সম্প্রতি ভারতে বিদেশী দম্পতিদের কাছে গর্ভ ভাড়া দেওয়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এ বিষয়ে নির্দেশনা পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে সব ফার্টিলিটি ক্লিনিকে। নতুন এ নিষেধাজ্ঞায় যেমন হতাশ করেছে সন্তানহীন বিদেশী দম্পতিদের, তেমনি আশার আলো নিভিয়ে দিয়েছে গর্ভ ভাড়া দেন এমন ভারতীয় নারীদেরও।
‘সারোগেসি’ বা গর্ভ ভাড়া দেওয়ার অর্থ হলো অন্য কোনো ব্যক্তির হয়ে গর্ভধারণ করা এবং সন্তান জন্ম হওয়ার পর তা সেই ব্যক্তিকে চিরকালের জন্য দিয়ে দেওয়া। বিশ্বের হাতে গোনা মাত্র কয়েকটি দেশ বাণিজ্যিকভাবে অর্থাৎ অর্থের বিনিময়ে গর্ভ ভাড়া দেওয়াকে বৈধতা দিয়েছে, যার মধ্যে ভারত অন্যতম।
এ কারণে একটা সন্তানের আশায় গর্ভ ভাড়া নিতে প্রতি বছর নানা দেশ থেকে ভারতে এসে ভীড় জমান হাজার হাজার নিঃসন্তান দম্পতি। গড়ে উঠেছে অসংখ্য ফার্টিলিটি ক্লিনিক বা সারোগেসি হোম।
ভারতের অতি দরিদ্র পরিবারের অনেক নারীই অর্থের আশায় এসব দম্পতির সন্তান গর্ভে ধারণ করেন। ভারতে বাণিজ্যিকভাবে গর্ভ ভাড়া ব্যবস্থা শুরু হওয়ার পর থেকে তারা এই উপায়ে আয় করা অর্থ দিয়ে নিজের এবং নিজের পরিবারের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা করছেন। অবস্থা এমনই যে, সারোগেসি’র টাকা ছাড়া তাদের সংসার চলাই দায়।
এমনই একজন ২৭ বছর বয়সী দেবী পরমার। যিনি এক ইংরেজ পরিবারের সন্তান ধারণ করেছেন।
তিনি জানান, আগে খামারে পরিচারিকা হিসেবে কাজ করে যা আয় করতেন তাতে ঠিকমতো দু’বেলা খাবারই জুটতো না। গর্ভ ভাড়া দিয়ে তিনি এখন নিজের এবং নিজের পরিবারের জন্য ঘর উঠিয়েছেন। সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেন এখন।
গর্ভ ভাড়ায় দোষের কিছু দেখেন না দেবী। তিনি মনে করেন, এতে নিঃসন্তান কেউ সন্তানের সুখ পাচ্ছে, অন্যদিকে তিনিও পরিবারের জন্য অর্থ পাচ্ছেন।
কিন্তু বিদেশীদের কাছে সারোগেসি নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়ায় ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম দুশ্চিন্তা এবং হতাশার মধ্যে রয়েছেন দেবী এবং তার মতো আরো অনেকে।
বাণিজ্যিকভাবে বিদেশীদের কাছে গর্ভ ভাড়া নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়ায় ব্যক্তিগতভাবে এই নারীরা যেমন হতাশ এবং শঙ্কিত, তেমনি ব্যবসায় অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশঙ্কায় রয়েছে সারোগেসি হোমগুলোও।
অন্যদিকে সরকারের এই সিদ্ধান্তে হতাশা প্রকাশ করেছেন বহু নিঃসন্তান দম্পতি। কেননা এর মধ্য দিয়ে সন্তান পাবার শেষ সুযোগটাও তাদের হাতছাড়া হয়ে যেতে বসেছে।
২০০৮ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বাণ্যিজ্যিকভাবে গর্ভ ভাড়াকে বৈধতা দেয়। এর ভিত্তিতে ২০১৪ সালে ভারতে অ্যাসিস্টেড রিপ্রোডাক্টিভ টেকনিকস বিল পাস হয়।
তবে অর্থের বিনিময়ে বিদেশী দম্পতিদের গর্ভ ভাড়া দেওয়া গর্ভের শিশুকে বিক্রি করে দেওয়ার সমতূল্য এবং এটি ভারতীয় নারীদের জন্য অপমানজনক জানিয়ে সরকার এর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
ভারত সরকার মনে করে এতে ভারতীয় নারীদের দারিদ্র্যের সুযোগ নেওয়া হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে মানব পাচারের সুযোগও সৃষ্টি হচ্ছে বলে সরকারি নির্দেশনায় জানানো হয়।
বলা হয়েছে, এখন থেকে শুধু ভারতীয় নিঃসন্তান দম্পতিদের কাছেই গর্ভ ভাড়া দেওয়া যাবে এবং এর বিনিময়ে শুধু মা-শিশুর চিকিৎসা ব্যয় ছাড়া আর কোনো অর্থ নেওয়া যাবে না।
তবে অনেকে মনে করছেন, সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ না করে সারোগেসির ওপর কঠোর আইন প্রণয়ন করা হলেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।







