ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ও উপাসনালয়ে হামলার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও ঘৃণার জন্ম দিয়েছে সচেতন মানুষদের মধ্যে। ৩০ লাখ শহীদের বিনিময়ে কষ্টে অর্জিত এই বাংলাদেশে এমন ঘটনাকে এক পশ্চাৎপদতা হিসেবেই উল্লেখ করলেন বিশ্লেষকরা। ধর্মের নামে রাজনীতি আর আগের বিভিন্ন ঘটনার তদন্ত-বিচার না হওয়াকে দায়ী করার পাশাপাশি তারা ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানে দেশ চললে এ অবস্থা হতো না বলে উল্লেখ করেছেন।
গত ২৮ অক্টোবর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার হরিপুর ইউনিয়নের হরিণবেড় গ্রামের রসরাজ দাস নামে এক যুবকের ফেসবুকে পোস্টে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ এনে স্থানীয়রা তাকে পুলিশে সোপর্দ করে। তবে তিনি এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তার ফেসবুক অাইডি নকল করে অন্য কেউ এই কাজ করেছে।
এর দুইদিন পর ঘটনার প্রতিবাদে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত ও খাঁটি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত নামের দুটি সংগঠন সমাবেশ করে। সেই সমাবেশ চলাকালে সদরের হিন্দুপাড়াগুলোতে ব্যাপক হামলা ও লুটপাট চালানো হয়।
ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির এমন ঘটনাকে খুবই উদ্বেগজনক হিসেবেই উল্লেখ করে বলেন, এমন একটি দেশ দেখার জন্য এদেশ আমরা স্বাধীন করিনি। ৭২ সালের সংবিধানে দেশ ছিলো ধর্মনিরপেক্ষ। সেই সংবিধান থেকেও আমরা সরে এসেছি। ৭২ এর সংবিধান অনুযায়ী চললে এদেশে আজ এমন দিন দেখতে হতো না। এই সহিংসতা দেখতে হতো না। পাকিস্তান আমলে এদেশের বাঙালি জাতিকে যেভাবে নির্যাতিত হতে দেখেছি। এখনো সেভাবেই নির্যাতন করা হচ্ছে। ধর্মের নামে রাজনীতি যতদিন বন্ধ না হবে ততদিন এমন অবস্থা চলতেই থাকবে।

‘নিজেরা করি’ সংগঠনের সমন্বয়কারী খুশি কবিরও এমন ঘটনাকে দেশকে সাম্প্রদায়িক দেশ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা হিসেবে অভিহিত করে বলেন, এই ঘটনার মধ্যে দিয়ে ওখানকার মানুষের মধ্যে যে ভীতি বা অনাস্থার সৃষ্টি হয়েছে সেটা কি আর কখনো ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। মুক্তিযুদ্ধ করে এদেশ অর্জিত হয়েছে। সেখানে গণতন্ত্র রক্ষার কথা বলা হচ্ছে, যুদ্ধাপরাধীর বিচার হচ্ছে সেখানেই এই ধরনের হামলা কখনোই মেনে নেওয়ার মতো নয়।
নারী বিষয়ক ওয়েবপোর্টাল উইমেনচ্যাপ্টারের সম্পাদক সুপ্রীতি ধর বলেন, এই হামলার পেছনের মূল কারণ হচ্ছে জায়গা জমি দখলের চেষ্টা। তা না হলে এসব নিরক্ষর জেলে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর ফেসবুকে প্রচারের অভিযোগ আনবে কেন তারা। ৭১ সালে পুরো দেশের মানুষ একসঙ্গে যুদ্ধ করেছে। তখন তো হিন্দু-মুসলিম কেউ বিভেদ করেনি। সবাই চেয়েছিলো সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ভিত্তিতে গড়ে উঠবে দেশ। সেই দেশটাতেই এখন হিন্দু-মুসলিমে ভাগ হয়ে যাবে। সংখ্যালঘু বলে হিন্দুরা এমন নির্যাতনের শিকার হবে, এতটা বিভেদ কখন তৈরি হলো?
একই কথা বলছিলেন শহীদ সুরকার আলতাফ মাহমুদের মেয়ে শাওন মাহমুদ, আজ আমাদের পারিবারিক শিক্ষা বা সামাজিক শিক্ষাটা কোন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে যে, এত বিভৎসতা আমাদের দেখতে হচ্ছে। পরিবার থেকেই আমরা সন্তানদের কিভাবে গড়ে তুলছি? আর ওদের কি শিক্ষাটাই বা দিচ্ছি। গোঁড়ায় যদি গলদ থাকে তাহলে সমস্যার সমাধান আর আসবে কী করে?

তবে এমন ঘটনার কারণ হিসেবে প্রশাসনের নির্লিপ্ততা ও উদাসীনতাকেই দায়ী করলেন তারা।
খুশি কবির বলেন, প্রশাসন বলছে এমন ঘটনায় নাকি তাদের তেমন কিছু করার ছিলো না। আমার প্রশ্ন হলো, সাধারণ একটি সমাবেশের অনুমতি পেতে অনেক সংগঠনকে কতোটা বেগ পেতে হয়। সেখানে ওরকম একদল মানুষ সমাবেশ করলো প্রশাসন বিন্দুমাত্র বাধা দিলো না। বা সেখানকার সাধারণ মানুষকে কোনো নিরাপত্তা দিলো না। আর তারপরে সেখানকার মন্ত্রীর উসকানিমূলক বক্তব্যতো রয়েছেই আগুনে ঘি ঢালতে। এতকিছুর পরও সেখানে দ্বিতীয়বার হামলা চালালো দুর্বৃত্তরা। এর কারণ কি? অবশ্যই প্রশাসনের উদাসীনতা। শুধু ইউএনও বা ওসিকে প্রত্যাহার করলেই কি সমস্যার সমাধান আসবে?

সুপ্রীতি ধর জানান, প্রশাসনের নির্লিপ্ততা প্রমাণ করে যে প্রশাসন হামলাকারীদের পক্ষে। আর সেকারণেই কিন্তু দ্বিতীয়বারের হামলাটাও হয়েছে। যেন এই হামলাটাই সবার মনের কথা। ত্রাণ দিয়ে বা ঢেউটিন দিয়ে কি এই হামলার ক্ষতিপূরণ দেওয়া যাবে। রামুর হামলার পরেও ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেই ঐতিহ্য কি ফিরিয়ে আনা গেছে। তার উপর মন্ত্রীর ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্যতো রয়েছেই।
সমস্যাটা এখন আর ছোট আকারে নেই। সেটা মহীরুহ আকার ধারণ করেছে। তাই সমস্যার সমাধান করে আগা ছেঁটে লাখ কি হবে, সমাধান আনতে হবে গোঁড়া থেকেই। তেমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সুপ্রীতি ধর বলেন, এমন ঘটনায় কঠোর অবস্থান নিলে হয়তো হামলার ঘটনা বন্ধ হবে কিন্তু ভেতর থেকে কি পরিবর্তন আসবে? যতদিন না আমরা আমাদের সন্তানদের মানুষকে মানুষ বলার শিক্ষায় শিক্ষিত করতে না পারবো ততদিন পরিবর্তন কিভাবে আসবে।
খুশি কবির বলেন, সমস্যার সমাদানে সরকারকে আরো কঠোর অবস্থান নিতে হবে। সেখানকার মানুষের মধ্যে যে ভীতি ও অনাস্থা তৈরি হয়েছে তা দূর করার ব্যবস্থা করতে হবে। এদেশ তো তাদেরও দেশ। তারা কেন এদেশে নির্যাতিত হবে। এর আগের ঘটনাতেও তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে কিন্তু তদন্ত রিপোর্ট মেলেনি। যদি রিপোর্ট মিলতো বা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হতো তাহলে নিশ্চয়ই এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতো না?

সমাধানের প্রসঙ্গে শাহরিয়ার কবিরের বক্তব্য, যদি সঙ্গে সঙ্গে এসব দুর্বৃত্তদের গ্রেফতার না করা হয়, যদি দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দেওয়া যায় তাহলে সমস্যার সমাধান আসবে কি করে।
ওবায়দুল কাদের আগাছা পরিষ্কার করতে চেয়েছেন, সেটা না হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকেই শুরু হোক। মসজিদ ভাঙলে মাতম করবেন আর মন্দির ভাঙলে উল্লাস করবেন সেটা কেমন কথা।
শাওন মাহমুদ মনে করেন সমস্যার সমাধান করতে পারে জনমত, এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে সেজন্য নিজেদের মধ্যে জনমত সৃষ্টি করতে হবে। নিজেদের সংস্কৃতি ও ইতিহাসের ভিত্তিতে জনমত সৃষ্টি করতে হবে।
তবে এসব সমস্যার সমাধান না করতে পারলে সরকারের সকল অর্জনই অর্থহীন হয়ে উঠবে বলেই মনে করেন বিশ্লেষকরা।








