সারা শহর থমথমে। ২৫ মার্চ বেলা ৩টার মধ্যে টেলিগ্রাম হাতে পাই। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ইয়াহিয়ার আলোচনার প্রতিদিনই টেলিগ্রাম বের হত। এদিনের টেলিগ্রামে বলা হয়েছিল, ৪টি পয়েন্টে সমঝোতা হতে যাচ্ছে। তবে নিজস্ব মুদ্রা এবং প্রাদেশিক সেনাবাহিনী বিষয়ে মতৈক্য হয়নি। বঙ্গবন্ধু কোন পয়েন্টে ছাড় দিতে প্রস্তুত নন। ইয়াহিয়া এবং ভুট্টোকে আলোচনায় অমনোযোগী দেখা গেছে।
আমি আর্ট কলেজে চাকরি করি তখন। মেয়ে কনকের এক বছর। গোপীবাগের ২য় গলির ২৫ নম্বর বাড়িতে থাকি। আমার বড় ভাই ডা. সোলেমান আমার পাশের বাসায় থাকতেন। নিষিদ্ধ ঘোষিত কমিউনিস্ট পার্টি করতেন। ১১টা সময় বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। সারাদিন দৌড়াদৌড়ি করে ফেরেন ২৫ মার্চ রাত ৮টায়। এসে বলেন, কি যে হবে বোঝা যাচ্ছেনা। আজ ভয়ংকর কিছু ঘটতে যাচ্ছে। ক্যান্টনমেন্ট তৎপর। পার্টি অফিসে আলোচনা হয়েছে। আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকে আজ ধরবে। অনেককে মেরে ফেলতে পারে। সন্ধ্যা থেকেই ব্যারিকেড দেওয়া শুরু হয় শহরে। আমাদের এখানে। বড় ভাই ডা. সুলেমান, সাই্ফউদ্দিন মানিকরা এ কাজ করেন।
২৫ মার্চ দুপুরে বন্ধু শাহাদাত চৌধুরীকে নিয়ে কিছুক্ষণ আড্ডা হয়। গোপীবাগ মোড়ে। ইত্তেফাকে। তারপর মাথাব্যাথার কারণে বাসায় চলে আসি। মার্চের শুরু থেকেই আমাদের বাসায় বাংলাদেশের পতাকা উড়েছে। আরো অনেকের বাসাতেই উড়েছে। কারণ তখন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান বঙ্গবন্ধুর কথায় চলেছে। বেতন পেয়েছি আমরা নিয়মিত। বঙ্গবন্ধু তার ৭ মার্চের ভাষণে বাংলাদেশের কথা বলেছেন। অথচ তখনও পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ হয়নি। রাতে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর হামলায় রাজারবাগ পুলিশ লাইনে আগুনের কুন্ড গোপীবাগ থেকে দেখেছি। ইত্তেফাকেও হামলা হল। আমার বাসার ছেলেটা বলল পতাকা নামিয়ে ফেলি খালু। আমি বলেছি, ওরা এখনও এদিকে ঢোকেনি। উঠিয়েছি যখন তখন আরেকটু দেখি। রাতের বেলা কোন মতে কাটিয়েছি। ২৬ মার্চ বেলা ১১টা পর্যন্ত পতাকাটা উড়ছিল। যদিও আশেপাশের সব পতাকা নেমে গিয়েছিল। আমার ছোট ভাই যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত। সেই পরে পতাকা নামায়। কারণ, দেশীয় দালালদের মাধ্যমে তথ্য পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর কাছে পৌঁছে যেতে পারে এই ভয়ে।
সকালে গোপীবাগ মোড়ে যাই। লাশ দেখি। ইত্তেফাকের সামনে বন্ধু গোলাম সারোয়ার শিল্পীর সঙ্গে দেখা হয়। ইত্তেফাকে থেকেও বেঁচে গিয়েছিল। কিন্তু উদভ্রান্ত ছিল তার স্ত্রী-সন্তানদের ভেবে। তারা হাতিরপুলে থাকত। কিছুদিন আগে আমার বন্ধুটি মারা গিয়েছেন। ২৯ মার্চ আমি আমার স্ত্রী কন্যাসহ ঢাকা ছাড়ি লক্ষীবাজার হয়ে।
আজকের দিনে চ্যানেল আইয়ের সম্মাননা পেয়ে বড় ভাই ডা. সোলেমানকে মনে পড়ছে খুব বেশি। মার্চ এর এক মাস পরেই তিনি পাকিস্তানী সেনাবাহিনী এবং এদেশীয় দালালদের হাতে শহীদ হন। বাড়ি ঘেরাও করে ধরে তাকে হত্যা করা হয়। আমিও সেদিন গুলি খেয়েছিলাম। এখনও সেই দাগ বহন করে চলেছি। বুলবন ওসমান মুক্তধারার জন্য সোলেমান ভাই নামে একটি বই লিখেছিল। যা ৭১ এর মে মাসেই প্রকাশিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলা প্রকাশনা কেন্দ্রের ব্যানারে, কলকাতা থেকে। মুক্তধারার চিত্তরঞ্জন বাবু বের করেছিলেন। আমার বড় ভাইয়ের সেই স্মৃতি আগলে রেখে আজও বেঁচে আছি।
ভাই কেমন আছেন? যে দেশের জন্য জীবন দিলেন কেমন দেখছেন সে দেশটিকে!
হাশেম খান, চিত্রশিল্পী
শ্রুতিলিখন: হাসান আহমেদ







