সংবিধান অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। প্রজাতন্ত্র শব্দের ব্যাখ্যায় বাংলাদেশের সংবিধানে বলা আছে- “বাংলাদেশ একটি একক, স্বাধীন ও সার্বভৌম প্রজাতন্ত্র, যাহা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ নামে পরিচিত হইবে।” এই ব্যাখ্যা ও বাংলা ভাষার স্বীকৃতি সংবিধান প্রদত্ত, এটা দাপ্তরিক ও আনুষ্ঠানিক। এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ আমাদের নাই। বাংলা ভাষার এই স্বীকৃতি বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরের প্রথম সংবিধানেই বিধৃত। এই সংবিধান বায়াত্তর সালে প্রণীত হলেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের দিন ষোল ডিসেম্বর একাত্তর থেকেই কার্যকর। এই স্বীকৃতির বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতিসহ ভাষা নিয়ে সকল প্রতিবাদ-প্রতিরোধ আর আন্দোলনের স্বীকৃতির চূড়ান্ত রূপ।
মাতৃভাষা বাংলার ইতিহাস সুদীর্ঘ কালের হলেও ভাষা নিয়ে আন্দোলনের বিস্তৃতি পাকিস্তান সৃষ্টির পর। যখন পাকিস্তানিরা বাংলাকে অস্বীকার ও অবমাননা শুরু করে তখন থেকে। এর পরিণতিতে শাসকের মুখের ওপর বীর বাঙালি প্রতিবাদী উচ্চারণে ‘না’ বলতে পেরেছিল। কেবল উর্দু পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে, এই বক্তব্যের বিপরীতে অসম সাহসী বাঙালি ‘না’ উচ্চারণে পাকিস্তানিদের জানিয়ে দিয়েছিল বাংলাকেও অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দিতে হবে। বাঙালির এই সাহস পাকিস্তানিদের ক্ষুব্ধ করেছিল। এরপর বাঙালির বুকের তাজা রক্ত ঝরেছে রাজপথে। বাংলাকে অস্বীকারের সরকারি অপচেষ্টার প্রতিবাদে বিক্ষুব্ধ হয়েছে রাজধানী ঢাকা, সিলেটসহ সারা দেশ। এখানে সমাজের অগ্রসর চিন্তার মানুষদের অংশগ্রহণ ছিল। অগ্রসর সমাজের প্রতিনিধিত্বশীল মানুষ সেই দাবিকে গণদাবিতে পরিণত করেছে। একাত্তরের মত বায়ান্ন এবং ততপূর্ব সময়টা গণযুদ্ধে রূপ না নিলেও পাকিস্তানিদের একপাক্ষিক রক্তচক্ষু ও নিপীড়নকে রক্ত দিয়ে প্রতিহত করে ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে বাঙালি। এরপর সেই পাকিস্তানিরা বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা বলে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়।
এটা ইতিহাসের পাঠ। ইতিহাসের এই পাঠ বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। ফলত বাঙালির ভাষা আন্দোলনের রক্তে ঝরা দিন একুশে ফেব্রুয়ারির ভাষা দিবস আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (ইউনেস্কো) আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে এই দিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার পর ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ বিশ্বজনীন হয়েছে। মাতৃভাষার রক্ষার দাবি হয়েছে সর্বজনীন। ‘বাংলা’ ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন পেয়েছে ভাষা বিষয়ক সামগ্রিক প্রপঞ্চের মূল্য। আমাদের বাংলা ভাষা পৃথিবীর অন্তত পাঁচ হাজারের বেশি মাতৃভাষার স্মারকমূল্য পেয়েছে। ভাষা ও অধিকার এই দুয়ের সম্মিলনে বাংলা হয়েছে নেতৃত্বস্থানীয়।

প্রচলন আর অনুশীলনে বাংলা ভাষা পৃথিবীর নেতৃত্বস্থানীয় ভাষা না হলেও মাতৃভাষার অধিকারের প্রশ্নে বাংলা ভাষা হয়েছে অগ্রগণ্য, এটা অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে। বাংলা ভাষার সম্মানের এই স্বীকৃতি কেবলই বাংলাকেন্দ্রিক হয়ে থাকেনি, এর বিস্তৃতি ঘটেছে সকল ভাষাভাষী মানুষদের মাঝেও। বৈশ্বিক উপযোগিতা কিংবা ব্যবহারের প্রসঙ্গ এখানে না থাকলেও অনাগত দিনে পৃথিবীর একজন মানুষও কোনো একটা ভাষায় কথা বলতে চাইলে বাংলার ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ও বৈশ্বিক স্বীকৃতি তার জন্যে বর্ম হয়ে আছে। দুনিয়ার সকল দেশের সকল শাসক অন্তত একজন মানুষের হলেও স্বতন্ত্র সে মুখের ভাষা কেড়ে নিতে চাইলে একুশের এই স্বীকৃতি, মাতৃভাষা দিবসের এই স্বীকৃতি জোরপূর্বক ভাষাহরণের যেকোনো অপচেষ্টাকে রুখে দেবে।
ইউনেস্কোর মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতির দিনটি এই সংস্থাভুক্ত সকল দেশ পালন করে থাকে। যে পাকিস্তানের কাছ থেকে রক্তের বিনিময়ে আমরা বাংলা ভাষার স্বীকৃতি আদায় করেছি সেই পাকিস্তানকেও বাঙালির একুশে ফেব্রুয়ারির অমর দিনটিকে পালন করতে হয়। পাকিস্তান তাদের মত করে দিনটি পালন করলেও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রেক্ষাপট, আন্দোলন, রক্ত আর আত্মদানের ইতিহাসকে অস্বীকারের উপায় নাই। এটা আমাদের অনন্য অর্জন।
আমাদের পূর্বপুরুষদের ভাষার অধিকার আদায়ের সেই আন্দোলন, সেই স্বীকৃতির পথ ধরে আমরা স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা অর্জন করেছি। বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার সেই দাবি পাকিস্তান থাকাকালে ‘অন্যতম’ ভাষার স্বীকৃতি পাওয়ার পর বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাংলাদেশের একমাত্র ‘রাষ্ট্রভাষা’র স্বীকৃতি পেয়েছে।
বাংলা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত। ভাষার পথ ধরে স্বাধিকার হয়ে স্বাধীনতা- এই পথ পরিক্রমায় অগণন মানুষের রক্তে সিক্ত হয়েছে এই বাংলা। রক্তের বিনিময়ে অধিকার প্রতিষ্ঠার এই ইতিহাস আমাদের বেদনার হলেও দিনশেষে প্রাপ্তিযোগ গৌরবান্বিত। এই গৌরবের বিপরিতে আছে কিছু অপ্রাপ্তি যা সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার না করতে পারার। এখানে রাষ্ট্রের দায় আছে, দায় আছে জনসাধারণের, দায় আছে বৈশ্বিক সংস্কৃতি আর অনুশীলনের অযৌক্তিক অজুহাতের।
বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি, সংগ্রাম আর আত্মত্যাগের পেছনে ছিল সর্বস্তরে বাংলাকে প্রচলনের অভীস্পাও। এটা পুরোপুরি সফল হয়নি। সংবিধান কিংবা দাপ্তরিক কাগজে কলমে বাংলা রাষ্ট্রভাষা হলেও রাষ্ট্রের নানা অঙ্গের কর্মকাণ্ডে কিছু ক্ষেত্রে বাংলাকে উপেক্ষিতই করে রাখা হয়েছে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানিক উচ্চ আদালতের রায়ের ক্ষেত্রে এখনও বাংলার চাইতে ইংরেজিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কিছু ব্যতিক্রম বাদে অধিকাংশ রায় হচ্ছে ইংরেজিতে। কিছু রায় বাংলায় লেখা হচ্ছে ঠিক কিন্তু সংখ্যার দিক থেকে হিসাব করলে সেটা স্মারকের পর্যায়েই থেকে যাচ্ছে।
এখানে অজুহাত হিসেবে বলা হচ্ছে, আইনের পরিভাষার কথা, আইনের মারপ্যাঁচের কথা, আইন ও রায়ে বাংলা লেখার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বাংলা ভাষার সীমাবদ্ধতার কথা বলা হচ্ছে। তর্কের খাতিরে সেটা মেনে নিলেও যুক্তির মাপকাটিতে সেই অজুহাত টেকে না। কারণ আইনি পরিভাষা প্রয়োগের ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার সীমাবদ্ধতা থেকে থাকে তবে এই সীমাবদ্ধতা কাটাতে কেন সরকারি পর্যায়ে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না?
আমরা যখন বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তি পালনের পথে, তখন কেন আমাদের বাংলাকে সকল ক্ষেত্রে সমৃদ্ধ করতে কাজ শেষ করতে পারিনি? কেবল সংবিধানে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমেই রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব কিন্তু শেষ হয়ে যায়নি। বাংলা ভাষার বিস্তৃতি ঘটাতে, সকল পর্যায়ে বাংলাকে প্রায়োগিক ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সম্ভব সকল ক্ষেত্রে আমাদের কাজ করার দরকার ছিল, ব্যাপক ভাবে। সেটা দায়িত্বের সম-পর্যায়ে হয়নি। তবে হয়নি বলে আর কখনও হবে না বা করা যাবে না এমনও না। যেখানে আমাদের সীমাবদ্ধতা আছে সেই সব জায়গা চিহ্নিত করে এখনও কাজ শুরু করা দরকার।

যে কথা না বললেই নয় তা হলো রাষ্ট্রের সকল পর্যায়ে বাংলাকে প্রায়োগিক ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা মানে অন্য ভাষা বিশেষত সারাবিশ্বে প্রচলিত ইংরেজির প্রতি বিদ্বেষ নয়। এই ইংরেজি কিংবা অন্য কোনো ভাষার সঙ্গে মুখোমুখি সংঘাতের পরিবেশ সৃষ্টি না করেও সেটা করা যায়। বাংলা প্রতিষ্ঠা করতে ইংরেজিকে বাদ দিতে হবে এমন না। ইংরেজি বা অন্য ভাষাকে বাদ দিয়ে নয়, প্রায়োগিক ক্ষেত্রে বাংলাকে প্রাথমিক ভাষা হিসেবে নির্ধারণ করে অন্য ভাষার ব্যবহারও করা যায়। এটা সংঘাতের বিষয় নয়, এটা প্রয়োগ ও দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়। আমাদের ভাষা আন্দোলন, একুশে ফেব্রুয়ারি, ভাষার স্বীকৃতি, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে বৈশ্বিক স্বীকৃতি কিন্তু সে শিক্ষাই দেয় আমাদের।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








