পাকিস্তানে ব্লাসফেমি আইনে মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়া আসিয়া বিবিকে সাজা থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ আদালত।
প্রতিবেশীর সঙ্গে ঝগড়ার সময় হযরত মুহাম্মদকে (সা.) নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করে জাতিকে বিভক্ত করার অভিযোগে ২০১০ সালে ব্লাসফেমি আইনে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী আসিয়াকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয়া হয়েছিল। তবে আসিয়া বিবি বরাবরই তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে আসছেন।
তারপরও গত ৮ বছর ধরে প্রায় পুরোটা সময় কারাগারে একাকি বন্দী অবস্থায় কাটাতে হয়েছে তাকে।
পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সাকিব নিসার বুধবার আসিয়াকে ওই সাজা থেকে অব্যাহতি দিয়ে নির্দেশ দেন, অন্য কোনো মামলায় আটক না থাকলে যেন তাকে অবিলম্বে মুক্তি দেয়া হয়।
আসিয়া বিবির পুরো নাম আসিয়া নওরিন। ২০১৫ সালে তার আপিল আবেদন গ্রহণের পর গত ৮ অক্টোবরের শুনানিতে আপিলের রায়ের দিন বুধবার ধার্য করেছিলেন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে তিন সদস্যের বেঞ্চ।
ঘটনার শুরু ২০০৯ সালের জুনে। মামলার বর্ণনায় রয়েছে, প্রতিবেশীদের সঙ্গে মিলে বাগান থেকে ফল সংগ্রহের সময় এক বালতি পানি নিয়ে তাদের সঙ্গে আসিয়ার ঝগড়া বাঁধে। মুসলিম প্রতিবেশীদের অভিযোগ ছিল, যেহেতু আসিয়া তাদের বালতিতে রাখা পানির কাপটি ব্যবহার করেছে, সেহেতু তারা আর সেটি ব্যবহার করতে পারবে না। কারণ খ্রিস্টান আসিয়ার ছোঁয়ায় কাপটি অপবিত্র হয়ে গেছে।
এ নিয়ে প্রতিবেশী নারীদের সঙ্গে আসিয়ার কথা কাটাকাটি শুরু হয়। তর্ক-বিতর্কের এক পর্যায়ে ওই নারীরা আসিয়াকে ইসলাম গ্রহণ করতে বলেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর অভিযোগ, ওই সময় জবাবে আসিয়া বিবি মহানবীকে (সা.) নিয়ে কিছু আপত্তিকর মন্তব্য করেন।
এ ঘটনার পর আসিয়াকে তার ঘরে নিয়ে প্রতিবেশীরা মিলে মারধর করে তার বিরুদ্ধে ব্লাসফেমি বা ধর্ম অবমাননার অভিযোগ আনে। তারা দাবি করে আসিয়া ব্লাসফেমির অপরাধ স্বীকারও করেছেন তখন।
এরপর পুলিশি তদন্তের পর গ্রেপ্তার করা হয় আসিয়াকে। তারই ধারাবাহিকতায় বিচারিক আদালতে মামলার রায়ে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। মামলাটি আপিলের জন্য হাইকোর্টে উঠলে ২০১৪ সালে আগের রায়ই বহাল রাখেন উচ্চ আদালত।
অবশেষে সুপ্রিম কোর্টে আপিল আবেদন করা হলে সেখান থেকে খালাস পেলেন আসিয়া।
সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চ রায়ের সময় বুধবার বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ যুক্তিসঙ্গত সন্দেহের বাইরে গিয়ে মামলাটি প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। বিচারপতিদের মতে, মামলাটি দুর্বল সাক্ষ্যপ্রমাণের ওপর ভিত্তি করে হয়েছিল। বিচার প্রক্রিয়াও যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। এমন সব মানুষের কাছ থেকে আসিয়ার ‘দোষ স্বীকারের’ সাক্ষ্য নেয়া হয়েছিল যারা ‘তাকে হত্যার হুমকি দিচ্ছিল।’
বুধবারের রায়ে কোরআন, হাদিস এবং ইসলামিক ইতিহাসের বহু প্রসঙ্গ টানা হয়েছে। রায়টি শেষ করা হয়েছে একটি হাদিস দিয়ে, যেখানে হযরত মুহাম্মদ (সা.) মুসলিমদেরকে অমুসলিমদের প্রতি দয়া দেখাতে বলেছেন।
এর আগে এই মামলার বিভিন্ন কার্যক্রমের দিন মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল রাখার দাবিতে আদালতের সামনে অসংখ্য মানুষ মিছিল করেছে। তাই রায়কে ঘিরে বুধবারও ইসলামাবাদজুড়ে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল।
পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ধর্ম ইসলাম। দেশটির আইনি ব্যবস্থায় এর বিভিন্ন পদ্ধতি বেশ কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়। তাই ব্লাসফেমি আইনগুলোর প্রতিও অধিকাংশ জনগণের সমর্থন বেশ দৃঢ়। তাই কট্টর রাজনীতিকরা তাদের সমর্থনের ভিত্তি মজবুত করার জন্য ব্লাসফেমির কঠোর শাস্তিকে সমর্থন করে আসছে।
কিন্তু সমালোচকদের মতে, ব্লাসফেমি আইনকে পাকিস্তানে বেশিরভাগ সময়ই ব্যক্তিগত বিরোধে প্রতিশোধ নেয়ার জন্য ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব মামলা খুবই দুর্বল প্রমাণের ওপর ভিত্তিতে করা হয়।
ব্লাসফেমি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত অধিকাংশই মুসলিম। কিন্তু ১৯৯০’র দশক থেকে অসংখ্য খ্রিস্টানও এ জাতীয় মামলায় শাস্তি পেয়ে আসছে।








