প্যারিস। এবারের বিশ্বকাপজয়ী দেশের রাজধানী। সেখানেই বসেছিল ফুটবল-বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ পুরস্কার প্রদানের মঞ্চ। সেই মঞ্চেই মেসি-রোনালদোর এক দশকের মোহ কাটিয়ে ব্যালন ডি’অর ট্রফিতে খোদাই হয় নতুন নাম। ‘ওয়ার চাইল্ড’ (যুদ্ধ শিশু) থেকে ব্যালন ডি’অর মুকুট জয়ে রূপকথার নায়কের নাম লুকা মদ্রিচ।
উয়েফা ও ফিফার বেস্টের পর এবার ব্যালন ডি’অর জিতলেন মদ্রিচ। ফুটবল মাঠে বল পায়ে চলতি বছরটা দারুণ গেছে। তার অধিনায়কত্বেই প্রথমবারের মত বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলে ক্রোয়োশিয়া। সেই সঙ্গে এবছরই টানা তৃতীয়বার চ্যাম্পিয়ন্স লিগের মুকুট জিতেছে রিয়াল মাদ্রিদ। স্প্যানিশ জায়ান্টদের মাঝমাঠের অন্যতম প্রধান ভরসা ছিলেন মদ্রিচ। ক্রোয়েশিয়ার ফুটবল ইতিহাসে তিনিই প্রথম ফুটবলার যিনি এই পুরস্কার জিতলেন।
নিঃসন্দেহে বিশ্বকাপের কথা মাথায় রেখেই মদ্রিচকে সেরার পুরস্কার দেয়া হয়েছে। তবে তা বিশ্বকাপ জেতার জন্য নয়।
রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে গতবছর চ্যাম্পিয়ন্স লিগে জিতে সেরার শিরোপা ছিনিয়ে নিয়েছিলেন পর্তুগিজ ফুটবলের পোস্টার বয় সিআর সেভেন। পাশাপাশি কাতালান ক্লাবের হয়ে লা লিগা জয়ের পেছনে আর্জেন্টাইন মেসি ছিলেন স্বমহিমাতে। কিন্তু পার্থক্য গড়ে দেয় চলতি বছর রাশিয়া ফুটবল বিশ্বকাপ। প্রায় একার কাঁধে ভর করে নিজের দেশকে সম্মানজনক উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারেননি মেসি-রোনালদোর কেউই। আর সেখানেই দু’জনকে মাত করেছেন বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়াকে রানারআপ করার নেপথ্য নায়ক একসময় রোনালদোরই ক্লাব সতীর্থ মদ্রিচ।
পাশাপাশি চ্যাম্পিয়ন্স লিগে রিয়াল মাদ্রিদের জয়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তার। বিশ্বজয়ী ফ্রান্সের কথা ধরলে তালিকাটা দীর্ঘ। সেখানে যেমন রয়েছেন অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের অ্যান্থনিও গ্রিজম্যান, রিয়ালের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ী দলের ডিফেন্ডার রাফায়েল ভারান, তেমনই রয়েছেন গোলবারের নিচে বিশ্বস্ত অধিনায়ক হুগো লরিস, মিডফিল্ডার পল পগবা এবং এনগোলো কান্তের নাম।
পুরস্কার ঘোষণার পর ফ্রেঞ্চ টুয়েন্টিরফোরকে এক গ্রিজম্যান ভক্ত বলেছেন, ‘একজন ফরাসিরই এবারের ব্যালন ডি’অর পাওয়া উচিত ছিল ‘
অনুষ্ঠান শুরুর আগে এক সাক্ষাতকারে সমর্থকের মতো কৌতুক করেই অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের হয়ে গত মৌসুমে ইউরোপা লিগ ও ফ্রান্সের হয়ে বিশ্বকাপ জেতা গ্রিজমান বলেছিলেন, ‘কে কত ভোট পেয়েছে, সেটা আমরা সবাই দেখব। বিশ্বকাপজয়ী ফ্রান্সের কেউ যদি এই শিরোপাটা না জেতে, তাহলে বিষয়টা খুব লজ্জার হবে। সেটি হলে প্রমাণিত হয়ে যাবে যে, সম্ভবত বিশ্বকাপের চেয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’
নিজের ভবিষ্যদ্বাণীর ফল মেলে কিছুক্ষণ পরেই। ব্যালন ডি’অরের দৌড়ে তৃতীয় হন গ্রিজম্যান। কাইলিয়ান এমবাপে চতুর্থ হলেও রাফায়েল ভারান, কন্তে, পগবারা লাইমলাইটেই ছিলেন না।
বিশ্বকাপ জিতেও ব্যালন ডি’অর না জেতার ঘটনা অবশ্য এবারই প্রথম নয়। বরং এবারের ঘটনা টানা তৃতীয়। ২০১০ সালে বিশ্বকাপ জিতেও লিওনেল মেসির কাছে এই ট্রফি হারাতে হয়েছিল তারই ক্লাব সতীর্থ জাভি হার্নান্দেজ ও আন্দ্রেস ইনিয়েস্তাকে। বিশ্বকাপের সেরা হয়েও ব্যালন ডি’অর ছুঁয়ে দেখতে পারেননি ইনিয়েস্তা।
চার বছর পরের ঘটনাও যেন আগেরবারের ফটোকপি। মেসির কাছে যেমন জাভি-ইনিয়েস্তা, তেমনি শুধু চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেও বিশ্বকাপজয়ী জার্মান খেলোয়াড়দের কাছ থেকে ব্যালন ডি’অর ছিনিয়ে নেন রোনালদো। এবারও হল তাই, আশা করা হলেও ফ্রান্সের কোনো ফুটবলার না জিতে ব্যালন ডি’অর জিতলেন মদ্রিচ।
যদিও তার আগের তিন বিশ্বকাপের বছরের ছবিটা ছিল অন্যরকম। বিশ্বকাপজয়ী কোনো ফুটবলারের হাতেই উঠেছিল এই ট্রফি। ১৯৯৮ সালের ব্যালন ডি’অর জিতেছিলেন ওই বছর বিশ্বকাপজয়ী ফ্রান্সের জিনেদিন জিদান। ২০০২ সালের বিশ্বকাপজয়ী ব্রাজিলিয়ান রোনাল্ডো পেয়েছিলন সেরার পুরস্কার। ঠিক একইভাবে ২০০৬ সালে ব্যালন ডি’অর জিতেছিলেন সে বছর বিশ্বকাপজয়ী ফ্যাবিও ক্যানাভারো। কোনো গোল না করলেও জার্মান বিশ্বকাপে ডিফেন্ডারদের নেতা ছিলেন ইতালিয়ান অধিনায়ক। তবে সবশেষ মদ্রিচের ট্রফি জয় প্রমাণ করে, ইতিহাস আসলেই বদলায়।








