আগামীতে আমাদের দেশের ব্যাংকিং খাতে আবারও ভয়াবহ দুর্নীতি হবার বিষয়টি একেবারেই উড়িয়ে দেয়া যায় না। সম্প্রতি ব্যাংক মালিকেরা চাপ প্রয়োগ করে সরকারের কাছ থেকে যে সুবিধাটি নিলেন তা থেকেই এই দুর্নীতির বিষয়টি ঘুরে ফিরে আসছে বোদ্ধা অর্থনীতিবিদ থেকে শুরু করে উর্ধ্বতন ব্যাংক কর্মকর্তাদের আলোচনায়।
ব্যাংক খাতে গত কয়েক বছরের দুর্নীতির বিষয়টি দেশের মোটামুটি স্বল্প শিক্ষিত লোকেরাও আবগত। কী ভয়াবহ দুর্নীতি আর লুটপাটই না হয়েছে। হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ সুবিধা দেয়া হয়েছে প্রভাবশালীদের। পরবর্তীতে তাদের ব্যাপারে এখন পর্যন্ত সেরকম দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিষয়টি আমাদের চোখে পড়েনি। উপরন্তু মূলধন সংকটের কারণে সরকার জনগণের করের টাকা দিয়েছে সেই ব্যাংকগুলোকে। যাতে আবারও চুরির সুযোগ পায়, এমনটাই বলেছেন অনেক ব্যাংক সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞজনেরা।
সম্প্রতি বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) সরকারকে চাপ প্রয়োগ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে যে বাধ্যতামূলক নগদ জমার হার (সিআর আর) রাখতে হয় তা ১ শতাংশ কমিয়েছে। এর কারণ ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে, এমন অভিযোগে এই ১ শতাংশ তারা কমানোর দাবি জানিয়েছিল।
ব্যাংকে তারল্য সংকট কেন দেখা গেল? নিশ্চয়ই আমানতকারীদের যে টাকা জমা ছিল তা ঋণ দিতে গিয়ে শেষ হয়ে গেছে। এখন তো মানুষ হতাশ, কেন টাকা রাখবে ব্যাংকে। যদি তাদের আমানত গচ্ছিতই না থাকে। তারল্য সংকট থেকে মুক্তির পাবার জন্যই ১ শতাংশ কমিয়েছে সরকারকে চাপ প্রয়োগ করে। সরকারি সংস্থা এতদিন তার তহবিলের ৭৫ শতাংশ টাকা রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকে জমা রেখে বাকি ২৫ শতাংশ রাখত বেসরকারি ব্যাংকে। আর এখন বেসরকারি ব্যাংক ৫০ শতাংশ পাবে। আর ৫০ শতাংশ পাবে সরকারি ব্যাংক। এর ফলে এক হিসাবে দেখা গেছে, এখন বেসরকারি ব্যাংকগুলো প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা পাবে।
দুশ্চিন্তার জায়গাটা হলো- এই যে টাকাটা তারল্য সংকট দূর করার জন্য নেয়া হবে, তা যদি যেনতেনভাবে ঋণ দিয়ে বা ঋণ নিয়ে লুটপাট করা হয়? তখন? কারা এই ঋণ নেয়? তারা তো সাধারণ মানুষ না, প্রভাবশালী। এ সমাজ তারা চালায়। তাদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়ার মতো সাহস কারো থাকে না। আর থাকে না বলেই সাধারণ মানুষ এখন আর ব্যাংকমুখী হতে চায় না সহসা। কারণ তাদের কষ্টার্জিত টাকা ব্যাংকে রেখে কী লাভ? যদি প্রয়োজনের সময় উঠাতে না পারলো, তখন? মাথায় হাত রাখা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।
এভাবে সভা করে চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে সুযোগ নেয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ বলেছেন, ব্যাংকগুলোতো চলছে জনগণের আমানতের টাকায়। ব্যাংক মালিকদের টাকায় নয়। মালিকরা চাইলেই তাদের দাবি পূরণ করতে হবে কেন? গভর্নরের উচিত হয়নি ওই সভায় যাওয়া। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশের গভর্নরেরা কি এভাবে উদ্যোক্তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেন? এর মাধ্যমে যে চর্চা ব্যাংক উদ্যোক্তরা শুরু করলেন তার পরিণতি দেশের ব্যাংক খাতকেই ভোগ করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, বর্তমানে পুরো ব্যাংক খাতে তো তারল্য সংকট নেই। বেশি ঋণ দেয়ায় কয়েকটি ব্যাংক সংকটে পড়েছে। সরকারি ব্যাংকে প্রচুর আমানত রয়েছে। নতুন এ সিদ্ধান্তের ফলে ব্যাংকগুলো আবারও আগ্রাসী বিনিয়োগ করবে। যার যথাযথ তদারকি থাকবে না। এর ফলে শেষ পর্যন্ত ভুক্তভোগী হবে সাধারণ জনগণ।
এই দুজনের বক্তব্য থেকে আমরা সাধারণ মানুষ কী বুঝতে পারি? ব্যাংকি খাতের দুর্যোগের ঘনঘটা আসন্ন। কারণ দেশে নেই কোনো জবাবদিহিতা। যার যেমন ইচ্ছে তেমনভাবে চলছে। আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নই আমরা। আইনের কথা কেতাবে থাকলেও প্রয়োগের বালাই নেই। আর সেজন্য হলমার্ক গ্রুপ, বিসমিল্লাহ গ্রুপ বা এনেনটেক্স-এর দুর্নীতির খবর পড়তে হয়। এর থেকে রক্ষা পাবার কোনো পথ কি নেই?
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)।








