, একবার বলা হচ্ছে
প্রধানমন্ত্রীর পুত্র সজীব ওয়াজেদকে অপহরণের চেষ্টা। আচ্ছা, একজন লোককে যদি গ্রেফতার করতে হয়, তাহলে সাংবাদিক সেজে তার বাড়িতে ঢুকে তাকে তুলে আনার মানে কী? এটা কোন ধরণের আইনি প্রক্রিয়া?
সজীব ওয়াজেদ তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট এর বিবৃতিতে নাকি উঠে এসেছে যে, শফিক রেহমান তাকে অপহরণের চেষ্টা করেছেন। তিনি সেই বিবৃতির লিংকও দিয়েছেন। বিবৃতিটি ২০১৫ সালের। সেটি পড়ে দেখলাম, কোথাও শফিক রেহমানের নাম নেই, অপহরণের চেষ্টার কোনো উল্লেখ নেই। সেখানে আছে, একজন এফবিআই এজেন্ট এবং একজন বাংলাদেশিকে শাস্তি দেয়া হয়েছে বাংলাদেশের একজন নাগরিকের গোপন তথ্য বের করতে ঘুষ আদান-প্রদানের কারণে।
জনাব সজীব ওয়াজেদ জয়ের দেয়া লিংক এবং স্ট্যাটাস স্পষ্টতই স্ববিরোধী। জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট এর বিবৃতি জনাব জয়ের কথাকেই অসত্য প্রমাণ করে।
গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার তার ফেসবুক পেজে শফিক রেহমানকে গ্রেফতারের নিন্দা জানান। তার পোস্টটি ছিলো, ‘প্রবীণ (৮১ বছর বয়সী) সাংবাদিক শফিক রেহমানের গ্রেফতার ও রিমান্ডের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। শফিক রেহমানের রাজনৈতিক আদর্শের সাথে আমি একমত নই।
ভিন্নমতের হলেই তাকে দমন করার যে নোংরা রাজনৈতিক অপকৌশল, এর একটা অবসান চাই।
দেশে যখন একের পর এক মানুষ খুন হচ্ছে, লেখক-প্রকাশক-বিদেশী থেকে শুরু করে মসজিদ-মন্দিরে ঢুকে মুয়াজ্জিন-পুরোহিতকে হত্যা করা হচ্ছে তখন খুনীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে অপহরণের বায়বীয় অভিযোগে এমন একজন প্রবীণ সাংবাদিককে গ্রেফতার সত্যিই হতাশাজনক।
আমি প্রত্যাশা করি সরকারের শুভবুদ্ধির উদয় হবে এবং প্রতিপক্ষকে দমনের চেয়ে দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের দিকে মনোযোগী হবে।’
ভিন্নমত যে সরকার একেবারেই নিতে পারছে না, সেটি প্রমাণ করতেই যেনো ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন জয়। তিনি ইমরান এইচ সরকারকে শিষ্টাচার বহির্ভূতভাবে মিথ্যাবাদী বলেন। বিএনপির কাছ থেকে টাকা খেয়েছেন ইমরান এইচ সরকার, এমন অশোভন মন্তব্যও করেন তিনি। দলীয় নেতাকর্মীদের আহ্বান জানান ইমরান এইচ সরকারকে আনফ্রেন্ড করতে। এমনকি এও বলেন, বক্তব্যের জন্য ইমরানকে ক্ষমা চাইতে হবে!
জনাব জয় কেনো শফিক রেহমানের বিরুদ্ধে তার অভিযোগের প্রমাণ দিতে পারছেন না, সে প্রশ্নটি করার অধিকার নাগরিক হিসেবে আমার রয়েছে। সরকার-সংশ্লিষ্ট সকলের কাজের কথার জবাবদিহিতা চাওয়ার অধিকার একজন নাগরিকের আছে। সেজন্য ক্ষমা চাইতে বলার অধিকার কারো নেই। কারো অধিকার নেই ন্যায়ের পক্ষে কথা বললে কাউকে টাকা খাওয়ার মিথ্যা অভিযোগে অভিযুক্ত করার। এটা অন্যায়, একই সাথে সাধারণ শিষ্টাচারের লঙ্ঘন।
শফিক রেহমানের মতাদর্শ আর আমার মতাদর্শ এক না। তাই বলে ভিন্নমতের কারো সাথে অন্যায় হলে আমি চুপ করে থাকবো, এটা আশা করা অনুচিত। ভলতেয়ার বলে গেছেন, ‘তোমার সাথে আমি একমত না হতে পারি, কিন্তু তোমার কথা বলার অধিকার রক্ষায় আমি জীবনও দিতে পারি’। এটাই আধুনিক গণতন্ত্রের মূলকথা, এটাই মুক্তচিন্তার সৌন্দর্য।
এই যে ফেসবুকে আনফ্রেন্ড করার আহ্বান, এটা প্রতীকীভাবে সরকারের দমননীতিকেই ফুটিয়ে তোলে। নাগরিকের কোনো কাজ, কোনো কথা সরকারদলীয় কারো পছন্দ না হলেই তাকে অনিরাপদ করে দেয়া, তার উপর ঘটা অন্যায়ের বিচার না করা, তাকে বিভিন্ন গোষ্ঠীর কাছে সরকারী প্রচারযন্ত্রের মাধ্যমে শত্রু প্রতিপন্ন করা, এসব সুশাসনের অন্তরায়, মানুষের অধিকারের অন্তরায়। সকল মানুষের সমান অধিকারের যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, তার অন্তরায়। আর কারো মতপ্রকাশের জন্য ক্ষমা চাইতে হবে, এই দাবি একদিকে হাস্যকর, অন্যদিকে ক্ষমতার দাপটে অন্ধ হয়ে যাওয়ার লক্ষণ।
একদিকে ধামাচাপার অপরাজনীতির মাধ্যমে বিচারহীনতার সংস্কৃতি পাকাপোক্ত করা, অন্যদিকে নাগরিকের মতপ্রকাশ বাধাগ্রস্ত করে, মিথ্যা অপবাদ দিয়ে প্রতিপক্ষকে দমনের যে নোংরামী, তার থেকে ক্ষমতাসীনরা বেরিয়ে না আসলে অন্ধকারের কানাগলি থেকে বাংলাদেশের মুক্তি নেই।
সঠিক প্রক্রিয়ায় জয়ী হবার চেষ্টা না করে অপকৌশলে ক্ষমতার প্রয়োগে ভিন্নমত দমনের যে চেষ্টা, তা সবসময় বুমেরাং হয়ে আসে, এটাই ইতিহাসের শিক্ষা। আমাদের দুর্ভাগ্য, আমাদের রাজনীতিকরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে শিখেননি। নতুনেরা যখন সেই পুরাতন অপরাজনীতিরই পুনরাবৃত্তি ঘটান, তখন সাধারণ জনগণের নিন্দা জানানো আর হতাশ হওয়া ছাড়া কিছুই করার থাকে না।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








