২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে অমর একুশে গ্রন্থমেলা থেকে ফেরার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা, লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায়কে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। হামলার সময় সঙ্গে ছিলেন তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ। হামলায় তিনিও গুরুতর আহত হন।
অভিজিৎ রায়ের উপর হামলার দিনটির স্মরণ করে স্ত্রী রাফিদা আহমেদ ফেসবুকে পোস্টে লিখেছেন:
‘এই মাসটা খুব ওলোটপালটের মাস। ২৬ তারিখ ক্রমশ এগিয়ে আসতে থাকলে ‘ভাল খারাপের’ প্রশ্নটাও করতে ভয় লাগে। ফেসবুকে আমার অনুপস্থিতি দেখে অনেকেই কুশল জানতে চেয়েছেন, সহানুভূতি জানিয়েছেন। ২০১৫ সালে ভ্যালেন্টাইনস ডে তে তৃষার সাথে ওর কলেজে দেখা করে আমি আর অভি বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলাম। তাই প্রতি বছর এই সময়টা যত এগিয়ে আসতে থাকে তৃষার ভঙ্গুরতাও ততো বাড়তে থাকে। আমি ব্যক্তিগত সুখদুঃখ বড়ো একটা ভাগ করে নিতে পারিনা, এটা আমার অক্ষমতাই বলতে পারেন। এক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকাও আমি এখনো মেনে নিতে পারিনি।
গত তিন বছরে অনেকে এটা নিয়ে আমার সমালোচনা করেছেন, আমার ‘বাইরের হাসি’ দেখে কেউ কেউ বিরক্ত হয়েছেন, প্রকাশ্যে তা জানিয়েছেনও। একজন ব্লগার বন্ধু একদিন এও বললেন যে, আমি নাকি ‘কাওয়ার্ড’ তাই নিজের একান্ত অনুভূতিগুলো সবার সাথে ভাগ করে নিতে ভয় পাই। হবে হয়তো! তবে এখনো আমার বিশ্বাস যে, কিছু একান্ত ব্যক্তিগত অনুভূতি আছে যেগুলো সবার সাথে ভাগাভাগি করে নিতে গেলে তারা তাদের গভীরতা হারায়। গভীরতার তাৎপর্য যে আজকের সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে কতটা বেশী হয়ে দাঁড়িয়েছে তা আর নতুন করে বলে কী লাভ- আমি হয়তো ভুল, এসব সূক্ষ্ম মানবিক অনুভূতির হিসেব মেলানো বা এদের ‘সঠিকতা / ঠিকতা’ নির্ণয় করা তো আর কোন সহজ কাজ নয়।

এই তিন বছরে অনেকের সাথে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি কতো মানুষের জীবন অহরহ ছিন্নভিন্ন হয়ে ছিটকে পড়ছে – কখনো বিনা কারণে, আবার অনেক সময়েই মানুষের, সমাজের, দেশের বা বহু দেশের স্বার্থের কারণে । সেই ছিন্নভিন্ন অংশগুলোকে জোড়া লাগানোর চেষ্টা করতে করতেই জীবনের একটা বিশাল অংশ পার হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ব্যক্তিগত সুখদুঃখের ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে সমাজ ও পৃথিবীকে একটু সাহস করে দেখতে শুরু করলে, একে
অতীত, বর্তমান, ও ভবিষ্যতের পরিপ্রেক্ষিতে ফেলে জানার এবং বোঝার চেষ্টা করলে নিজের কষ্টগুলো একটু হলেও কমে আসে – এটাই আমার শিক্ষা গত তিন বছরে।
এবং এই সময়টাতে দেশ বিদেশের কত মানুষ এগিয়ে এসেছেন, সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন, কেমন আছি জানতে চেয়েছেন – তাদের সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ। বিজ্ঞানের চোখে সময়ের অস্তিত্ব থাকুক বা না থাকুক – সময় যেহেতু সবসময় এগিয়েই চলে তাই আমাদেরও সামনে এগুনো ছাড়া আর উপায় কী? সময় জিনিসটা- ‘সত্যি সত্যি’ সময়ের অস্তিত্ব থাকুক বা না থাকুক – আপাতভাবে যেহেতু এগিয়ে চলে তাই আমাদেরও সামনে এগুনো ছাড়া আর উপায় কী?’







